Link copied.
আইনস্টাইন মগজ: একটি মস্তিষ্কের অসাধারণ নিয়তি
writer
অনুসরণকারী
cover
E=mc^2, পদার্থবিজ্ঞানের এই জনপ্রিয় সূত্রটি কেউ একবার হলেও দেখেনি বা শুনেনি এমন মানুষ অনেক কমই আছে বটে! এই জনপ্রিয় সূত্রটির প্রবক্তা বা আবিষ্কারক হলেন স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন। পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ী বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন ১৪ মার্চ ১৮৭৯ সালে, জার্মানির এক ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। যাকে সৃষ্টিকর্তার এক অলৌকিক সৃষ্টি থেকে কম বললে ভুল হবে! জন্মগ্রহণের পর দেখা যায় তার শারীরিক গঠন অন্য আরো ৫-৭ টা স্বাভাবিক বাচ্চাদের থেকে আলাদা। কেননা তার মাথার খুলিটি অন্যান্য বাচ্চাদের থেকে ছিল আকারে বড়। এমনকি তিনি অন্য বাচ্চাদের থেকে কথা বলাও দেরিতে শুরু করেছিলেন। আইনস্টাইন ছোটবেলায় পড়াশোনায় এতোটা ভালো ছিলেন না। শুধুমাত্র বিজ্ঞান এবং গনিত ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে তার দক্ষতা ছিল দুর্বলদের তালিকায়। এমনকি তিনি নিজের ফোন নাম্বারটাও মনে রাখতে পারতেন না! তাই আইনস্টাইন এর টিচাররা তাকে তেমন পছন্দ করতেন না। তার কিছু কিছু কাজ বা অভ্যাসের কারনে অনেকে তাকে শারীরিকভাবে অসুস্থ্য বলে মনে করতেন। কিন্তু এসব কিছুর উর্ধে কর্মবিবেচনায় তিনি বিজ্ঞানের এমন কিছু মৌলিক বিষয়কে সামনে নিয়ে আসেন যার কারনে আজ বিজ্ঞান এতদূর আসতে পেরেছে। তার একের পর এক আবিষ্কার চমকে দিয়েছে সবাইকে, যার কারনে আজও চর্চা হচ্ছে আইনস্টাইনের ব্রেইন। এখনো পর্যন্ত খুব বেশি তথ্য বের করতে না পারলেও প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে আশা করা যাচ্ছে যে, সামনে আরো অজানা তথ্য জানা যাবে সংরক্ষিত সেই ব্রেইন থেকে।
cover
১৯৫৫ সালের ১৮ এপ্রিল নিউজার্সিতে অবস্থিত প্রিন্সটন হাসপাতালে বিশাল কীর্তিময় জীবনের সমাপ্তি ঘটে এই বিখ্যাত বিজ্ঞানীর। একটি অস্ত্রোপচার করলেই তার বাঁচার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু তিনি তা চাননি। তিনি জানান, কৃত্তিমভাবে আয়ু বাড়ানোর কোনো ইচ্ছা নেই তার, তিনি তার কাজ সম্পন্ন করেছেন। তিনি চেয়েছিলেন তার মৃত্যুটা স্বাভাবিক হোক। মৃত্যুর সময় সেখানে উপস্থিত নার্সকে তার মাতৃভাষা জার্মান ভাষায় কিছু কথা বলেছিলেন। কিন্তু সেই নার্সটির জার্মান ভাষা জানা ছিল না বলে, তার বলা শেষ কথাগুলোর একটি কথাও তিনি ধরতে পারেন নি। তাই আইনস্টাইন এর বলে যাওয়া শেষ কথাগুলো আর কখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয় নি, কে জানে হয়তো সেই কথাগুলো দ্বার খোলে দিতো নতুন কোনো তথ্যের। তার মৃত্যুর সাথে সাথে কথাগুলোও হারিয়ে যায়। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল ৭৫ বছর।
আইন্সটাইন এর মৃত্যুর পর তার ময়নাতদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় প্রিন্সটন হাসপাতালের ডঃ টমাস হার্ভিকে। ডঃ টমাস হার্ভি কোনো নিউরোলজিস্ট ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন একজন সাধারন প্যাথোলজিস্ট। তিনি মনে করেছিলেন এইরকম একজন বিজ্ঞানীর মস্তিষ্ক কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না। তাই তিনি সাত থেকে আট ঘণ্টার মধ্যে আইনস্টাইন এর মাথা থেকে তার ব্রেইন বের করে নেন, এমনকি তার চোখ দুটিও। তারপর তিনি তা কতগুলো জারে সংরক্ষণ করে রাখেন। আইনস্টাইন এর শরীর নিয়ে গবেষণা করা হোক তা আইনস্টাইন নিজে কখনো চাননি, তিনি চেয়েছিলেন তার মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবে তার শরীর দাহ করা হবে। অনুমতি ব্যাতিত ডঃ হার্ভির করা কাজটি সম্পূর্ণ বেয়াইনি হওয়া সত্ত্বেও তিনি তার পরিবারকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, তার এই সমস্ত কাজ বিজ্ঞানের নামে। যদিও বা তার এই কাজের জন্য তাকে প্রিন্সটন হাসপাতাল থেকে চাকুরিচুত্য করা হয়েছিল।
cover
১২৩০ গ্রাম বা প্রায় ২.৭ পাউন্ড ( যেখানে সাধারন মানুষের মস্তিষ্কের ওজন ৩ পাউন্ড) ওজনের মস্তিষ্কটি পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ল্যাবে নিয়ে যান এবং একে কয়েক ভাগে ভাগ করেন ডঃ হার্ভি । ভাগ করার পূর্বে তিনি নানা এঙ্গেল থেকে মস্তিষ্কটির ছবি তুলে নেন। তিনি এই ব্রেইনটিকে প্রায় ২৪০ টি ব্লকে ভাগ করেন এবং পরে গবেষণার সুবিধার্থে এই ২৪০ টি ব্লক থেকে আবার হাজার হাজার মাইক্রোস্কপিক স্লাইড তৈরি করেন। কিছু টুকরো নিজের কাছে রেখে বাকিগুলো পাঠিয়ে দেন নানা দেশের নানা গবেষকদের কাছে, যাতে তারা আবিষ্কার করতে পারেন আইনস্টাইন এর মাথার ভিতর এমন কি ছিল যা সাধারন মানুষের ছিল না! তার চোখের জারটি আইনস্টাইন এর চোখের ডাক্তার হেনরিকে পাঠিয়ে দেন। যা হেনরি সেইফ ডিপোজিট বক্সে সংরক্ষণ করে রাখেন। এখনো নিউইয়র্ক শহরের কোথাও সেই বক্স আছে বলে ধারনা করা হয়।
cover
নানা দেশের বিশেষজ্ঞদের কাছে ডঃ হার্ভির পাঠানো আইনস্টাইন এর মস্তিষ্কের টুকরো বিশ্লেষণ করে কিছু কিছু বিশেষ তথ্য উদ্ভাবিত হয়।
জন্মের সময় আইনস্টাইন এর খুলির আকার অনন্য বাচ্চাদের থেকে বড় হলেও, তার মৃত্যুর পর তার মস্তিষ্কের ওজন মাপার পর জানা যায় অন্য তথ্য। আইনস্টাইন এর মস্তিষ্কের ওজন এবং আকার ছিল পুরুষের মস্তিষ্কের গড় ওজন থেকে কম। যেখানে সাধারণ মানুষের মস্তিষ্কের ওজন ৩ পাউন্ড সেখানে আইনস্টাইন এর মস্তিষ্কের ওজন ছিল প্রায় ২.৭ পাউন্ড। কিন্তু তার IQ ছিল ১৬০-১৯০(যেখানে সাধারন মানুষের IQ থাকে ৯০-১৯০ এর মধ্যে)। অনেকে মনে করেন মস্তিষ্কের আকারের উপর মানুষের জ্ঞান ধারন ক্ষমতা নির্ভর করে। এমন ধারনা যে সম্পূর্ণ ভুল তা আইনস্টাইন এর মস্তিষ্কের বিশ্লেষণ থেকে বুঝা যায়।
cover
ডায়মন্ড, স্কিবেল ও মারফির গবেষণায় উঠে এসেছে, আইনস্টাইনের মগজের একটি অংশে গ্লিয়াকোষের পরিমাণ বেশি। সেটা হলো সেরিব্রাল কর্টেক্স এবং তার মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেক্সটি ছিল সাধারণ মানুষ থেকে ভিন্ন। আইনস্টাইনের ব্রেইনের এই অংশটি মস্তিষ্কের বাকি অংশগুলো থেকে অপেক্ষাকৃত পাতলা ছিলো। এটি মানুষের মস্তিষ্কের অত্যন্ত জরুরি অংশ, যার কারনে মানুষ ক্রিটিকাল থিঙ্কিং করতে পারে। মানুষের সঙ্গে অন্য প্রাণীর তুলনা করলে দেখা যায়, সেরিব্রাল কর্টেক্সে মানুষের গ্লিয়া:নিউরন ইনডেক্সের মান সবচেয়ে বেশি। একারণেই মানুষ বুদ্ধিতে অন্য প্রাণীর চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে। যা বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের একটু বিশেষভাবে তৈরি হয়েছিল। তাই ডায়মন্ড আর তার সহকর্মীরা মনে করতেন, মস্তিষ্কের এই অংশটির বিশেষ গঠনের জন্যই আইনস্টাইন এর উদ্ভাবনী ক্ষমতা ছিল বেশি।
১৯৯৯ সালে দুই কানাডিয়ান গবেষক ডঃ সান্ড্রা উইটেলসন ও ডেব্রা কিগার ৩৫ জন সাধারন মানুষের সাথে আইনস্টাইন এর মস্তিষ্কের তুলনা করে জানান যে, ব্রেইনের একটি বড় খাঁজ প্যারেটাল ওপারকুলাম, যা কিনা আইনস্টাইন এর মস্তিষ্কে অনুপস্থিত ছিলো! যার কারনে ব্রেইন এর গুরুত্বপূর্ণ ইনফেরিওর প্যারাইটাল লোব, যা মানুষের ভাষা এবং দক্ষতা নিয়ন্ত্রন করে তা আইনস্টাইন এর মস্তিষ্কে স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় ১৫ শতাংশ বড় ছিল! এই লোব এর মধ্যে একটি ছোট খাঁজ থাকে। আইনস্টাইন এর মস্তিষ্কে যা ছিল অন্যদের তুলনায় বেশ ছোট। যার কারনে এই খাঁজের ভিতরের স্নায়ুগুলো ছিল বেশি ঘনভাবে সজ্জিত। ধারনা করা হয় এই কারনে তার মস্তিষ্কের মধ্যকার যোগাযোগ অপেক্ষাকৃত সহজ ছিল। ফলে তার চিন্তাশক্তি ছিল অনেক প্রখর। অবশ্য আইনস্টাইনের মস্তিষ্কে প্যারাইটাল অপারকুলাম না থাকা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তটি নিয়ে তিন গবেষক ফক, লেপোরে ও নোয়ি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
cover
অন্যদিকে স্যার আলবার্ট আইনস্টাইনের ব্রেইন-এর সবথেকে অবাক করার বিষয় ছিলো, তার ব্রেইন বর্তমান বয়স থেকে কম বয়স প্রদর্শন করে। অর্থাৎ তার ব্রেইন-এর আদতে যা বয়স, তার থেকে কম বয়সি মানুষের ব্রেইন-এর মত কাজ করে বা আচরণ করে। তুলনা করে দেখা যায়, আইনস্টাইনের ব্রেইন-এর গ্লিয়াল কোষের মৃত্যুর অনুপাত সাধারন মানুষের থেকে অনেক বেশি। হয়তোবা তার মস্তিষ্কের এসব বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারনেই তার চিন্তার গভীরতা ছিল অন্যদের তুলনায় অনন্য। যার দ্বারা সম্ভব হয়েছে বিজ্ঞানের এমন আমূল পরিবর্তন।
ডঃ হার্ভি আইনস্টাইনের ব্রেইনের মোট ৫ বক্স স্লাইড তৈরি করেছিলেন, যার মধ্য থেকে একসেট স্লাইড বর্তমানে আমেরিকাতে অবস্থিত “ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ হেলথ অ্যান্ড মেডিসিনে” আছে। হসপিটাল অব ফিলাডেলফিয়ার নিউরো প্যাথোলজিস্ট লুসি বোরকি, হার্ভির তখনকার স্ত্রীর কাছ থেকে সংগ্রহ করেন ৪৬টি স্লাইড। এই স্লাইড গুলো রয়েছে ফিলডেলফিয়ার মাটার মিউজিয়ামে।
cover
আজ থেকে প্রায় ৬৬ বছর পূর্বে আইনস্টাইন এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেলেও ড.হার্ভির রেখে দেয়া তার মস্তিষ্কটি রয়ে গেছে। যার চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে এখনো। যদিও এতদিন ধরে নানা বিশ্লেষণের যে ফলাফল বের হচ্ছে, তার সবগুলো মেনে নিতে নারাজ অনেকেই। মস্তিষ্কের ওজন কিংবা আকার যদি আসলেই তার মহাবিজ্ঞানী হওয়ার পিছনে প্রভাব ফেলতো তাহলে আইনস্টাইন এর চেয়ে ২৬২ গ্রাম বেশি ওজনের মস্তিষ্কধারী গাউস নির্বোধ হতেন। তাই এই বিষয়টি আসলেই কোনো প্রভাব ফেলে কিনা তা এখনো গবেষণা করে দেখার বিষয়। হয়তোবা এই সব কিছুর পিছনে তার আগ্রহ, জানার তুমুল ইচ্ছা কিংবা শ্রমই প্রাধান্য পেয়েছিল বেশি। স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন এর ছেলে হান্স আলবার্ট বলেন, “আমার পিতার ব্যতিক্রমী হয়ে উঠার পিছনে কারন হল তিনি খুব সহজে হাল ছাড়তেন না। এমন কি কোন ভুল সমাধান হলেও তিনি বারবার চেষ্টা করতেন। একবার না হলে আবার করতেন।’’
ডঃ হার্ভি ঠিক কি কারনে আইনস্টাইন এর মস্তিষ্ক সরিয়ে ছিলেন তা সঠিকভাবে জানা না গেলেও,তার এই কাজের কারনেই আজ সেই মস্তিষ্ক নিয়ে এতো হৈচৈ, এতো গবেষণা। মানুষের সেই মস্তিষ্ক নিয়ে জানার আগ্রহের যেনো কোনো শেষ নেই! তাই তার প্রতি তিরস্কারের সঙ্গে সঙ্গে রয়ে যায় কৃতজ্ঞতাও।

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021