মস্কোর আদর্শ সৈনিক: ইউক্রেন যুদ্ধে চেচেন সৈন্যরা কেন এতটা সক্রিয়?
আন্তর্জাতিক
মস্কোর আদর্শ সৈনিক: ইউক্রেন যুদ্ধে চেচেন সৈন্যরা কেন এতটা সক্রিয়?
চলমান রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধে যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি প্রচারণা লাভ করেছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি বিষয় হচ্ছে এই যুদ্ধে চেচেন সৈন্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই চেচেন রাষ্ট্রপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল রমজান কাদিরভ অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে এই যুদ্ধে রুশ অবস্থানের প্রতি তাঁর সমর্থন প্রকাশ করছেন এবং হাজার হাজার চেচেন সৈন্যকে রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য ইউক্রেনে প্রেরণ করেছেন। 
ইউক্রেনে মোতায়েনকৃত রুশ ন্যাশনাল গার্ডের চেচেন প্রজাতান্ত্রিক শাখার একদল সৈন্য ও সামরিক সরঞ্জাম; চিত্রসূত্র: Ugolok_Sitha/Telegram
ইউক্রেনে মোতায়েনকৃত রুশ ন্যাশনাল গার্ডের চেচেন প্রজাতান্ত্রিক শাখার একদল সৈন্য ও সামরিক সরঞ্জাম; চিত্রসূত্র: Ugolok_Sitha/Telegram
ইউক্রেনে মোতায়েনকৃত চেচেন সৈন্যরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুবই সক্রিয় এবং এজন্য এই যুদ্ধে চেচেন সৈন্যদের অংশগ্রহণের বিষয়টি বহির্বিশ্বে আরও বেশি মাত্রায় দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। চেচনিয়া থেকে মূলত তিন ধরনের সৈন্যদল ইউক্রেনে প্রেরিত হয়েছে। এগুলো হচ্ছে:
  1. রুশ সশস্ত্রবাহিনীর বিভিন্ন শাখার (যেমন: রুশ সেনাবাহিনী, রুশ এয়ারবোর্ন ট্রুপস প্রভৃতি) যেসব ইউনিটকে ইউক্রেনে প্রেরণ করা হয়েছে, সেগুলোতে কর্মরত চেচেন সৈন্যদল। উল্লেখ্য, সাধারণত এই ইউনিটগুলো বিভিন্ন জাতিসত্তার সমন্বয়ে গঠিত এবং এগুলোতে চেচেনদের পাশাপাশি রুশ, তাতার, বাশকির, কালমিক, আর্মেনীয়, চুভাশ, তুভান, বুরিয়াৎ, ইয়াকুৎ ও রাশিয়ায় বসবাসকারী অন্যান্য বিভিন্ন জাতির সৈন্যরা রয়েছে।
  2. রুশ ন্যাশনাল গার্ড বাহিনীর চেচেন প্রজাতান্ত্রিক শাখার সৈন্যদল। এই ইউনিটগুলো প্রধানত চেচেন সৈন্যদের সমন্বয়ে গঠিত এবং চলমান যুদ্ধে মূলত এরাই সবচেয়ে বেশি প্রচারণা লাভ করেছে।
  3. চেচনিয়ায় অবস্থিত সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক সৈন্যদল। চেচেন স্বেচ্ছাসেবকরা ছাড়াও রাশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত স্বেচ্ছাসেবকরা এগুলোতে প্রশিক্ষণ লাভ করছে এবং প্রশিক্ষণ শেষে তাদেরকে ইউক্রেনে প্রেরণ করা হচ্ছে। 
উল্লেখ্য, দুই দশক আগে রাশিয়া ও রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত (কিন্তু কার্যত স্বাধীন) 'ইচকেরিয়া চেচেন প্রজাতন্ত্রে'র মধ্যে পরপর দুইটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে এবং এদের মধ্যে প্রথমটিতে (১৯৯৪–১৯৯৬) রমজান কাদিরভ ও তাঁর বাবা আহমাৎ কাদিরভ (ইচকেরিয়ার তদানীন্তন প্রধান মুফতি) রুশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। কিন্তু দ্বিতীয় যুদ্ধের (১৯৯৯–২০০০) সময় তাঁরা রাশিয়ার পক্ষ অবলম্বন করেন এবং এরপর থেকে তাঁরা চেচেন প্রজাতন্ত্রের ওপর রুশ নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। আহমাৎ কাদিরভ ২০০০ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত চেচনিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন এবং ২০০৭ সাল থেকে তাঁর ছেলে রমজান কাদিরভ চেচনিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন। ইতিপূর্বে চেচেন সৈন্যরা দনবাসে যুদ্ধের সবচেয়ে তীব্র পর্যায়ে (২০১৪–২০১৫) গণপ্রজাতন্ত্রী দনেৎস্ক ও গণপ্রজাতন্ত্রী লুগানস্কের পক্ষ নিয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং ২০১৫ সালে সিরীয় যুদ্ধে (২০১১–বর্তমান) রুশ হস্তক্ষেপের পর থেকে সিরিয়ায় সিরীয় মিলিট্যান্টদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। বর্তমানে তারা ইউক্রেনে রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করছে। আনুষ্ঠানিকভাবে, চেচেন প্রজাতন্ত্র রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত এবং সেই দিক থেকে রাশিয়ার যে কোনো যুদ্ধে চেচেন সৈন্যদের প্রেরণ করার এখতিয়ার রয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি এতটা সরল নয়। রাশিয়ার অন্যান্য প্রদেশ/প্রজাতন্ত্রও এই যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে, কিন্তু তাদের কেউই এই যুদ্ধে অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে চেচেনদের মতো এত প্রচারণা চালাচ্ছে না। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে, চেচেনরা কেন এত সক্রিয়ভাবে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে? এই প্রশ্নটির কোনো সরল বা একক উত্তর নেই। এই প্রশ্নটির উত্তর রাশিয়ার ও চেচেন প্রজাতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং রুশ–চেচেন সম্পর্কের অবস্থার ওপর নির্ভরশীল, এবং এই বিষয়গুলো অত্যন্ত জটিল প্রকৃতির। এজন্য এই প্রশ্নটির কার্যত একাধিক উত্তর বিদ্যমান।
গণপ্রজাতন্ত্রী লুগানস্কের প্রিভোলিয়ে শহরে চেচেন সৈন্যদের দ্বারা দখলকৃত ইউক্রেনীয় অস্ত্রশস্ত্র; চিত্রসূত্র: RT via @mdfzeh/Twitter
গণপ্রজাতন্ত্রী লুগানস্কের প্রিভোলিয়ে শহরে চেচেন সৈন্যদের দ্বারা দখলকৃত ইউক্রেনীয় অস্ত্রশস্ত্র; চিত্রসূত্র: RT via @mdfzeh/Twitter
প্রথমত, আনুষ্ঠানিকভাবে, চেচেন প্রজাতন্ত্র রাশিয়ার অংশ, কিন্তু সুবিশাল রাশিয়ায় চেচনিয়া একটি 'প্রান্তিক অঞ্চল' (periphery) মাত্র। রাশিয়ার কেন্দ্রভূমিতে (heartland), অর্থাৎ মস্কো, সেইন্ট পিটার্সবার্গ, নিঝনি নভগরোদ ও মস্কের মতো বড় বড় শহরগুলোয়, বসবাসরত জনসাধারণের অন্তত একাংশের দৃষ্টিতে চেচনিয়া একটি দূরবর্তী স্থান, অনেকটা 'বিদেশি' রাষ্ট্রের মতোই। রুশ জনসাধারণের একাংশের মধ্যে, বিশেষত রুশ উগ্র জাতীয়তাবাদী ও পশ্চিমাপন্থী রুশ লিবারেলদের মধ্যে, চেচেনদের ও উত্তর ককেশাসের অন্যান্য জাতিভুক্ত মানুষদের সম্পর্কে নেতিবাচক ও বর্ণবাদী ধারণা বিদ্যমান রয়েছে। তাদের দৃষ্টিতে, চেচেনরা অপরাধ/সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত এবং চেচেন সংস্কৃতি রুশ সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তদুপরি, চেচনিয়া রাশিয়ার দরিদ্রতম অঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি এবং এজন্য চেচনিয়ার বাজেটের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সিংহভাগ (কখনো কখনো ৮০% থেকে ৮৭% পর্যন্ত) মস্কোকে সরবরাহ করতে হয়। কিছু কিছু পশ্চিমা বিশ্লেষক ও রুশবিরোধী চেচেন মিলিট্যান্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে রাশিয়া ও চেচনিয়ার মধ্যবর্তী সম্পর্কে 'ঔপনিবেশিক' হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন। কিন্তু কার্যত বাস্তবতা এর ঠিক উল্টো। অতীতে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় অবস্থিত তাদের উপনিবেশগুলো থেকে সম্পদ শোষণ করে নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করতো। কিন্তু রাশিয়া চেচনিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করছে না, উল্টো চেচনিয়ার উন্নয়নের জন্য রাশিয়াকেই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এজন্য রুশ জনসাধারণের একাংশের দৃষ্টিকোণ থেকে, চেচনিয়া রাশিয়ার জন্য একটি 'অর্থনৈতিক বোঝা'।

রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধ চলাকালে গণপ্রজাতন্ত্রী দনেৎস্কের রাষ্ট্রপ্রধান দেনিস পুশিলিন (বামে) এবং চেচেন প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান রমজান কাদিরভ (ডানে); চিত্রসূত্র: @mdfzeh/Twitter
রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধ চলাকালে গণপ্রজাতন্ত্রী দনেৎস্কের রাষ্ট্রপ্রধান দেনিস পুশিলিন (বামে) এবং চেচেন প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান রমজান কাদিরভ (ডানে); চিত্রসূত্র: @mdfzeh/Twitter
রুশ জনসাধারণের একাংশের মধ্যে চেচেনদের প্রতি যে নেতিবাচক মনোভাব বিদ্যমান, এই বিষয়টি নিয়ে চেচেন নেতৃবৃন্দ উদ্বিগ্ন। রুশ উগ্র জাতীয়তাবাদীদের ও পশ্চিমাপন্থী রুশ লিবারেলদের চেচেনবিদ্বেষী মনোভাব সম্পর্কে চেচেন নেতৃবৃন্দ সেরকম কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না, কারণ রুশ রাজনীতিতে এই দুই মতাদর্শের মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। তদুপরি, রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন এবং রাশিয়ার ক্ষমতাসীন দল 'ইয়েদিনায়া রাসিয়া' সাধারণভাবে উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরোধী ও রাশিয়ার বিভিন্ন জাতির মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষপাতী। কিন্তু ২০২১ সালের নভেম্বরে মস্কোয় কতিপয় চেচেন যুবক একটি মারপিটের ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে রুশ রাষ্ট্র–নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যম 'আরটি'র মুখ্য সম্পাদক মার্গারিতা সিমোনিয়ান ককেশিয়ানদের উদ্দেশ্যে তীর্যক মন্তব্য করেন। কাদিরভ সিমোনিয়ানের মন্তব্যের প্রতি তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান। উল্লেখ্য, কাদিরভ ও সিমোনিয়ান উভয়েই রুশ রাষ্ট্রপতি পুতিনের কট্টর সমর্থক, সুতরাং তাঁদের মধ্যকার এই বাকযুদ্ধ রুশ সমাজে চেচেনদের প্রতি বিদ্যমান নেতিবাচক মনোভাবের ব্যাপকতাকে স্পষ্ট করে তোলে। 
আঞ্চলিক পর্যায় থেকে দেখলে চলমান রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধ মূলত অন্তর্ভুক্তিমূলক রুশ জাতীয়তাবাদ (inclusive Russian nationalism) ও ইউক্রেনীয় উগ্র জাতীয়তাবাদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। এই দ্বন্দ্ব জাতিগত রুশদের নিকট যতোটা গুরুত্বপূর্ণ, জাতিগত চেচেনদের নিকট ঠিক ততোটা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা নয়। এরপরেও চেচেন সৈন্যরা সক্রিয়ভাবে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে।
এমতাবস্থায় কাদিরভ ও চেচেন নেতৃবৃন্দ রুশ জনসাধারণের নিকট চেচেনদের ভাবমূর্তি সমুন্নত করতে আগ্রহী, এবং রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধে অংশগ্রহণ তাদেরকে সেই সুযোগ করে দিয়েছে। আঞ্চলিক পর্যায় থেকে দেখলে চলমান রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধ মূলত অন্তর্ভুক্তিমূলক রুশ জাতীয়তাবাদ (inclusive Russian nationalism) ও ইউক্রেনীয় উগ্র জাতীয়তাবাদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। এই দ্বন্দ্ব জাতিগত রুশদের নিকট যতোটা গুরুত্বপূর্ণ, জাতিগত চেচেনদের নিকট ঠিক ততোটা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা নয়। এরপরেও চেচেন সৈন্যরা সক্রিয়ভাবে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে। এর মধ্য দিয়ে চেচেন নেতৃবৃন্দ রুশ জনসাধারণের নিকট চেচেনদের দেশপ্রেম ও রুশ রাষ্ট্রের প্রতি চেচেনদের আনুগত্যকে প্রদর্শন করছেন। এটি রুশ জনসাধারণের মধ্যে চেচেনদের সম্পর্কে বিদ্যমান নেতিবাচক ধারণাগুলো দূরীকরণের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 
ইউক্রেনে মোতায়েনকৃত চেচেন সৈন্যদলের অন্যতম অধিনায়ক হুসেইন মেজিদভ; চিত্রসূত্র: 200_zoka/Twitter
ইউক্রেনে মোতায়েনকৃত চেচেন সৈন্যদলের অন্যতম অধিনায়ক হুসেইন মেজিদভ; চিত্রসূত্র: 200_zoka/Twitter
দ্বিতীয়ত, রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধে চেচেন সৈন্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ চেচেন রাষ্ট্রপ্রধান কাদিরভের রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করে তুলবে। ইউক্রেনে সৈন্য প্রেরণ ও এই যুদ্ধের প্রতি জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে কাদিরভ মস্কোর প্রতি তাঁর আনুগত্যের পরিচয় দিয়েছেন, সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই এর বিনিময়ে মস্কো তাঁকে পুরস্কৃত করবে এবং চেচেন প্রজাতন্ত্রের অর্থায়ন অব্যাহত রাখবে। এর ফলে প্রজাতন্ত্রটিতে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে এবং প্রজাতন্ত্রটির ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কাদিরভের জন্য তুলনামূলকভাবে সহজ হবে। তৃতীয়ত, আনুষ্ঠানিকভাবে, রুশ কেন্দ্রীয় সরকার রাশিয়ার ও রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত সকল অঞ্চলের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করে থাকে। কিন্তু কার্যত রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত বেশ কিছু প্রজাতন্ত্র/প্রদেশ (যেমন: তাতারস্তান, দাগেস্তান, ক্রিমিয়া প্রভৃতি) অনানুষ্ঠানিকভাবে নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে থাকে। তাদের পররাষ্ট্রনীতি মূল রুশ পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সামগ্রিকভাবে সাংঘর্ষিক নয়, কিন্তু এগুলোর উদ্দেশ্য হচ্ছে উক্ত প্রজাতন্ত্র/প্রদেশগুলোর আঞ্চলিক/স্বতন্ত্র স্বার্থ রক্ষা করা। 
পশ্চিম এশিয়ার মুসলিম জনসাধারণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে পশ্চিমাবিরোধী ও মার্কিনবিরোধী মনোভাব বিদ্যমান, সুতরাং তাদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি ও ভাবমূর্তিকে সমুন্নত করার জন্য চেচেন নেতৃবৃন্দ তাদের পশ্চিমাবিরোধী ও মার্কিনবিরোধী অবস্থানকে ব্যাপকভাবে সম্প্রচার করেছে।
২০১০–এর দশক থেকে চেচেন প্রজাতন্ত্র অনুরূপ একটি স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে এবং তাদের পররাষ্ট্রনীতি মূলত মুসলিম বিশ্বে (আরো স্পষ্টভাবে বললে, পশ্চিম এশিয়ায়) কেন্দ্রীভূত। চেচেন মিলিট্যান্টদের বিপরীতে নিজেদের বৈধতাকে জোরদার করার উদ্দেশ্যে ও চেচেন প্রজাতন্ত্রের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য চেচেন প্রজাতন্ত্র বিশেষ করে তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর (প্রধানত সৌদি আরব ও ইমারাত) সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছে। চেচেন প্রজাতন্ত্রের নেতৃবৃন্দ প্রথম থেকেই পশ্চিমাবিরোধী ও মার্কিনবিরোধী মনোভাব প্রদর্শন করে এসেছে। পশ্চিম এশিয়ার মুসলিম জনসাধারণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে পশ্চিমাবিরোধী ও মার্কিনবিরোধী মনোভাব বিদ্যমান, সুতরাং তাদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি ও ভাবমূর্তিকে সমুন্নত করার জন্য চেচেন নেতৃবৃন্দ তাদের পশ্চিমাবিরোধী ও মার্কিনবিরোধী অবস্থানকে ব্যাপকভাবে সম্প্রচার করেছে। রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব ইউক্রেনকে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে, সুতরাং এই যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে চেচেন সৈন্যদের যুদ্ধে অংশগ্রহণকে চেচেন নেতৃবৃন্দ পশ্চিমা একাধিপত্যের বিরুদ্ধে তাদের লড়াইয়ের অংশ হিসেবে পশ্চিম এশীয় মুসলিমদের কাছে উপস্থাপন করছে।
ইউক্রেনে মোতায়েনকৃত চেচেন সৈন্যদলের অন্যতম অধিনায়ক মেজর জেনারেল মাগোমেদ তুশায়েভ; চিত্রসূত্র: @mdfzeh/Twitter
ইউক্রেনে মোতায়েনকৃত চেচেন সৈন্যদলের অন্যতম অধিনায়ক মেজর জেনারেল মাগোমেদ তুশায়েভ; চিত্রসূত্র: @mdfzeh/Twitter
চতুর্থত, রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধে চেচেন সৈন্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণের পশ্চাতে কাদিরভের ব্যক্তিগত হিসেবনিকেশও সংশ্লিষ্ট রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ২০০৪ সালের ৯ মে রুশবিরোধী চেচেন মিলিট্যান্টরা বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে তদানীন্তন চেচেন রাষ্ট্রপ্রধান আহমাৎ কাদিরভকে খুন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কাদিরভ পরিবার চেচেন মিলিট্যান্টদের বিরুদ্ধে 'blood feud'–এ জড়িয়ে পড়েছে। চেচেন প্রথা অনুসারে, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো চেচেনকে হত্যা করে, সেক্ষেত্রে নিহত চেচেন ব্যক্তির পরিবার প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে হত্যাকারী ও তার পরিবারের সঙ্গে blood feud–এ লিপ্ত হয় এবং এই ধরনের দ্বন্দ্ব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতে থাকে। এজন্য চেচেন মিলিট্যান্টরা কেবল কাদিরভের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীই নয়, তারা তাঁর ব্যক্তিগত শত্রুও বটে। চেচেন মিলিট্যান্টদের নিয়ন্ত্রণাধীন দুইটি স্বেচ্ছাসেবক ব্যাটালিয়ন (জওহর দুদায়েভ ব্যাটালিয়ন ও শেখ মনসুর ব্যাটালিয়ন) চলমান রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধে ইউক্রেনের পক্ষে যুদ্ধ করছে। এই ব্যাটালিয়ন দুইটির সামগ্রিক জনবল প্রায় ৫০০ জন এবং এদের মধ্যে চেচেন ছাড়াও জর্জীয়, আজারবাইজানি, ইউক্রেনীয় প্রভৃতি নানান জাতির মানুষ রয়েছে। এরা যেহেতু এই যুদ্ধে ইউক্রেনের পক্ষ অবলম্বন করেছে, সেহেতু কাদিরভ এই যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে অংশগ্রহণের জন্য চেচেন প্রজাতন্ত্রের সৈন্যদের প্রেরণ করেছেন। 
গণপ্রজাতন্ত্রী দনেৎস্কের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মারিউপোলে একদল চেচেন সৈন্য; চিত্রসূত্র: Ugolok_Sitha/Telegram
গণপ্রজাতন্ত্রী দনেৎস্কের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মারিউপোলে একদল চেচেন সৈন্য; চিত্রসূত্র: Ugolok_Sitha/Telegram
সর্বোপরি, এই যুদ্ধে চেচেন সৈন্যদের প্রেরণের পশ্চাতে কাদিরভ ও চেচেন নেতৃবৃন্দের একটি গূঢ় অভিসন্ধি থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। মাত্র দুই দশক আগে চেচেনরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে দুইটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অংশ নিয়েছে এবং কাদিরভ নিজেও একসময় রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। এই স্মৃতি তাঁদের এত সহজে ভুলে যাওয়ার কথা নয়। রুশ রাষ্ট্রপতি পুতিনের সঙ্গে কাদিরভের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক বিদ্যমান এবং পুতিন চেচনিয়ার প্রতি নমনীয় নীতি অনুসরণ করছেন, এজন্য পুতিন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা অবস্থায় রাশিয়া ও চেচনিয়ার মধ্যে কোনো ধরনের সংঘাত দেখা দেয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু পুতিনের পর রাশিয়ার শাসনক্ষমতা কাদের হাতে হস্তগত হবে, সেটি অনিশ্চিত। পুতিনের পর রুশ উগ্র জাতীয়তাবাদীরা বা পশ্চিমাপন্থী রুশ লিবারেলরা যে রাশিয়ার শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবে না, এমনটি নিশ্চিত করে বলা যায় না। সেক্ষেত্রে রাশিয়া ও চেচনিয়ার মধ্যে নতুন করে সশস্ত্র সংঘাত শুরু হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না।উল্লেখ্য, প্রথম চেচেন যুদ্ধে (১৯৯৪–১৯৯৬) ইচকেরিয়ার নিকট রাশিয়ার পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ইচকেরিয়ার সৈন্যদলে বহুসংখ্যক সোভিয়েত–প্রশিক্ষিত ও আফগান যুদ্ধে (১৯৭৯–১৯৮৯) অংশগ্রহণকারী অভিজ্ঞ চেচেন সৈন্য ও অফিসারের উপস্থিতি। 
প্রথম চেচেন যুদ্ধে (১৯৯৪–১৯৯৬) ইচকেরিয়ার নিকট রাশিয়ার পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ইচকেরিয়ার সৈন্যদলে বহুসংখ্যক সোভিয়েত–প্রশিক্ষিত ও আফগান যুদ্ধে (১৯৭৯–১৯৮৯) অংশগ্রহণকারী অভিজ্ঞ চেচেন সৈন্য ও অফিসারের উপস্থিতি।
উদাহরণস্বরূপ, তদানীন্তন ইচকেরীয় রাষ্ট্রপতি জওহর দুদায়েভ সোভিয়েত বিমানবাহিনীর মেজর জেনারেল ছিলেন এবং আফগান যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন, আর তদানীন্তন ইচকেরীয় সেনাপ্রধান আসলান মাসখাদভ ছিলেন সোভিয়েত সেনাবাহিনীর কর্নেল। তেমনিভাবে, চলমান রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে চেচেন সৈন্যরা আধুনিক যুদ্ধ সম্পর্কে সম্যক ধারণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করছে এবং এই বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই যে, এই যুদ্ধ শেষে চেচেন প্রজাতন্ত্রের একটি সুপ্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ সশস্ত্রবাহিনী থাকবে। যদি ভবিষ্যতে পুতিন–পরবর্তী রাশিয়া ও চেচনিয়ার মধ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাত আরম্ভ হয়, সেক্ষেত্রে এই প্রশিক্ষিত সৈন্যবাহিনী কাদিরভ ও চেচেন নেতৃবৃন্দের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি হাতিয়ার হয়ে উঠবে। সামগ্রিকভাবে, রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধে চেচেন সৈন্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণের পশ্চাতে প্রজাতন্ত্রটির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ এবং প্রজাতন্ত্রটির রাষ্ট্রপ্রধান কাদিরভের রাজনৈতিক ও পারিবারিক স্বার্থের মিশ্র ভূমিকা রয়েছে। অবশ্য যুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাদের এই স্বার্থগুলো রক্ষিত হবে কিনা, সেটি যুদ্ধের চূড়ান্ত ফলাফল ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। 
তথ্যসূত্র:
  1. Mariya Petkova. "What role is Chechnya’s Ramzan Kadyrov playing in Ukraine war?" Al Jazeera. 24 March 2022. https://www.aljazeera.com/news/2022/3/24/what-role-is-chechnyas-ramzan-kadyrov-playing-in-ukraine
  2. "Battle for Freedom: Akhmat Special Forces." RT. 2 June 2022. https://www.rt.com/shows/documentary/556461-battle-freedom-akhmad-forces-chechnya/
  3. "Kadyrov answered Margarita Simonyan: stop advertising his inforoduct on Caucasians." Silkway News. 6 November 2021. https://www.silkway.news/kadyrov-answered-margarita-simonyan-44662/
  4. "Twelve thousand Chechens ready to deploy to Ukraine – Kadyrov." RT. 25 February 2022. https://www.rt.com/russia/550649-chechen-soldiers-deploy-ukraine/ 
লেখক: হিমেল রহমান
আরও পড়ুন: ইউক্রেনীয় 'মুজাহিদিন': প্রথম চেচেন যুদ্ধে ইউক্রেনীয় স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকা
আন্তর্জাতিকইউক্রেনরাশিয়াযুদ্ধ
আরো পড়ুন