Link copied.
যুগে যুগে মহামারী: যেভাবে পরিবর্তিত হয়েছে ইতিহাসের গতিপথ (শেষ পর্ব)
writer
৩১ অনুসরণকারী
cover
১৮৫৫: তৃতীয় প্লেগ মহামারী
চীনে উৎপত্তি ঘটার পর ভারত এবং হংকংয়ে পাড়ি জমানো বুবোনিক প্লেগ ১৫ মিলিয়ন (১ কোটি ৫০ লক্ষ) মানুষকে আক্রান্ত করে। প্রথমে ইউনান-এ খনির বেড়া চলাকালীন মাছি দ্বারা ছড়িয়ে পড়ে। পার্থে বিদ্রোহ এবং তাইপিং বিদ্রোহের একটি কারণ হিসেবে বিবেচিত হয় এই প্লেগ। ভারত সবচেয়ে মারাত্মক হতাহতের মুখোমুখি হয়েছিল এবং এই মহামারীকে দমনমূলক নীতি যা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কিছু বিদ্রোহের সূচনা করেছিল সেগুলোর অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। মহামারীটি ১৯৬০ সাল পর্যন্ত সক্রিয় হিসাবে বিবেচিত ছিল যখন প্লেগে মৃত্যুর ঘটনা কয়েক শতাধিকের নিচে নেমেছিল। 
১৮৭৫: ফিজির হাম মহামারী
cover
ফিজি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের হাতে সমর্পণ করে দেওয়ার পরে, একটি রাজকীয় দল রানী ভিক্টোরিয়ার উপহার হিসাবে অস্ট্রেলিয়া সফর করে। হামের প্রকোপ চলাকালীন এই সফরের কারণে রাজকীয় দলটি তাদের দ্বীপে এই রোগটি বয়ে নিয়ে এসেছিল। ফিরে আসার পরে তাদের সাথে দেখা হওয়া উপজাতি প্রধানরা এবং পুলিশরা এটিকে আরও ছড়িয়ে দিয়েছিল।

এরপর এই মহামারী দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দ্বীপটিকে একেবারে মৃতদেহের জঞ্জাল বানিয়ে ফেলে যা বেদম বন্য প্রাণীদের শিকারে পরিণত হয়। গ্রামের পর গ্রাম মারা যেতে থাকে এবং সেই গ্রামগুলো পুরো আগুনে পুড়িয়ে ফেলা আরম্ভ হয়। এবং কখনও কখনও এমনও দেখা গেছে যে আগুন লাগানোর পর সেই আগুনের মধ্যে আটকা পড়ে হামে আক্রান্ত অসুস্থরাও জীবত অবস্থায় পুড়ে মরে গেছে। ফিজির জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ, মোট ৪০,০০০ লোক মারা গিয়েছিল এই মহামারীতে। 
১৮৮৯: রাশিয়ান ফ্লু
cover
প্রথম উল্লেখযোগ্য ফ্লু মহামারীর উদ্ভব ঘটেছিল সাইবেরিয়া এবং কাজাখস্তানে। পরে মস্কো ভ্রমণ করে ফিনল্যান্ড এবং তারপরে পোল্যান্ডে পাড়ি জমায় এই ফ্লু, যেখান থেকে এটি ইউরোপের বাকী অংশে ছড়িয়ে পড়ে। পরের বছর নাগাদ এটি মহাসাগর পেরিয়ে উত্তর আমেরিকা এবং আফ্রিকাতে প্রবেশ করে। ১৮৯০ এর শেষদিকে, এই ফ্লু এর তান্ডবে ৩৬০,০০০ লোক মারা যায়। 
cover
১৯১৮: স্প্যানিশ ফ্লু
cover
এভিয়ান-বাহিত ফ্লু যার ফলে বিশ্বব্যাপী ৫০ মিলিয়ন (৫ কোটি) লোক মারা গিয়েছিল,১৯১৮ সালের এই ফ্লু প্রথম ধরা পড়ে ইউরোপ, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এবং এশিয়ার কিছু অঞ্চলে, এরপর খুব দ্রুতই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে যায়। এই ঘাতক ফ্লু স্ট্রেনের চিকিত্সার জন্য তখন কোনও কার্যকর ওষুধ বা ভ্যাকসিন ছিল না।
১৯১৮ সালের বসন্তে মাদ্রিদে ফ্লুর প্রাদুর্ভাবের ওয়্যার সার্ভিস রিপোর্টের ফলে মহামারীটি ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ নামে পরিচিত।

অক্টোবরের মধ্যে, কয়েক হাজার আমেরিকান মারা যায় এবং মৃতদেহ সৎকারের স্থান ঘাটতি সংকট পর্যায়ে পড়ে যায়। তবে এই ফ্লুর মৃত্যু হুমকি ১৯১৯সালের গ্রীষ্মের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায় যখন আক্রান্তদের বেশিরভাগই শরীরে অনাক্রম্যতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন অথবা ততদিনে মারা গিয়েছিলেন। 
১৯৫৭: এশিয়ান ফ্লু
হংকং থেকে শুরু করে পুরো চীন এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এশিয়ান ফ্লু। ইংল্যান্ডে ব্যাপক আকার ধারণ করে, যেখানে ছয় মাসের মধ্যে ১৪,০০০ লোক মারা গিয়েছিল। ১৯৫৮ সালের গোড়ার দিকে এর দ্বিতীয় তরঙ্গ ঘটে, কেবলমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই ১১৬,০০০ মানুষের মৃত্যু এবং বিশ্বব্যাপী প্রায় ১.১ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। পরবর্তীতে একটি কার্যকরী ভ্যাকসিন তৈরি হয় এবং মহামারীকে অনেকটা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। 
১৯৮১: এইচআইভি/এইডস
cover
১৯৮১ সালে প্রথম সনাক্ত হয়েছিল এইডস, এটি আক্রান্ত ব্যাক্তির দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থা একেবারে ধ্বংস করে দেয়, ফলস্বরূপ এমন অনেক রোগে রোগী মৃত্যুর মুখোমুখি হয় যে রোগগুলোতে শরীর সাধারণত লড়াই করে থাকে। এইচআইভি ভাইরাসে সংক্রামিতরা জ্বর, মাথা ব্যথা এবং পরে বর্ধিত লিম্ফ নোডের ইনফেকশনের মুখোমুখি হয়। যখন লক্ষণগুলো হ্রাস পেতে থাকে, বাহকরা রক্ত ​​এবং যৌনাঙ্গ তরলের মাধ্যমে অত্যন্ত সংক্রামক হয়ে উঠে এবং এই রোগটি দেহের টি-কোষগুলি ধ্বংস করে দেয়।

আমেরিকান সমকামী সম্প্রদায়গুলোতে এইডস প্রথম ধরা পড়ে। তবে ১৯২০ এর দশকে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আসা শিম্পাঞ্জি ভাইরাস থেকে এটি বিস্তার লাভ করেছিল বলে মনে করা হয়। শরীরের নির্দিষ্ট কিছু তরলের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই রোগটি ১৯৬০ এর দশকে হাইতি এবং তারপরে নিউ ইয়র্ক এবং সান ফ্রান্সিসকোতে ব্যাপক হারে প্রসার লাভ করে। এই রোগের অগ্রগতি মন্থর করার জন্য অনেক চিকিত্সা পদ্ধতির বিকাশ ঘটানো হয়েছে, তবে এটি প্রথম ধরা পড়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ৩৫ মিলিয়ন মানুষ এইডস-এর ফলে মারা গিয়েছে এবং সম্পূর্ণ নিরাময় পদ্ধতি এখনও আবিষ্কার করা যায়নি। 
২০০৩: সার্স
কয়েক মাসে বেশ কয়েকটি আক্রান্তের ঘটনার পরে ২০০৩ সালে প্রথম সনাক্ত হয়েছিল এই সার্স। মনে করা হয় যে, তীব্র শ্বসনতন্ত্রের সংক্রমণের লক্ষণ নিয়ে উদ্ভূত হওয়া এই রোগটি সম্ভবত বাদুরের মাধ্যমে শুরু হয়ে, বিড়ালদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং তারপরে চীনে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তারপরে অন্যান্য ২৬ টি দেশে ৮০৯৬ জনকে সংক্রামিত করে এবং ৭৭৪৮ জন মারা যায়। সার্স শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা, শুকনো কাশি, জ্বর, মাথা এবং শরীরের ব্যথা দ্বারা পরিলক্ষিত হয় এবং হাঁচি-কাঁশি থেকে শ্বাসযন্ত্রের ফোঁটা দ্বারা ছড়িয়ে পড়ে।

তখন কোয়ারান্টাইন প্রচেষ্টা কার্যকর প্রমাণিত হয় এবং জুলাইয়ের মধ্যে ভাইরাসটির প্রকোপ ছিল এবং এরপর থেকে আর দেখা যায়নি। প্রাদুর্ভাবের শুরুতে ভাইরাস সম্পর্কে তথ্য গোপন করার চেষ্টা করার জন্য চীন অনেক সমালোচিত হয়েছিল। প্রাদুর্ভাবের প্রতিক্রিয়া এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত করার জন্য বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য পেশাদাররা সার্সকে এক জাগ্রত সচেতনতার সংকেত ঘন্টা হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন এবং এই মহামারী থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা H1N1, ইবোলা এবং জিকার মতো রোগগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যবহার করা হয়েছিল। 
২০১৯: কোভিড-১৯
cover
তিন মাসের মধ্যে ১১৪ টি দেশে ছড়িয়ে গিয়ে এবং ১১৮,০০০ এর বেশি লোককে সংক্রামিত করে মহামারী আকার ধারণ করার পর, ২০২০ সালের ১১ ই মার্চ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা COVID-19 ভাইরাসটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে মহামারী হিসেবে ঘোষণা করে। এবং এর সংক্রামণ উত্তরোত্তর বাড়া ছাড়া সমাপ্ত হবার কাছাকাছি কোথাও ছিল না।

COVID-19 একটি নভেল করোনাভাইরাস— একটি নতুন করোনাভাইরাস স্ট্রেন যা এর আগে মানুষের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় নি, তা দ্বারা সৃষ্ট রোগ।
রোগের লক্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শ্বাসকষ্ট, জ্বর এবং শুকনো কাঁশি, এবং নিউমোনিয়া ও মৃত্যুর কারণ হতে পারে। সার্সের মতো, এটি হাঁচি-কাঁশি থেকে ফোঁটার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

 চীনে প্রথম ধরা পড়ে এই রোগ, একেবারে প্রথম কেইসটি ছিল হুবেই প্রদেশে ১৭ নভেম্বর, ২০১৯। কিন্তু তখন তা বোঝা যায় নি, তাই একেবারে নতুন একটি রোগ বলে ধরা পড়ে নি। ডিসেম্বর মাসে আরও আটটি এরকম ঘটনা ধরা পড়ে, পরে গবেষকরা একে একটি অজানা ভাইরাস হিসেবে ইঙ্গিত করেন। 
cover
অনেকেই COVID-19 সম্পর্কে জ্ঞাত হয়েছিলেন যখন চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাঃ লি ওয়েইনলিয়াং সরকারী আদেশ অমান্য করে অন্যান্য চিকিত্সকদের কাছে সুরক্ষা সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশ করেছিলেন। পরের দিন, চীন WHO কে জানায় এবং লি'র বিরুদ্ধে একটি অপরাধের অভিযোগ আনে। লি এক মাস পরে কোভিড -১৯ এ আক্রান্ত থেকে মারা যান। কোনও ভ্যাকসিন না থাকায় ভাইরাসটি চীনা সীমান্ত ছাড়িয়ে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। শুধুমাত্র ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে, এটি ৭৫ মিলিয়নেরও বেশি লোককে সংক্রামিত করে এবং বিশ্বব্যাপী ১.৬ মিলিয়নেরও বেশি লোকের মৃত্যুর কারণ হয়।

নতুন সংক্রমণের সংখ্যা আগের চেয়ে দ্রুত বাড়ছে, গড়ে প্রতিদিন ৫০০,০০০ এরও বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বলে প্রতিবেদন করা হয়েছে। দেশে দেশে আক্রান্তের সংখ্যা উঠানামা করছে , কিন্তু আক্রান্ত বা মৃত্যু হার কোনটাই বন্ধ হচ্ছে না।   
cover
কয়েক ধরণের ভ্যাকসিন তৈরি হলেও কোন ভ্যাকসিনই সঠিকভাবে শতভাগ কার্যকরী হচ্ছে না। ভ্যাকসিন গ্রহণের পরেও অনেকে আক্রান্ত হচ্ছেন। আমরা এখন এই কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্য দিয়েই দিন অতিবাহিত করছি, এই মহামারীও বদলেছে কত কত প্রক্ষাপট, এবং দিন দিন বদলাচ্ছে পরিস্থিতি, এবং বদলাতে থাকবে আবার আগের মত সুস্থ, মহামারীবিহীন জীবন ফিরে আসার আগে পর্যন্ত।


তথ্যসূত্র


  • history.com 
  • Disease and History by Frederick C. Cartwright, published by Sutton Publishing, 2014.

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021