Link copied.
ইতিহাস বিখ্যাত পাচঁ ‘বাউন্টি হান্টার’ এর গল্প!
writer
অনুসরণকারী
cover
আমেরিকার ধূলোর রাজ্যে ঘোড়া ছুটিয়ে হান্টাররা একজনকে তাড়া করছে। স্বভাবতই প্রশ্ন আসবে সেই একজনকে তাড়া করার কারণ কD? সেটার উত্তর হচ্ছে কারণ সেই একজনের উপর “বাউন্টি” তথা পুরস্কার আছে, এই পুরস্কারের পেছনে যারা ছোটে তাদের বলা হয় “বাউন্টি হান্টার”। বাউন্টি হান্টার শব্দ যুগলের সাথে আমরা এখন বেশ পরিচিত। আমেরিকার ওয়েস্টার্ন বই গুলো যারা পড়েছেন বা এই নিয়ে তৈরি হওয়া সিনেমা দেখেছেন, তাদের এই বাউন্টি হান্টারদের সম্পর্কে ধারণা থাকার কথা। সাধারণ শিকারীদের থেকে এদের পার্থক্য হলো এরা মানুষদের শিকার করে বেড়ায়,যেই মানুষেরা  আইনের চোখ ফাঁকি দিয়েছে। আজকে তাদের কয়েকজনের সম্পর্কেই জানবো। তার আগে একটু বাউন্টি হান্টারদের ইতিহাস সম্পর্কে জেনে আসা যাক। 
আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে অনেক সময় এবং চলে যেতে হবে আরো অনেক দুরে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখনো স্বাধীন হয়নি, ব্রিটিশদের শাসন চলছে। সময়টা তখন ১৪৯২ সাল। বিচার ব্যবস্থা তখনো খুব বেশি সুসংগঠিত হয়নি। পুলিশের নেটওয়ার্কও তখনো গড়ে উঠেনি। ব্রিটিশ অধীনস্ত বিশাল মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রে অপরাধীরা তখনো পালিয়ে বেড়াতো আদালত থেকে। এজন্য তখনকার কতৃপক্ষ Fugitive recovery agent তথা বাউন্টি হান্টারদের নিয়োগ দেয়। যাদের কাজ হচ্ছে আদালতের শুনানি থেকে পালিয়ে বেড়ানো অপরাধীদের ধরে নিয়ে আসা।

যেই আমলের কথা বলছি তখনকার বিচার ব্যবস্থা খুব বেশি অস্পষ্ট ছিলো, কেউ যদি অপরাধ করে, সাক্ষ্য প্রমাণ অস্পষ্ট থাকলেও তাকে শাস্তি পেতে হতো, মাঝে মাঝে নিরাপরাধ মানুষও শাস্তি পেতো। এছাড়া তখনো মুচলেকা বা বেইল এর ধারণা আসে নাই, যার ফলে লঘু পাপে গুরুদন্ড পেতে হতো মানুষদের। এজন্য বেশীরভাগ মানুষই আদালত থেকে পালিয়ে বেড়াতো। যার জন্য এই বাউন্টি হান্টারদের নিয়োগ দেয়া হয়। তবুও সেই হান্টারদের বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা আরো অনেক পরে নেয়া হয়।

১৬৭৯ সালে ব্রিটিশ সংসদে Habeas Corpus Act পাস হয়, যেটি বিচার ব্যবস্থায় সর্বপ্রথম “বেইল” এর ধারণা আনে। অর্থাৎ অপরাধের মাত্রা তখন একটি নির্দিষ্ট অর্থ মুচলেকে দিয়ে জেল থেকে মুক্ত পেতে পারেন। এই আইন পাস হওয়ার ফলে বাউন্টি হান্টার দের কাজের সুযোগ বেড়ে যায়। কারণ যেহেতু এই আইনে অপরাধিদের মুক্ত হওয়ার সুযোগ আছে, অপরাধীরা এই আইন ব্যবহার করে পালিয়ে যেতে থাকেন, বাউন্টি হান্টাররাও তাদের পেছনে ছুটতে থাকেন। 
cover
বাউন্টি হান্টারদের স্বর্ণযুগ ছিলো ১৮৫০ থেকে ১৯১০ পর্যিন্ত। এই সময়টাকে আমেরিকার ইতিহাসে, “ওয়াইল্ড ওয়েস্ট “ বলা হয়। কারণ এই সময়ে আমেরিকার পশ্চিম দিকে বিশেষত উত্তর পশ্চিমে ইউরোপীয় সেটেলাররা তাদের বসতি সম্প্রসারণ শুরু করে, যার দরুণ কাউবয়, ইন্ডিয়ান, সেটেল্যারদের মধ্যে দন্দ্ব ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া অঞ্চলটি রুক্ষ হওয়ায় অপরাধীরা এখানে এসে আত্নগোপনে চলে যেত, এজন্য সেখানে অপরাধীদের মিলন মেলায় পরিণত হয়। আর বিভিন্ন রকম অপরাধ সংঘটিত হয়। আমেরিকার উপকথায় পরিণত হওয়া “বিলি দ্য কিড” এই ওয়াইল্ড ওয়েস্টেরই অংশ। এই অপরাধীদের ধরার জন্য সেখানকার শহরে তাদের ধরিয়ে দেয়ার জন্য বাউন্টি সম্বলিত পোস্টার ছেপে দেয়া হয়। এবং হান্টাররা মরিয়া হয়ে খুজতে থাকে তাদের সেই পুরস্কার পাওয়ার আশায়।

১৮৭৩ সালে ইউ এস সুপ্রীম কোর্ট বাউন্টি হান্টারদের ক্ষমতা আরো বর্ধিত করে। তারা হান্টার দের agents of bailbondsmen হিসেবে আখ্যায়িত করে। যার বেইল ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছে তাদেরকে ধরার জন্য প্রয়োজনে অন্য স্টেটে যেতে পারতো, দরকার পরলে তাদের বাড়িতে জোরপূর্বক ঢোকার অনুমতিও দেয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে bail reform act পাস হয়, যেখানে বাউন্টি হান্টারদের ক্ষমতা কমিয়ে আনা হয়।

এবার চলুন জেনে আসি, পাঁচজন বিখ্যাত বাউন্টি হান্টারদের সম্পর্কে। 
জন দ্যা প্রিস্ট
১৭০৯ সালে ব্রিটেনে পেনাল একট পাস হয়। যেখানে বলা হয় সকল ক্যাথলিক খ্রিষ্টান পাদ্রীদের তাদের ভ্যাটিকেনের আনুগত্যে নেয়া শপথ ভুলতে হবে এবং প্রোটেস্ট্যান্ট রানীকে সুপ্রীম হেড হিসেবে চার্চ অফ ইংল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ড মানতে হবে। এর অমান্য করলে মৃত্যুদন্ড ভোগ করতে হবে। জন মুলোওয়ানী একজন ঘোড় চোর হিসেবে গ্রেফতার করা হয়। তারপর থাকে অপশন দেয়া হয় যে, হয় মৃত্যুদন্ড না হয় পাদ্রী শিকারী। সে দ্বিতীয় অপশনটিই গ্রহণ করে। পাদ্রী শিকারে সে বেশ পারদ্ররশিতা দেখায়। একজন বিশপ বা আর্চবিশপ হত্যা করতে পারলে প্রায় ১০০ পাউন্ড পুরস্কার পেতো সে। তার কৌশল ছিলো সে একজন মৃত্যু পথযাত্রী হিসেবে ইশ্বরের কাছে নিজের পাপ স্বীকার করতে চেয়ে একজন বিশপের কাছে যেতো।

বিশপ যেই তার কাছে আসত সে তার কাজ সম্পাদন করতো। তবে একদিন সে তার কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়। ক্যাথলিক খ্রিষ্টানরা তাকে উপুর্যপরি আঘাত করে, হত্যা করে নদীতে ফেলে দেয়। পরে তার লাশ উদ্ধার করে সমাহিত করা হয়। কথিত আছে, তাকে যেখানে সমাহিত করা হয়, সেখানে একটি গাছ লাগানো হয়, তবে সেটিতে কখনো ফুল ফোটে নি। 
টমাস টোবিন
cover
১৮৬৩ সালে তিনজন মেক্সিক্যান সম্পর্কে কাজিন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোর, সান লুইস ভ্যালিতে ত্রিশ জন ইংলিশ আমেরিকানকে হত্যা করে। তারা এই হত্যাকান্ড ঘটায় মেক্সিক্যান আমেরিকান যুদ্ধে নিহত তাদের আত্নীয়দের প্রতিশোধ হিসেবে। যথারীতি তাদের ধরার জন্য তোলপাড় শুরু হয়, পুলিশ ব্যর্থ হওয়ার পর ডাক পড়ে, টমাস টোবিনের। যিনি একই সাথে একজন দুরন্ত শিকারি , ট্র্যাকার, সেনাবাহিনীর স্কাউট, পর্বতারোহী। তাকে নির্দেশ দেয়া হয় যে তাদেরকে জীবিত অথবা মৃত হিসেবে হাজির করতে হবে। তার সাথে কাজ করার জন্য ১৫ জন দেয়া হয়। তবে তার সেই দল দরকার হয় নি, তিনি যখন অভিযান শেষ করে ফিরেন তখন তার সাথে সেই তিন এস্পিওনাজের মাথা একটি বস্তায় করে নিয়ে আসেন।
প্যাট্রিক ফ্লয়েড ওরফে প্যাট গ্যারেট
cover
নভেম্বর ১৮৮০ সালে, নিউ মেক্সিকোর লিংকন কাউন্টির শেরিফ হিসেবে যোগ দেন প্যাট গ্যারেট। তিনি আগে থেকে বন্দুক চালনার দক্ষতা নিয়ে খ্যাতিমান ছিলেন। তার শেরিফ হওয়ার কিছুদিন পরেই ২১ বছর বয়স্ক হেনরী ম্যাকার্থি জেল পালায়। তার নামে অভিযোগ ছিলো সে যেখানেই থেকেছে সেখানেই সে হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। ধুরন্ধর এই অপরাধিকেই “বিলি দ্য কিড” নামে ডাকা হতো। যেটা বর্তমান আমেরিকায় একটি উপকথায় পরিণত হয়েছে। তাকে জীবিত ধরে দিতে পারলে ৫০০ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। প্যাট গ্যারেট তার পিছু নেয়, বিলি দ্যা কিডের সাথে তার চোর পুলিশ খেলা চলতেই থাকে। অবশেষে এক রাতে তিনি বিলির দলকে এমব্যুশ করতে যান, সেখানে তিনি বিলি দ্যা কিড কে হত্যা করেন। যেহেতু তাকে জীবিত ধরতে পারেননি তাই সেজন্য পুরস্কার ও পাননি। তবে অনেকে মনে করেন বিলি দ্য কিড সেই রাতে মার যায়নি, প্যাট মিথ্যা ঘটনা সাজিয়েছিলেন। যদিও ইতিহাস তাকে বিলি দ্যা কিডের হন্তারক হিসেবে মনে রেখেছে। বিলির সেই বোমাঞ্চকর গল্প গুলো আরেকদিন বলবো
cover
র‍্যালফ “পাপা” থরসন
cover
সংখ্যার দিক থেকে পাপা থরসনের ধারে কাছে কেউ নেই। জীবদ্দশায় তিনি প্রায় বারো হাজার অপরাধীর কেচ্ছা খতম করেছেন। তার কৌশল ও ভিন্ন ছিলো, তিনি অপরাধিদের খুজে পেতে জোতির্বিদ্যার প্রয়োগ করতেন এমন কি একটি নতুন ধরণের বন্দুক ও ব্যবহার করেছেন যেটাকে তিনি বলতেন Prowler Fowler। তাকে নিয়ে সিনেমাও তৈরী হয়েছে The hunter নামে। ১৯৯৪ সালে একটি গাড়িবোমা বিস্ফোরণে তিনি মারা যান। তার সাড়ে বারো হাজার শত্রুর মধ্যে কেউ একজন এই ঘটনা ঘটায়। 
ডমিনো হার্ভি
cover

হার্ভি হচ্ছেন এই প্রজন্মের বিখ্যাত বাউন্টি হান্টার দের একজন। তার জন্ম ১৯৬৯ সালে, ছোট বেলা থেকেই তার মার্শাল আর্ট এবং একশন তারকাদের উপর আগ্রহ ছিলো। যার কারণে তার হাব ভাবে মেয়ে সুলভ আচরণ কম পাওয়া যেত। পড়াশোনা হয়নি তার দ্বারা সেভাবে, স্কুল থেকে এক্সপেল হওয়ার পর ১৯৯৩ সালে তিনি লস এঞ্জেলেস ফায়ার সার্ভিসে যোগ দেন। ঐ সময়েই তিনি বেইল রিকভারি এজেন্ট তথা বাউন্টি হান্টারে নিজের নাম লেখান। এরপর থেকেই তিনি তার নিজের দক্ষতা দেখানোর সুযোগ পান। তিনি শুরুতে ড্রাগ ডিলার এবং চোরদের ধরা শুরু করেন পরবর্তীতে তিনি খুনীদের পিছনেও ছোটেন। তিনি এতোটাই দক্ষ হয়ে গিয়েছিলেন যে, বছরে প্রায় ৪০ হাজার ডলার আয় করতেন। দুর্ভাগ্যবশত ড্রাগের পেছনে ছুটতে গিয়ে তিনি নিজেও মাদক সেবী হয়ে পড়েছিলেন। ২০০৫ সালে অতিরিক্ত মাদক নেয়ার ফলে তার মৃত্যু হয়।  
বর্তমানে বাউন্টি হান্টারদের আগের মতো কতৃত্ব বা ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ নেই। তবে বছরের পর বছর বাউন্টি হান্টাররা পুলিশের পাশাপাশি অপরাধী দমনে কাজ করছে। একজন মানুষ যদি এডভেঞ্চার প্রেমী হয় তাহলে তার কাছে একটা সুযোগ থেকে সেটাকে পেশা হিসেবে নেয়ার। তবে অনেক কিন্তু ও আছে, বাউন্টি হান্টার যে সব সময় সৎ ভালো মানুষ হবে সেটার কোনো নিশ্চয়তা নেই।আর সেই নিশ্চয়তা না পাওয়া গেলে একজন বাউন্টি হান্টার যমদূত হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে। 
তথ্যসূত্র:
  • https://www.history.co.uk/article/5-famous-bounty-hunters
  • https://bestglitz.com/10-wild-and-true-stories-of-notorious-bounty-hunters/https://people.howstuffworks.com/bounty-hunting4.
  • https://www.bountyhuntereducation.org/history-bounty-hunters/
  • https://www.biography.com/news/wild-west-figures
  • https://www.become-a-bounty-hunter.com/Bounty_Hunting_History.html#context/api/listings/prefilter

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021