Link copied.
রেডিয়ামের সর্বাত্মক ব্যবহার এবং রেডিয়াম কন্যাদের মর্মান্তিক মৃত্যুযাত্রা
writer
অনুসরণকারী
cover
রেডিয়াম আবিষ্কার করেন কিংবদন্তী আবিষ্কারক ম্যারি কুরি। ১৮৯৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কালজয়ী এই আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছিলেন কুরি দম্পতী। তৎকালীন সংবাদমাধ্যমগুলো রেডিয়ামকে এমনভাবে প্রচার করেন যা খুব অল্প সময়ের মাঝে পৌঁছে যায় ইউরোপ এবং আমেরিকায়। আবিষ্কারক ম্যারি কুরি এটিকে খুবই ভালোবাসতেন এবং বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির প্রোগ্রামে এর গুণগান প্রচার করতেন। রেডিয়াম নিয়ে ইউরোপিয়ানদের মধ্যে উন্মাদনা চলতে থাকে। মানুষ তখনও এটির তেজস্ক্রিয়তা সম্পর্কে কোনোপ্রকার তথ্য জানতে পারেনি। স্বয়ং আবিষ্কারক ম্যারি কুরিও প্রথমদিকে তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে কিছু জানাননি।
cover
রেডিয়াম দ্বারা প্রস্তুতকৃত পণ্যসামগ্রীতে ইউরোপের বাজার সয়লাব হয়ে যায়। টুথপেস্ট থেকে শুরু করে খাবার, প্রসাধনী, পানীয় এবং শক্তিবর্ধক ঔষধেও রেডিয়ামের ব্যবহার প্রতিনিয়ত বেড়ে চলে। প্রথমদিকে চিকিৎসকরা এটিকে ক্যান্সারের ঔষধ হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ প্রদান করেন। এছাড়াও শক্তিবর্ধক ঔষধ হিসেবেও অনেক ক্রীড়াবিদ রেডিয়াম গ্রহণ করতেন। এমনি একজন ছিলেন এবেন বায়ার্স। তিনি বেশ ঘটা করেই নিয়মিত রেডিয়াম পান করতেন। ১৯৩২ সালে তিনি যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন তার মুখের চোয়াল খুলে পড়ে যা দেখে মোটামুটি সবাই ভীতসন্ত্রস্ত হয়েছিল। 
১৯১০ এর দশকে রেডিয়ামের ব্যবহার যখন তুঙ্গে তখনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয়তা পায় একধরণের বিশেষ ঘড়ি। এটি অন্ধকারে জ্বল জ্বল করতো বলে মার্কিনিদের নিকট এটি আভিজাত্যের বস্তুতে পরিণত হয়। অন্ধকারে ঘড়িগুলোর ডায়াল জ্বলতে দেখা গেলেও দিনে সূর্যালোকে এটি চার্জ দেয়ার প্রয়োজন পড়ত না। মূলত তখন ঘড়িগুলোর কাঁটা এবং ডায়াল নম্বরে এক প্রকার বিশেষ রং ব্যবহার করা হতো যা উজ্জ্বলতা প্রকাশ করতো। এই বিশেষ রং তৈরিতে ব্যবহার করা হতো সদ্য আবিষ্কৃত রেডিয়াম। তখনও ব্যবহারিক পরিস্থিতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রিত ছিল।
cover
কিন্তু ১৯২০ এর দশকে ঘড়ি তৈরিকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা যেমন বাড়তে থাকে তেমনি বাড়তে থাকে শ্রমিকেরা সংখ্যাও। তৎকালীন সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী এই বিশেষ ঘড়ি কারখানায় কাজ করে তেজস্ক্রিয়ায় মৃত্যুবরণ করা প্রথম ব্যক্তি ছিলেন অ্যামিলিয়া মলি ম্যাগিয়া। ২২ বছর বয়সী এই নারী নিউ জার্সির একটি কারখানায় কাজ করতেন। তার মৃত্যুর সময় কারণ হিসেবে সিফিলিস রোগ উল্লেখ করা হলেও তার মৃত্যু রহস্য নিয়ে খুব আলোচনা হতে থাকে। ততদিনে রেডিয়ামের ভয়াবহতা সবার মাঝেই পরিচিতি পেয়েছে। ১৯২৭ সালের ১৫ অক্টোবর তারিখে রোজডেল সিমেট্রিতে অবস্থিত তার কবর খুঁড়া হয়। মাটির নিচ থেকে তার কফিন উঠিয়ে যখন খোলা হয় তখন দেখা যায় ম্যাগিয়ার নিথর দেহ থেকে খুব অল্প অল্প করে আলো বিকিরিত হচ্ছিল। এই ঘটনার পর গবেষকরা তাড়াহুড়ো করে রেডিয়ামের ব্যবহার কমিয়ে আনেন। ইউরোপের দেশগুলো রেডিয়ামের ব্যবহারে নানারকম নিষেধাজ্ঞা জারি হয়।
রেডিয়াম ঘড়ির উৎপত্তি

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সর্বপ্রথম এই ঘড়ির কারখানা স্থাপন করা হয় ১৯১৬ সালে। নিউ জার্সিতে মাত্র ৭০ জন নারী শ্রমিক নিয়ে ব্যবসা শুরু করে একটি প্রতিষ্ঠান। যদিও এর কয়েক বছরের মাথায় বেড়ে যায় কারখানা এবং শ্রমিকে সংখ্যা। এবং এই কাজে ৯০ শতাংশ শ্রমিক ছিলেন নারী। ঘড়ির ডায়ালে রং লাগানোর কাজটি ছিল খুবই সূক্ষ্ম। আর এই কারণেই নারীদের চাহিদা ছিল এই কাজে সবচেয়ে বেশি। সূক্ষ্ম তুলির মাধ্যমে দিনভর রং করতেন নারী কর্মীরা। রেডিয়ামকে তৎকালীন সমাজে আভিজাত্যের এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যে ঘড়ি কারখানায় কাজ করা নারীদের বলা হতো রেডিয়াম গার্ল।
cover
সেকালে ১ গ্রাম রেডিয়ামের বাজারমূল্যকে বর্তমান বাজারমূল্যের রূপান্তর করলে প্রায় ২.২ মিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকবে। রেডিয়াম গার্লরা সমাজে তখন উঁচু স্তরের সম্মান পেতেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনজীবনে তখন তারা ছিলেন খুবই সম্মানিত। আর এই কাজে তাদের বেতনও ছিল অনেক অনেক বেশি। কোনো কোনো কারখানায় নারী শ্রমিকদের একে অপরের চেয়ে তিনগুণ বেশি বেতন পেতো বলেও শোনা যায়। সমাজে শিল্পীর মর্যাদা এবং উচ্চ বেতনের লোভে অনেক নারীই এই পেশায় ঝুঁকতে থাকেন। আর সবথেকে মজার বিষয় হলো রেডিয়াম কন্যারা রেডিয়াম নিয়ে কাজ করায় নিজেদের সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হচ্ছেন বলে ভাবতেন।
তেজস্ক্রিয়তা শুরু

গবেষকদের তথ্যানুযায়ী রেডিয়াম মানবদেহে ক্যালসিয়ামের মতোই কাজ করে। ক্যালসিয়াম যেমনভাবে রাসায়নিক হিসেবে খুব বেশি সক্রিয়তা দেখায় রেডিয়ামও এমন সক্রিয়তা দেখায়। আমরা জানি যে দেহের হাড় গঠনে ক্যালসিয়াম কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। আর ঠিক এই কারণেই দেহে প্রবেশকৃত রেডিয়াম ক্যালসিয়ামের মতোই হাড়ের মধ্যে ঢুকে যায়। রেডিয়াম সেবনের প্রধান স্বাস্থ্য ঝুঁকি হলো বিকিরিত এবং প্ররোচিত হাড়ের নেক্রোসিস ঘটা একইভাবে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া। কতো তাড়াতাড়ি মানবেদেহে রেডিয়ামের বিকিরণ ঘটবে তা নির্ভর করে কি মাত্রায় এটি সেবন করা হয়েছে তার উপর।
রেডিয়াম কন্যারা ঠোঁটের মাধ্যমে সূক্ষ্ম কাজে এই রং ব্যবহার করতেন বলে তাদের শরীরে অতি সহজে রেডিয়াম প্রবেশ করতো। কারণ ঘড়ির কাঁটাগুলোতে মিলিমিটার হিসেবে রং করতে হতো। আর কাজটি করতে গেলে রং করার ছোট্ট দণ্ডটি বরাবরই নাকমুখ এবং চোখের খুব নিকটে রাখতেন তারা। ১৯২০ এর দশকে রেডিয়াম কন্যাদের মাঝে রেডিয়ামের বিষক্রিয়ার নানারকম লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়। তারা দাঁতে ব্যাথা এবং অবসাদে সবথেকে বেশি ভুগতেন। ১৯২২ সালে ম্যাগিয়ার মৃত্যু ঘটলেও যখন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন অনেকবার ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। রেডিয়ামের উচ্চ তেজস্ক্রিয়তায় তার নিচের চোয়ালের হাড় এতটাই ভঙ্গুর হয়েছিল যে ডাক্তার সেটি ধরে টান দেয়া মাত্রই খুলে এসেছিল। 
cover
শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ ছিল না রেডিয়াম কন্যাদের অসুস্থতা। একে একে প্রায় প্রতিটি কারখানায় নিয়োজিত নারীরা অসুস্থ হয়ে পড়েন। বেশিরভাগ নারীর দাঁত ক্ষয়ে পড়ে এবং চোয়ালে আলসারের মতো রোগের সৃষ্টি হয়। আবার অনেক রোগীকে স্পর্শ করা মাত্রই বিভিন্ন স্থানের হাড় খুলে পড়তো এবং শরীরে মারাত্মকভাবে রক্তক্ষরণ হতো। এত এত অসুস্থতা স্বত্ত্বেও প্রথম কয়েক বছর এই কাজ থেকে সরে দাঁড়াননি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রেডিয়াম ঘড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। মূলত এত এত বিনিয়োগের কারণে অতিসত্বর তারা ব্যবসা বন্ধ করতে চায়নি। এছাড়াও প্রথমদিকে এই রোগ সমূহ রেডিয়ামের তেজস্ক্রিয়তায় ঘটছে বলে অনেকেই মানতে চাইতো না। কারণ তখনও গবেষকরা এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করতে পারেননি।
রেডিয়াম ঘড়ির বিলুপ্তি

১৯২২ সালের পর মোটামুটি তোলপাড় পড়ে যায় রেডিয়ামের ব্যবহার নিয়ে। কারণ ততদিনে এর ব্যবহার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যাতে করে এটি নিষিদ্ধ করাও সম্ভবপর হচ্ছিল না। ফ্রান্স এবং জার্মানি এরই মধ্যে অনেকগুলো ক্ষেত্রে রেডিয়াম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আইনের প্যাঁচে পড়ে তখনও রেডিয়াম ব্যবহৃত হচ্ছিল। অতঃপর ১৯২৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আদালতে মামলা করেন মার্কিন নারী গ্রেস ফ্রেইয়ার। যদিও ধনকুবের সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লড়তে হিমশিম খেতে হয়েছিল তাকে। মামলার পর আদালতে আইনজীবী পেতেও বছরখানেকের বেশি সময় অতিবাহিত হয়।
cover
আইনজীবী লিওনার্ড গ্রসম্যান রেডিয়ামের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন। তিনি ফ্রেইয়ারকে সঙ্গে নিয়ে আরো কয়েকজন রেডিয়াম কন্যাকে একত্র করে সবকটা ঘড়ি তৈরিকারক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মূলত আদালতের স্বার্থেই নিউ জার্সির সমাধিস্থল থেকে উত্তোলন করা হয়েছিল ১৯২২ সালে মৃত্যুবরণ করা ম্যাগিয়ার কফিন। আদালতে রেডিয়ামের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার জন্য করা মামলাটি সম্পর্কে গোটা বিশ্বে তোলপাড় শুরু হয়। যদিও শেষপর্যন্ত ব্যবসায়ীরা আদালতে টিকতে পারেনি। রেডিয়াম কন্যারা মামলায় জিতে যায়। যদিও এরপর এক দশক ধরে আদালতে আপিল করতে থাকেন প্রতিষ্ঠানগুলো। ১৯৩৯ সালে রেডিয়ামের পক্ষে সর্বশেষ আপিলটি খারিজ করে দেয় মার্কিন আদালত। 
cover
১৯৩৮ সালে মার্কিন সরকার সকল পণ্য তৈরি, বাজারজাতকরণ এবং প্রচারণায় রেডিয়ামের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেন। যদিও ঘড়ির কালি তৈরিতে তখনও গোপনে ব্যবহৃত হচ্ছিল এই তেজস্ক্রিয় উপাদান। অতঃপর ১৯৬৮ সালে আইন প্রণয়ন করে ঘড়িতে রেডিয়াম রং ব্যবহার সর্বাত্মকভাবে প্রতিহত করে দেশটির সরকার। অন্যদিকে, কারখানায় কাজ করা নারীরা ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করে যার নিষ্পত্তি হতে অনেক সময় অতিবাহিত হয়েছিল। বৈজ্ঞানিক হিসেবে তখন বলা হয়েছিল রেডিয়াম মানবেদেহে ১৬০০ বছর যাবত টিকে থাকতে পারে। তখন সর্বমোট কতো সংখ্যক রেডিয়াম কন্যা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কিংবা মৃত্যুবরণ করেন সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো উল্লেখ নেই। 

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021