আমেরিকার গুপ্তধন: সল্টন সাগরের গভীরে রহস্যজনক লিথিয়াম ভ্যালি!
আন্তর্জাতিক
আমেরিকার গুপ্তধন: সল্টন সাগরের গভীরে রহস্যজনক লিথিয়াম ভ্যালি!
বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স কাজে প্রায়শই লিথিয়ামের প্রয়োজন পড়ে। যদিও এর উৎপাদন ক্রমবর্ধমান চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত নয়।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
ক্যালিফোর্নিয়ার তথাকথিত লিথিয়াম ভ্যালির বিষয়ে আমরা কমবেশি অনেকেই জানি। বিজ্ঞানীদের দাবি, পরবর্তী কয়েকশত বছর লিথিয়ামের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ নেই। তাদের আশা, সল্টন সাগরে প্রচুর পরিমাণে লিথিয়াম থাকতে পারে। তবে এসব উত্তোলন করা অনেকটাই কঠিন। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার থেকে ক্রমেই সরে এসে পৃথিবীতে এখন বৈদ্যুতিক যানবাহন আরও সর্বব্যাপী হয়ে উঠছে। বৈদ্যুতিক যানবাহন ও পণ্যের পরিবেশগত সুবিধা থাকলেও এর বেশকিছু সীমাবদ্ধতা ও দুষ্প্রাপ্যতা রয়েছে।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
বৈদ্যুতিক যানবাহনে শক্তি সঞ্চয় করে রাখা ব্যাটারিতে ব্যবহার করা হয় লিথিয়াম। যা এখনও দুষ্প্রাপ্য উপাদানের তালিকায় রয়েছে। সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের একটি দল গভীর-আর্থ লিথিয়ামের মানচিত্র তৈরি করার পরিকল্পনা করেছেন। যাতে করে টেকসইভাবে উপাদানটির জন্য আমেরিকার অতৃপ্ত চাহিদা সরবরাহ করার সম্ভাব্যতা যাচাই করা যায়। আজ আমরা জানবো আমেরিকার নিকট থাকা পরবর্তী প্রজন্মের এসকল লিথিয়াম রহস্য নিয়ে।
চ্যালেঞ্জ
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
মার্কিন গাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ক্যাডিলাক জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তারা পুরোদমে বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণ শুরু করবে।
ইলেকট্রনিক ডিভাইস এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের উৎপাদন ও বিপণন আরও বিস্তৃত করতে গেলে লিথিয়ামের ব্যবহার স্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে। এতে করে লিথিয়ামের ব্যাপক সংকট দেখা দিবে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী গত বছর, লিথিয়ামের ব্যবহার ও দাম ৪০০ শতাংশ বেড়েছে। মার্কিন গাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ক্যাডিলাক জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তারা পুরোদমে বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণ শুরু করবে। এছাড়াও জিএমের লক্ষ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে শুধুই বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন করা। জাপানি প্রতিষ্ঠান হোন্ডাও বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনের ঘোষণা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০৪০ সালের মধ্যে গ্যাস ও জ্বালানি দ্বারা পরিচালিত গাড়িসমূহকে বৈদ্যুতিক গাড়িতে রূপান্তর করার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
যদি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুতভাবে বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন শুরু করে তাহলে বলা যায় শিগগির লিথিয়ামের দাম ও চাহিদা কয়েকশত গুণ বেড়ে যাবে। আর এর জন্য ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে উৎপাদনকারীরা। রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহারের জন্য কিছু ব্যাটারি ইতোমধ্যেই বিপণন করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু এটি আমাদের মোট চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। আবার এসব রিসাইকেল হওয়া ব্যাটারির দক্ষতাও প্রশ্নবিদ্ধ। তবে গবেষকরা এখন এর বিকল্প হিসেবে 3D-প্রিন্টেড সলিড-স্টেট ব্যাটারি, গাছ থেকে তৈরি ব্যাটারি বা কেভলার মেমব্রেন এবং ফ্লো ব্যাটারি বাজারজাত করা শুরু করেছে। তবে এসবের কোনোটিই লিথিয়ামের সমকক্ষ নয়, শক্তি ও কার্যক্ষমতার দিকদিয়ে। 
নতুন সম্ভাবনা
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
সল্টন সাগর হলো ক্যালিফোর্নিয়া মরুভূমির একটি স্থল-অবরুদ্ধ লবণের হ্রদ। সাগর নাম হিসেবে এটি যতোই অদ্ভুত শোনাক না কেন, এর পৃষ্ঠের নীচে নোনতা, অতি উত্তপ্ত জলাধারটি প্রচুর ভূ-তাপীয় শক্তি সরবরাহের নিশ্চয়তা দেয়। এই পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদিত হয় যখন গরম তরলগুলো ভূপৃষ্ঠের গভীর থেকে উপরে আনা হয় এবং তাপ বিদ্যুতে রূপান্তর করা হয়। বর্তমানে, ১১টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সল্টন সাগরের ভূতাপীয় ক্ষেত্রে শক্তি উৎপাদন করছে। একবার তরল ঠান্ডা হয়ে গেলে, এটি সাধারণত গভীর ভূগর্ভে তার উৎসে ফিরে আসে। কিন্তু অনেক বিজ্ঞানীই আশা করেন যে এটি থেকে প্রথমে লিথিয়াম বের করে দুই-একটি শক্তি পাওয়া যাবে।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
সাল্টন সি জিওথার্মাল সিস্টেম হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে লিথিয়ামের জন্য প্রাথমিক সম্ভাব্য জিওথার্মাল রিসোর্স এবং এটি একটি বিশ্বমানের সম্পদ। কিন্তু সম্পদের আকারের পরিপ্রেক্ষিতে বিস্তৃত অনুমান রয়েছে এবং লিথিয়াম কোথা থেকে আসে তার যৌক্তিক অনুসন্ধান নেই।
সল্টন সাগরের গভীরে থাকা রাসায়নিকগুলোতে আমেরিকার সমস্ত ঘরোয়া ব্যাটারির চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট লিথিয়াম থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও একে টেকসই ও বিশুদ্ধভাবে নিষ্কাশন করা সহজ কাজ নয়। তবে বর্তমান সময়ে চীন এবং অস্ট্রেলিয়া মাটির নিচ থেকে লিথিয়াম উৎপাদন শুরু করেছে। খোলা গর্ত থেকে লিথিয়াম খনন করলে বায়ু এবং ভূগর্ভস্থ পানিকে দূষিত করতে পারে। সে সাথে পানির সম্পদকে হ্রাস করতে পারে। এমনকি অন্যান্য নিষ্কাশন বিকল্পের সাথেও, বর্তমান খনির কৌশল চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। বার্কলে ল্যাবের প্যাট ডবসন বলেন, 'সাল্টন সি জিওথার্মাল সিস্টেম হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে লিথিয়ামের জন্য প্রাথমিক সম্ভাব্য জিওথার্মাল রিসোর্স এবং এটি একটি বিশ্বমানের সম্পদ। কিন্তু সম্পদের আকারের পরিপ্রেক্ষিতে বিস্তৃত অনুমান রয়েছে এবং লিথিয়াম কোথা থেকে আসে তার যৌক্তিক অনুসন্ধান নেই।' 
সমাধানের জন্য ম্যাপিং
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
লরেন্স বার্কলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির নেতৃত্বে বিজ্ঞানীদের একটি দল লিথিয়ামের উৎস, ব্যাপ্তি এবং দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা ম্যাপ করার পরিকল্পনা করেছে যা সল্টন সাগরের ভূ-তাপীয় ব্রিন থেকে বের করা যেতে পারে। ইউসি রিভারসাইড জিওকেমিস্ট মাইকেল ম্যাককিবেন ফ্রিথিঙ্ককে বলেন, 'এই কাজটি আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গার্হস্থ্য লিথিয়াম নিষ্কাশন ও লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদন আমাদের পরিবহন এবং বৈদ্যুতিক গ্রিডগুলোকে পুনর্নবীকরণযোগ্য ও সবুজ করার একটি উপায় প্রদান করে৷ এই মুহুর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রায় সমস্ত লিথিয়াম এবং লিথিয়ামজাত ব্যাটারি জাহাজযোগে এশিয়া থেকে আমদানি করে। ইম্পেরিয়াল কাউন্টি সার্বিকভাবে দরিদ্র তাই লিথিয়াম নিষ্কাশনের বিকাশ সেখানে জিওথার্মাল ব্রাইন থেকে, কাছাকাছি ব্যাটারি উৎপাদন সুবিধাগুলো সনাক্ত করার সম্ভাবনার সাথে, সেখানকার গরিব সম্প্রদায়ের জন্য একটি অসাধারণ অর্থনৈতিক আশীর্বাদ প্রদান করতে পারে।" 
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
তবে খাতটিকে লাভজনক করতে হলে প্রথমেই এর প্রযুক্তিগত দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। একটি উদ্দেশ্য হলো লিথিয়াম কত দ্রুত ক্ষয় হবে তা খুঁজে বের করা। আবার যদি এটি ক্রমাগত পুনরায় পূরণ করা হয়, এটি কোথা থেকে আসে সেটি নির্ণয় করা। ওই গবেষক দলটি শক্তি-বিচ্ছুরণকারী এবং লেজার অ্যাবলেশন যন্ত্র ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেছে, যা রাসায়নিক বিশ্লেষণ করতে অনেক লেজার ব্যবহার করে। যদি লিথিয়াম ঠিক কোথায় এবং কী আকারে রয়েছে তা জেনে তারা হিসাব করতে পারে তাহলে আমাদের এগুলো ঠিক কতোটা কাজে লাগতে পারে তা জানা যাবে। তবে গবেষক দলটি প্রাথমিক অনুমান থেকে নিশ্চিত করে জানিয়েছে সেখানে লাখ লাখ টন লিথিয়াম লুকিয়ে থাকতে পারে। এই প্রসঙ্গে ম্যাককিবেন বলেন, 'এটি হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় লিথিয়ামের ব্রাইনের উৎস, যে কোনো দক্ষিণ আমেরিকান স্যালার ডিপোজিটের চেয়েও বড়। সুতরাং, এটি একটি বড় সংখ্যা এবং এর অর্থনীতিক সম্ভাবনা রয়েছে। আশা করা যায় ৫০ থেকে ১০০ বছর সেখান থেকে লিথিয়াম উৎপাদন করা যাবে।'
তথ্যসূত্র: বিগ থিঙ্ক
আন্তর্জাতিকযুক্তরাষ্ট্র
আরো পড়ুন