সক্রেটিস: দার্শনিক নাকি গ্রিক ঐতিহাসিকদের সৃষ্ট কাল্পনিক কোনো চরিত্র?
আন্তর্জাতিক
সক্রেটিস: দার্শনিক নাকি গ্রিক ঐতিহাসিকদের সৃষ্ট কাল্পনিক কোনো চরিত্র?
Image Credit: medium.com
Image Credit: medium.com
মহামানব সক্রেটিস! পৃথিবীতে যত বড় বড় দার্শনিকের জন্ম হয়েছে তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। আবার কারো কারো মতে তিনিই সবথেকে বড় দার্শনিক। প্রাচীন গ্রিসের এথেন্সে খ্রিস্টপূর্ব ৪৬৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তবে তার শৈশব সম্পর্কে তেমন কিছুই জানেন না ইতিহাসবিদরা। এই কারণেই তার শৈশব জীবনের তুলনায় কর্মজীবন নিয়ে বেশি জানতে পেরেছি আমরা। তর্কাতীতভাবে সক্রেটিসের চেয়ে অন্য কোনো দার্শনিক দর্শনে বেশি প্রভাব ফেলতে পারেনি। যদিও এই বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে ইউরোপিয়ান ইতিহাসবিদদের মধ্যে। তবুও সর্বাধিক মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গেলে সবার আগে সক্রেটিসের নামই আসবে। তার আবিষ্কৃত অন্যতম প্রসিদ্ধ, 'সক্রেটিক পদ্ধতি'র কারণে তিনি বেশ সুখ্যাতি কুড়িয়েছেন। মূলত এটি ছিল তর্কমূলক কথোপকথনের একটি রূপ যেখানে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি একে অপরের চিন্তাধারা ও প্রস্তাব নিয়ে তর্কাতর্কি করেন। যদিও জীবদ্দশায় এই সক্রেটিক পদ্ধতির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেখে যেতে পারেননি সক্রেটিস। তার মৃত্যুর পর বিতর্ক বা তর্কমূলক কথোপকথন বেশ সুনাম অর্জন করে।
কর্মজীবনে মহামানব সক্রেটিস যেসকল কার্যসম্পাদন করেছেন তা তিনি কখনোই লিখে রাখেননি। বরঞ্চ লিখে রাখার পরিবর্তে তিনি কথোপকথনের মাধ্যমে মানুষজনের সঙ্গে নিজের ধারণাগুলো ভাগাভাগি করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। আর এই কারণেই সক্রেটিসের কাজ, ধ্যানধারণা কিংবা সম্পাদিত ঐতিহাসিক সব গবেষণা আমরা তার নিজ হাতে লেখা কোনো কাগজে কিংবা বইতে পাইনি। গবেষকরা এক পর্যায়ে মেনে নিয়েছেন যে সক্রেটিস লেখার পরিবর্তে মানুষকে শোনাতেই বেশি পছন্দ করতেন। ফলশ্রুতিতে সক্রেটিসকে স্মরণ করা হয় মূলত তার বিখ্যাত ছাত্র প্লেটো এবং জেনোফোনের মতো সমসাময়িকদের লেখার মধ্যদিয়ে। আর এই কারণেই অনেক ইউরোপিয়ান সমালোচক সক্রেটিসের অস্তিত্ব অস্বীকার করে দাবি করেন সবই প্লেটোর কাল্পনিক সৃষ্টি। সে যাই হোক, দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্লেটোর মতবাদ প্রেম, ন্যায়বিচার এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে কিছু অপরিবর্তনীয় জ্ঞান প্রদান করে। কিন্তু ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এসব ধারণা একটি বড়সড় সমস্যাও সৃষ্টি করে। যেহেতু আমরা এখন অবধি সক্রেটিস সম্পর্কে যা জানি তার সিংহভাগই প্লেটো সহ তার অনেক ছাত্রদের কাছ থেকে এসেছে। আর তাই সক্রেটিসের প্রকৃত ব্যক্তিত্ব এবং সক্রেটিস চরিত্র প্রকৃতপক্ষে কোথায় আলাদা তা নির্ধারণ করা কঠিন। আধুনিক যুগের ইতিহাসবিদেরা এখন অবধি সর্বজনীন গ্রহণযোগ্য কোনো সুরাহা করতে পারেননি।
Image Credit: medium.com
Image Credit: medium.com
গবেষকরা সক্রেটিসকে নিয়ে প্রচলিত এই বিতর্কের নাম দিয়েছেন 'সক্রেটিক সমস্যা'। এর সমাধান করা এতটাই কঠিন যে হাজার বছর ধরে এটি প্রায় নিজস্ব একটি একাডেমিক কায়দাকানুনে বিকশিত হয়েছে। সক্রেটিক সমস্যা নিয়ে ডাচ দার্শনিক সি.জে. ডি ভোগেল ১৯৫৫ সালে বলেন, "আমাদের কাছে আসল সক্রেটিস নেই। আমাদের কাছে যা আছে তা হলো ব্যাখা করার একটি সেট যার প্রত্যেকটি তাত্ত্বিকভাবে সম্ভাব্য সক্রেটিসের প্রতিনিধিত্ব করে।" ডি ভোগেল তার কর্মজীবনে সক্রেটিসের দর্শন নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চালিয়েছেন। তার কথাগুলো একেবারেই ফেলে দেয়ার উপায় নেই। কারণ সক্রেটিস যেসকল বিষয় নিজে লিখে যাননি সেগুলো মানুষ কেন বিশ্বাস করতে যাবে? তাও আবার এমন কারো থেকে যারা নিজেদের সক্রেটিসের ছাত্র দাবি করেন তাদের থেকে। এমনও হতে পারে তারা নিজেদের দর্শন প্রচার করার জন্য সক্রেটিসের নাম ব্যবহার করছেন যাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মতবাদগুলো অক্ষুণ্ণ থাকে। দুঃখজনক হলেও সত্য, সক্রেটিস এমন এক সময় বেঁচে ছিলেন যখন লোকেরা গল্প থেকে সত্যকে আলাদা করার চেষ্টা করেননি। আর তাই প্রশ্ন আসতে পারে সক্রেটিস সম্পর্কে আমরা যা জানি তার কতটুক সত্য? যেমনভাবে সক্রেটিসের কথোপকথনকারী মানুষগুলো তার মতবাদ কিংবা দর্শনের পেছনে মূল বক্তব্য বা অর্থ উপলব্দী করতে ব্যর্থ হয়েছেন তেমনিভাবে একজন আধুনিক পাঠকও ভাবতে পারেন যে 'সক্রেটিক সমস্যা' সমাধান থেকে কি অর্জন করা যেতে পারে। মূলত সক্রেটিসের মতবাদ ব্যাখা করে আমরা মূল পার্থক্য সমূহ চিহ্নিত করতে পারি। আর পার্থক্যগুলো আমাদেরকে শেখাতে পারে কিভাবে সক্রেটিসের অনুসারীরা তাদের মহান শিক্ষকের উত্তরাধিকারের উপর একটি ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন। আবার তারা কিভাবে সক্রেটিসের ধারণা থেকে বিচ্যুত হয়েছিল সে বিষয়েও জানা সম্ভব। বিজ্ঞান, দর্শন এবং আধুনিক শাসনব্যবস্থার নিয়ে বিশদভাবে জানতে হলে অবশ্যই সক্রেটিক সমস্যার সমাধান করা জরুরি। আর তাই আমরা আজ পুরো বিষয়টা ব্যাখা করব।
প্লেটো এবং সক্রেটিক সমস্যা
বর্তমান সময়ে আমরা সক্রেটিসের যে সংস্করণটির সঙ্গে সর্বাধিক পরিচিত সেটি মূলত তার শিষ্য প্লেটোর সংলাপে পাওয়া। প্লেটো তার জীবদ্দশায় সর্বমোট ৩৫টি সংলাপ লিখেছেন। যার মধ্যে একটি বাদে সবকটিতেই সক্রেটিস প্রধান চরিত্রে ছিলেন। তার যে দর্শনগুলো প্লেটোর সংলাপ বা গ্রন্থে বেশি পাওয়া যায় সেগুলো হলো, নিজের যুক্তিতে তার অটল আস্থা এবং সত্যের প্রতি অনড় অবস্থান। মূলত প্লেটোর লেখা সক্রেটিসের সংস্করণটিকে প্রায়শই প্রকৃত সক্রেটিসের ক্ষেত্রে একটি স্ট্যান্ড-ইন (পরিপূরক) হিসেবে বিবেচনা করা হয় যার পেছনে একটি যৌক্তিক কারণ রয়েছে। ঐতিহাকিদের মতে, প্লেটো ২০ বছর বয়সে সক্রেটিসের সাক্ষাৎ পান এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে তার নিবেদিতপ্রাণ অনুসারিদের মধ্যে অন্যতম একজন হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেন। আবার কিছু তথ্যপ্রমাণ বলে প্লেটো কোনো না কোনোভাবে সক্রেটিসের পারিবারিক বন্ধু ছিলেন। আবার কোনো কোনো সূত্র বলে সক্রেটিসের একটি বিচারে উস্থিত হওয়ার মধ্যদিয়ে তিনি তার সান্নিধ্য অর্জন করেন। এখানে বিচার বলতে তার তর্কানুষ্ঠান বোঝানো হয়েছে। কিন্তু দিনশেষে প্লেটোই একমাত্র ব্যক্তি যার কারণে সক্রেটিসের দর্শন, মতবাদ সবকিছু প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর তাই প্লেটোকেই তার যোগ্য উত্তরসূরী বলেন অনেক ইতিহাসবিদ।
Image Credit:medium
Image Credit:medium
তবে এসবের অর্থ এই নয় যে, সক্রেটিসকে নিয়ে প্লেটো যা লিখেছেন, বলেছেন বা প্রচার করেছেন সবকিছুই গ্রহণযোগ্য। আমরা আগেই বলেছি যেহেতু প্লেটোর কাজে সক্রেটিসের দর্শন সবথেকে বেশি ফুটে উঠেছে সেহেতু সন্দেহ তার দিকেই বেশি যাবে। আধুনিক গবেষকরা প্লেটোকেই সবথেকে বেশি দায়ী করেন বা যৌক্তিক। গবেষকরা প্লেটোর সংলাপগুলো বিশ্লেষণ করে বেশ কিছু উদ্বেগ উত্থাপন করেছেন। প্রথম এবং প্রধান বিষয়টি তারা মনে করেন কিছু সংলাপ প্লেটোর জন্মের আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। এই সন্দেহের সপক্ষে প্রমাণও দাঁড় করাতে পেরেছেন আধুনিক গবেষকরা। এই বিষয়টি প্রমাণ করে যে, প্লেটো তার শিক্ষাগুরু সক্রেটিসের কথোপকথন একত্র করার জন্য বাহ্যিক কোনো উৎস কিংবা ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল ছিলেন। এর সপক্ষে সবথেকে বড় প্রমাণ প্লেটো নিজেই রেখে গেছেন। কারণ তার সংলাপে সক্রেটিসের চরিত্রটি সংলাপ অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে পরিবর্তিত হয়েছে। একজন প্রকৃত দার্শনিক সংলাপে কিছু একটা দাবি করে অন্য সংলাপে তা খণ্ডন করতে পারেন। কিন্তু প্লেটো যে সক্রেটিসের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করায় সেখানে রয়েছে এই ধরণের অনেক অসঙ্গতি। প্লেটোর প্রতিষ্ঠিত সংলাপে প্রথমদিকের সক্রেটিসের সঙ্গে শেষাংশের সক্রেটিসের চারিত্রিক অসঙ্গতি ছিল ব্যাপক যা শত শত বছর যাবত পণ্ডিতমহলে সমালোচিত।
Image Credit: plato encyclopedia
Image Credit: plato encyclopedia
যে নাটকে হত্যা করা হয় সক্রেটিসকে
সক্রেটিস সম্পর্কে আমরা যা জানি তার অধিকাংশ বিষয়ের তথ্যসূত্র তিনটি। তারা হলেন প্লেটো, নাট্যকার অ্যারিস্টোফেনস এবং ঐতিহাসিক জেনোফন। প্লেটোর বিবরণ সর্বাধিক আলোচিত এবং সুপরিচিত হতে পারে, তবে অ্যারিস্টোফেনসই সক্রেটিসকে নিয়ে সর্বপ্রথম আলোচনা করেছেন। তার নির্মিত নাটক দ্য ক্লাউডস নির্মিত হয়েছিল সক্রেটিসের জীবদ্দশায়। ঐ নাটকে সক্রেটিসের দর্শনচিন্তা এবং আপাতদৃষ্টিতে অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত সমূহকে গতিশীল দেখানো হয়। ঐতিহাসিকদের মতে দ্য ক্লাউডসে যে সক্রেটিসকে উপস্থাপন করা হয়েছিল তা প্লেটোর লেখা সক্রেটিসের সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ। আবার যেসব গবেষক আসল সক্রেটিসের মতবাদ প্রচার করেন তারাও মনে করেন এই নাটকে সক্রেটিসের আসল চরিত্র কিছুটা হলেও দেখানো হয়েছে।
Image Credit: rakuten kobo
Image Credit: rakuten kobo
নাটকটিতে দেখানো হয়েছে, থিংক্যারি নামক একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে রয়েছেন সক্রেটিস। কিন্তু ইতিহাসবিদরা জানান সক্রেটিসের অগণিত ছাত্র থাকা স্বত্ত্বেও তিনি কখনোই তাদের একত্র করে কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেননি। বরঞ্চ তিনি রাস্তাঘাট, পাহাড় যখন যেখানে পারতেন মতবাদ প্রচার করতেন। আবার ঐ নাটকে সক্রেটিস এমন সব সমস্যার মোকাবেলা করেন যেগুলো প্লেটো কখনো বিবেচনা করেননি। যেমন, একটি মাছির লাফের দূরত্ব পরিমাপ করার মতো বিষয়! অ্যারিস্টোফেনসের নাটকে দেখানো সক্রেটিস কিন্তু এই কাজও করেছেন। প্লেটোর সক্রেটিসের সংস্করণ এবং অ্যারিস্টোফেনসের নাটকের চরিত্রের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পার্থক্যগুলো পণ্ডিতদের পরামর্শ দিতে বাধ্য করেছিল। দ্য ক্লাউডস নাটকে সক্রেটিসের যে ব্যঙ্গাত্মক রূপ দেখানো হয়েছিল তা মোটেও যথার্থ নয়। প্রকৃতপক্ষে তিনি দার্শনিক চিন্তাধারার একটি সংমিশ্রণ হিসেবে এথেন্সে সুপ্রতিষ্ঠিত হন। আবার নাটকে সক্রেটিস যাদের সঙ্গে তর্কবিতর্ক করতেন তাদেরও চরিত্র উঠে এসেছে যা প্লেটো নিজেও সংলাপে লিখেছেন। অর্থাৎ সক্রেটিস চরিত্রটি সবসময় তর্কবিতর্ক এবং নিজের মতবাদে অনড় ছিলেন তা প্লেটো, অ্যারিস্টোফেনস দুজনেই প্রমাণ করেছেন। 
Image Credit:.ancient-literature.com
Image Credit:.ancient-literature.com
তবে পার্থক্য হলো অ্যারিস্টোফেনস তার নাটকে সক্রেটিসের নেতিবাচক দিক নিয়েই আলোচনা করেছিলেন। দ্য ক্লাউডসে তিনি শিক্ষক হিসেবে ছাত্রদের সঙ্গে বেশ রূঢ়ভাবে আচরণ করতেন। নাটকে সক্রেটিস এমন সব প্রশ্ন এড়িয়ে যেতেন যেগুলো প্রকৃতপক্ষে মানুষের জীবনযাপনের ক্ষেত্রে সামান্য ছিল না। অথচ নাটকের স্রষ্টা অ্যারিস্টোফেনস সেগুলোকে সামান্য বা তুচ্ছ হিসেবেই উপস্থাপন করেন। অন্য আরেকটি নাটকে সক্রেটিসকে আরো বেশি নেতিবাচক ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন অ্যারিস্টোফেনস। তার নাটক দ্য বার্ডসে তিনি সক্রেটিস চরিত্রকে এমন রূপ দেন 'যিনি পুরুষদের ঘুমন্ত আত্মাকে জাগিয়ে তোলেন।' দুই ঐতিহাসিক যখন সক্রেটিসকে দুইভাবে উপস্থাপন করেছেন তখন স্বাভাবিকভাবে সন্দেহ থেকেই যায়। প্লেটোর এক সংলাপে দেখা যায় তিনি অ্যারিস্টোফেনসকে অভিযুক্ত করেছিলেন। কারণ অ্যারিস্টোফেনস এথেন্সের চারপাশের এলাকাগুলোতে সক্রেটিসের সুনাম নষ্ট করে দুর্নাম রটিয়ে দেন। আবার নাটকে যখন সক্রেটিসকে আদালতে অভিযুক্ত করা হয় সে বিষয়েও লিখেছেন প্লেটো। নাটকে দেখানো হয় এথেন্সের দেবতাদের মানহানি এবং যুবকদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগ ছিল সক্রেটিসের বিরুদ্ধে। এথেন্সের তৎকালীন আরাধ্য দেবতাদের নিয়ে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলেছিলেন সক্রেটিস। তার বিরুদ্ধে অত্যাচারী শাসকদের সমর্থনেরও অভিযোগ আনা হয়েছিল। যদিও নাটকে দেখানো হয় সক্রেটিস নির্দোষ হয়েও মুখ বুজে বিচারকদের রায় মেনে নিয়েছিলেন। এসবের কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ না থাকায় সেন্ট এন্ড্রুস বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রিক বিষয়ক অধ্যাপক স্টিফেন হ্যালিওয়েল বলেন, 'এই অভিযোগটি লবনের দানা দিয়ে গ্রহণ করি উচিত ছিল।' অর্থাৎ সক্রেটিসের ব্যাপারে এই সকল সত্য যা শত বছর যাবত প্রচার হয়েছে তাতেও মিথ্যা নিহিত রয়েছে। এদিকে প্রমাণিত হলো প্লেটোর আগেই অ্যারিস্টোফেনস জানাতে পেরেছেন কিভাবে হত্যা করা হয়েছিল সক্রেটিসকে।
জেনোফনের দৃষ্টিতে সক্রেটিস
প্লেটোর মতো জেনোফন নিজেও শিশু ছিলেন যখন দ্য ক্লাউডস নাটকটি প্রথমবার মঞ্চস্থ করা হয়। ততক্ষণে তিনিও সক্রেটিসের সঙ্গে পরিচিত হননি যেমনভাবে অ্যারিস্টোফেনস পরিচিত ছিলেন। সক্রেটিসের সঙ্গে খুব একটা যোগাযোগ না থাকা স্বত্ত্বেও জেনোফন তার সম্পর্কে দারুণ সব মতামত তৈরি করেন। জেনোফন তার বিখ্যাত গ্রন্থ মেমোরেবলিয়াতে লেখেন 'আমি কখনোই এমন কারো সঙ্গে পরিচিত ছিলাম না যে কিনা তার প্রতিটি সঙ্গী কি জানত তা খুঁজে বের করার জন্য বেশি চেষ্টা করত।' সক্রেটিস সম্পর্কে এই বর্ণনাটি প্লেটোর মতবাদের সঙ্গে কিছুটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ এই মতবাদের মাধ্যমে বোঝা যায় সক্রেটিস যখন কারো সঙ্গে তর্কবিতর্ক করতেন তখন তিনি তাদের প্রোথিত বিশ্বাসকে নিরস্ত্র করা বা দমন করার ক্ষেত্রে বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দিতেন। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে জেনোফন সরাসরি প্লেটোর মতবাদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। যেমন, তার সংস্করণে সক্রেটিস মানুষকে এমন সব বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন যা প্লেটো কখনো উল্লেখ করেননি কিংবা এর কাছাকাছি কিছুও বলেননি। অর্থাৎ জেনোফনের মাধ্যমে আমরা যে সক্রেটিসের সম্পর্কে জানতে পারি তিনি যেমন যুক্তিখণ্ডন করতে জানেন তেমনি পরামর্শও দিতে পারেন।
Image Credit:.Richard Panasevich
Image Credit:.Richard Panasevich
প্রথমত জেনোফন ছিলেন একজন ইতিহাসবিদ। তার দ্বিতীয় পরিচয় ছিল দার্শনিক। তাই গবেষকরা প্রাথমিকভাবে ভেবেছিলেন প্লেটোর তুলনায় জেনোফনের উল্লেখিত সক্রেটিস সংস্করণটি বেশি সঠিক। তবে এই বিষয়ে আধুনিক গবেষকরা ভিন্ন মতামত দিয়ে থাকেন। স্ট্যানফোর্ড এনসাইক্লোপিডিয়া ফর ফিলোসফির ভাষ্য মতে, যেসকল লেখায় সক্রেটিস সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেছেন সেগুলোকে তারই ইতিহাস দ্বারা নির্ভুলতার মানদণ্ডে বিচার করা সম্ভব না। অর্থাৎ, সক্রেটিস সম্পর্কে যে তিনজন আমাদের তথ্য সরবরাহ করছেন তারা ব্যক্তিভেদে তার চরিত্রকে নানান জায়গায় বদলে ফেলেছেন। অন্যদিকে, বার ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসিক চেয়ার গ্যাব্রিয়েল ড্যানজিগের মত পণ্ডিতরা মনে করেন জেনোফন সর্বদা চেষ্টা করেছেন সক্রেটিস সম্পর্কে নির্ভুল থাকতে। যখন সক্রেটিস জনসাধারণের জ্ঞানের বিষয়ে মতামত দিয়েছেন তখন আরো অধিক সাবধানী ছিলেন জেনোফন। এছাড়াও প্রাচীন গ্রিসে সক্রেটিসের বিচারের বিষয়ে যে সমস্ত প্রমাণ লেখা হয়েছে তার মধ্যে শেষপর্যন্ত তিনটি লেখা পাওয়া যায়। এই তিনটি গ্রন্থের মধ্যে দুটিই জেনোফনের লেখা। তিনি সক্রেটিসকে সবসময় একজন বক্তা হিসেবে বৈশিষ্ট্যযুক্ত করেছেন যা প্লেটোর দিকথেকে কিছুটা বিপরীত। জেনোফন আরো বলেন প্রাচীন এথেনীয়রা ভাবতেন যখন সক্রেটিসকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয় তখন তিনি উন্মাদের মতো আচরণ করেছিলেন। তারা আরো বিশ্বাস করতেন অতিরিক্ত অহংকারবোধের কারণেই তিনি ন্যায়বিচার বঞ্চিত হন।
Image Credit:.the guardian
Image Credit:.the guardian
আর এই জায়গায় এসেই প্লেটোর সংলাপের সঙ্গে জেনোফনের লেখা কিছুটা মিল পাওয়া যায়। প্লেটো তার অ্যাপলজিতে জানান, সক্রেটিস এমন আচরণ করেন যা তাকে অহংকারী হিসেবে বিবেচিত করে। উদাহরণ হিসেবে প্লেটো বলেন, মেলেটাস নিয়ে বিতর্ক করার সময় সক্রেটিস নিজের চিন্তাভাবনার ত্রুটিগুলো প্রকাশ করার চেয়ে বিপরীতে থাকা লোকটিকে কথার মাধ্যমে বেশি অপমান করতে চাইতেন। অর্থাৎ, নিজের তর্কে কখনোই হারতে চাইতেন না সক্রেটিস। প্লেটোর এই মতামত যদি দাঁড় করানো হয় তাহলে বলা যায় সক্রেটিস তর্কবিতর্কে নিজের ভুল স্বীকার করতেন না। এক্ষেত্রে নিজের মতবাদ অন্যের দিকে চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। এমনকি এথেন্সের সরকারি চাকরেরা যখন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে তখন তিনি বলেছিলেন এথেন্সের উচিত তার কাজের জন্য শাস্তি না দিয়ে পুরস্কৃত করা। যদিও শেষপর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত হয়েছিলেন সক্রেটিস। হেমলক বিষ প্রয়োগ করে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে এথেন্সের আদালত। তবে জেনোফন, প্লেটোর সাথে শেষপর্যন্ত একমত হয়েছিলেন সক্রেটিস ছিলেন অপরাজেয় বক্তা। নিজের দর্শন, মতবাদ অটুট রাখার জন্য তিনি যে কোনো বিষয় মাথা পেতে নিতেন। আর হয়তো এই কারণেই সক্রেটিস মহামানব, যার মতবাদ আজও সার্বজনীন। কিন্তু 'সক্রেটিক সমস্যার' সমাধানে পাঠক হিসেবে আমরা যে কোনো মতবাদ গ্রহণ করতে পারি। কিংবা সন্দেহ রাখতে পারি সক্রেটিস নামক মহামানব কিংবা মহান চরিত্র নিয়ে। এটি একান্তই নিজস্ব, ব্যক্তিগত ইচ্ছা। কিন্তু সত্য ইতিহাস জানা সবারই দায়িত্ব। যেমনটা আজ আমরা জানতে পারলাম। 
তথ্যসূত্র: বিগথিঙ্ক
আন্তর্জাতিকইতিহাস
আরো পড়ুন