Link copied.
জেনে নিন সর্বকালের সেরা ২৫টি টেস্ট ইনিংস!
writer
অনুসরণকারী
cover
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, সর্বকালের সেরা ২৫ টেস্ট ইনিংসের মধ্যে নেই ব্রায়ান লারা ঐতিহাসিক ৪০০ রানের অপরাজিত ইনিংস কিংবা ৩৭৫ রানের ইনিংসগুলোর একটিও। অথচ, ব্রায়ান লারার অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষের অপরাজিতা ১৫৩ রানের ও ২১৩ রানের ইনিংস দুইটি আছে সেরা ২০ এর মধ্যে। নেই ম্যাথু হেইডেননের ৩৮০ রানের টেস্ট ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসটির নাম। ইনিংসসমূহ ঐতিহাসিক হলেও ম্যাচের পরিস্থিতির বিচারে জায়গা হয় কালজয়ী ইনিংসগুলোর।
১৯৮১ সালের সবচেয় বেশি ইনিংস আছে এই তালিকায়। উইজডেনের সেরা ১০০ ইনিংস প্রকাশের ১৬ বছরে নতুন ৭টি ইনিংসে এই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। সেরা ২৫টি ইনিংসে নেই দক্ষিণ আফ্রিকা এবং বাংলাদেশের কোন ইনিংস। তবে, ইংল্যান্ডের ৬টি, অস্ট্রেলিয়ার আছে ৫টি। সেরা দশে আছে ইংল্যান্ড, ভারত এবং পাকিস্তান, জিম্বাবুয়েসহ ৭ দলের সেরা ইনিংসগুলো।

চলুন জেনে নেওয়া যাক ইনিংসগুলো-

১. গ্রাহাম গুচ; ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১৫৪ রানে অপরাজিত; হেডিংলি, ১৯৯১

সিরিজের প্রথম টেস্টেই কোর্টনি এমব্রোস, ম্যালকম মার্শালের কাছে অগ্নি পরিক্ষা দিতে হয়েছিল ইংল্যান্ডকে। প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে অলআউট হওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসেও ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল স্বাগতিকদের। সে ইনিংসে 'ওয়ান ম্যাচ আর্মির' ভুমিকায় ছিলেন কাপ্তান গ্রাহাম গুচ। ইনিংসের প্রথম বল থেকে শেষ বলের একটাও ২২ গজের বাহিরে থেকে দেখতে হয়নি তাকে। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন স্ট্রাইকে যাওয়া ব্যাটসম্যানদের একে একে বিদায় নেওয়ার দৃশ্যপটে। নিজে অর্ধশতক হাঁকালেন, শতক তুলে নিয়ে দেড়শ রানের গন্ডি পেরুলেন।
cover
কিন্তু সতীর্থদের মাঝে মার্ক রামপ্রকাশ(২৭) আর ড্যারেক প্রিংগেল(২৭) ছাড়া আর কেউ দুই অঙ্কের ঘরে রান তুলতে পারেননি। নিজে একাই রয়ে গেলেন অপরাজিত। দলের মোট সংগ্রহের ৬০% নিজে একাই তুলেন। সে ম্যাচের পিচ কোয়ালিটি ইনডেক্স(৩৪) দেখলেই বুঝা যায় কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল রান তোলা। বোলারদের সুবিধা তৈরী করা সে পিচে ১২৪ রানে ৬ উইকেট হারানো দল তার ব্যাটে ভর করে সংগ্রহ করে ২৫২ রান। তার ৩৩১ বলে ১৫৪ রানের অপরাজিত ইনিংসে ২৭৮ রানের লক্ষ্যমাত্রা স্থির হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের। শেষমেষ বোলারদের ক্যামিতে ১১৫ রানের ব্যবধানে জয় তুলে নেয় গুচ বাহিনী। এই তালিকার সেরা হলেও, উইজডেনের সেরা ১০০ ব্যাটিং পারফরম্যান্সের তালিকায় তৃতীয় স্থানে আছে গুচের এই নিদারুণ ইনিংসটি।

২. সানাথ জয়াসুরিয়া; পাকিস্তানের বিপক্ষে ২৫৩; ফয়সালাবাদ, ২০০৩

'৮০ এর দশক পর্যন্ত ব্যাটিং সহায়ক পিচের জন্য ফয়সালাবাদের নামডাক ছিল। কিন্তু '৯০ এর দশক থেকে ২০০৪ সাল অবধি সেখানকার পিচগুলোর আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়। ৩০ এর নিচে রান পার উইকেটের(আরপিডব্লিউ) মান নিয়ে হয়ে উঠে বোলারদের বিচরণ ভূমি। সে ম্যাচের পিচ কোয়ালিটি ইনডেক্স(পিকিউই) ছিল ৪৫। যা নিসন্দেহে বোলারদের তৃপ্তিদায়ক পিচের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু কুমার সাঙ্গাকারা(৫৯), মাহেলা জয়াবর্ধনে(৫৭), থিলান সামারাবীরা(২৭), সাথে জুটি গড়ে দলকে ৪ উইকেটে ৩০৯ রানের সংগ্রহ এনে দেন জয়াসুরিয়া। এবং ব্যাক্তিগত দেড়’শো রানের ইনিংসও পূর্ণ করে নেন। 
cover
বোলারদের কচুকাটা করে ছাড়েন, শেষ ১২৪ বলের ইংনিংসে যোগ করেন আরও ১০০ রান। । নবম উইকেটে দিলহারা ফার্নান্দোর সাথে করেন ১০১ রানের জুটি, যেখানে ফার্নান্দোর ব্যাট থেকে আসে মাত্র ১ রান। ১০ উইকেটে এসে নিজের উইকেটটি আর ধরে রাখতে পারেননি সুরিয়া। ৩৪৮ বলে ৩৩ চার আর ৪ ছয়ের ব্যাটিং নিদর্শনে সংগ্রহ করেন ২৫৩ রান। শ্রীলঙ্কার সংগ্রহ দাঁড়ায় ৪৩৮। ওই ম্যাচের বাকি তিন ইনিংসের একটিতে শ্রীলঙ্কা করে ২৪৩ এবং পাকিস্তান যথাক্রমে ২৬৪ ও ২১৬ রান। এমন কন্ডিশনে নির্বিক ব্যাটিং প্রদর্শনীর জন্য জয়াসুরিয়ার এই ইনিংসটি সর্বকালের সেরা ইনিংসদের একটি হওয়া যোগ্যতা কম রাখে না।

৩. স্যার ডন ব্রাডম্যান; ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২৭০; মেলবোর্ন, ১৯৩৭

অধিনায়ক হিসেবে ব্রাডম্যানের প্রথম ম্যাচেই দিতে হয়েছিল অগ্নিপরীক্ষা। চাপ আরো বেড়ে যাওয়ার কারন ছিল আগের দুই ম্যাচে হেরে পিছিয়ে পড়া। মেলবোর্নের পিচ সেদিন টানছিল বোলারদের দিকে, যা পিচ কোয়ালিটি ইনডেক্স(৪৭.২) ও দুই দলের প্রথম ইনিংসের স্কোর দেখলেই অনুমান করা যায়। আগে ব্যাট করে অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসে ৯ উইকেটের বিনিময়ে ২০০ তুলেই ইনিংস ঘোষনা করে, জবাবে নিজেরদের প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে বেহাল দশায় পড়া ইংল্যান্ড ৭৬ রানে ৯ উইকেট হারিয়েই ইনিংস ঘোষনা করে।
cover
ব্যাটসম্যানদের এমন ব্যর্থতা ভাবিয়ে তোলে ব্রাডম্যানকে। তৃতীয় ইনিংসে সাজালেন নতুন ব্যাটিং লাইনআপ। ৯ম, ১০ম ও ১১তম ব্যাটারকে পাঠালেন টপ অর্ডারে। এরপর দিলেন নিয়মিত দুই টপ অর্ডার কিথ রিগ ও বিল ব্রাউনকে। তাতেও কিছু বদলালো না। ১০০ রান তোলার আগেই ৫ উইকেটের পতন ঘটে। ৬ষ্ঠ উইকেটে নিজে ক্রিজে আসেন, সঙ্গি হন জ্যাক ফিংলেটনের। তারা দুই জনে মিলে যোগ করেন ৩৪৬ রান। অজিদের সংগ্রহ হয় ৫৬৪। ৬৮৯ এর লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে তার অর্ধেকও করতে পারেনি ইংল্যান্ড।

আশ্চর্যজনকভাবে, যেখানে দুই দলের প্রথম ৩৭৩ রান তুলতে খোয়াতে হয়েছিল ২৩ উইকেট। সেখানে পরের ৭৯০ রান তুলতে খরচ হয়েছে ১৫ উইকেট(ইংল্যান্ডের ১০টি)। রান পার উইকেটের মান ১৬.২ থেকে চলে যায় ৫২.৭ এ। এমন অস্বস্তিকর পিচে ব্রাডম্যানের আড়াইশ রানের ইনিংস তার ব্যাটিং নিদর্শনের অন্যতম উদাহরণ হয়ে আছে। ব্রাডম্যানের ৩৭৫ বলে ২৭০ রানের ইনিংসের সাথে ফ্রিংলেটনের ৪২৮ বলে ১৩৬ রানের ইনিংসও ছিল মনে রাখার মতো। ব্রাডম্যানের এই ইনিংসটি ছিল উইজডেনের সেরা ১০০ ইনিংসের মধ্যে প্রথম স্থানে।

৪. আজহার মাহমুদ; দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১৩২; ডুরবান, ১৯৯৮

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খুব বেশি কিছু অর্জন করতে না পারলেও ক্যারিয়ারের কিছু সেরা সময় দলকে দিয়ে গিয়েছেন আজহার মাহমুদ। যা আসলেই কখনো উপেক্ষা করার মতো না। ১৯৯৮ এর সে ডুরবান টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার দলে ছিল অ্যালন ডেনাল্ড, শন পোলক, ফেনি ডি ভিলিয়ার্স, ল্যান্স ক্লুজনারের মতো সেরা পেসাররা। এমন পেস স্কোয়াডের মোকাবেলা করে যে রান তোলা অসাধ্য সাধনের মতো তা ম্যাচের প্রথম দিনেই টের পায় পাকিস্তান। ৮৯ রানেই হারায় ৫ উইকেট। 
cover

৬ষ্ঠ উইকেটে উইলো হাতে পিচে আসেন আজহার মাহমুদ। কোন কিছু তোয়াক্কা না করেই প্রথম থেকে মারমুখী ভঙ্গিতে ব্যাট চালাতে থাকেন। নুয়ে পড়া পাকিস্তানের রান কিছুটা তাজা হয়ে উঠে। ১৬৩ বলের ইনিংসে আজহার করেন ১৩২ রান, বাউন্ডারি থেলে করেন ৯৬ রান। পাকিস্তানের শেষ ১০৬ রানের ৯০% রানই আসে তার থেকে। আজহার দেড়’শো রানের গন্ডি স্পর্শ করতে না পারলেও দলকে লড়াই করার মতো ২৫৯ রানের সম্মাজনক স্কোর এনে দেন। পরবর্তীতে দক্ষিণ আফিকা নিজেদের প্রথম ইনিংসে এই রান টপকাতে ব্যর্থ হয়। শেষমেষ ম্যাচটা জিতেও যায় পাকিস্তান।

আজহার মাহমুদের এই ইনিংস আসলে কতোটা গুরত্বপূর্ণ ছিল তার বোঝার জন্য আরো কিছু ব্যাপার জানা উচিত। যেমন, তিনি মাঠে আসার পর মইন খানের ২৫ রানের ইনিংস ছাড়া আর কোন ব্যাটসম্যান ৬ রানের বেশি করতে পারেনি। বলতে গেলে দলকে একাই টেনে নিয়েছেন তিনি। আর পিচের আচরণ বিবেচনা করতে গেলে, ৩৯ মানের পিচ কোয়ালিটি ইনডেক্স মান নিয়ে উইকেট সম্পুর্ণ ভাবে বোলারদের পক্ষে ছিল। আর রান পার উইকেটের(২০.৭) মানও ছিল খুবই গন্য। নিসন্দেহে আজহার আলির এই ইনিংস সর্বকালের সেরা ইনিংসদের একটি হওয়ার যোগ্যতা কোন অংশেই কম রাখে না।

৫. ব্রায়ান লারা; অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৫৩; ব্রিজটাউন, ১৯৯৯

ম্যাচের প্রথম দুই ইনিংসের পিচ ছিল ব্যাটিং সহায়ক। যার ফায়দা হাসিল করে নিজেদের প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ৪৯০ এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৯৬ রানে ৭ ইউকেট হারানোর পরও ৩২৯ রান করে। পিচের আচরণ পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে দেখা যায় অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে। কোর্টনি ওয়ালশ(৫), পেড্রো কলিন্স(২) আর কোর্টনি এমব্রোসের(২) ঝলকানিতে ১৪৬ রানেই লাপাত্তা হয়ে যায় স্বাগতিকদের ইনিংস। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে ৪ সেশনে জয়ের জন্য লক্ষ্য স্থির হয় ৩০৮ রানের। যেহেতু পিচের আচরণ পরিবর্তন হয়েছে এতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকেও ভুগতে হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে জয়ের জন্যই খেলবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
cover
উদ্বোধনী জুটিতে ৭২ রান আসলেও মূহুর্তের ছন্দপতন ঘটে ক্যারিবিয়ানদের। গ্লেন ম্যাকগ্রার গতিতে ৭৮ রানেই ঘটে ৩ উইকেটের পতন। চতুর্থ উইকেটে লারা ব্যাট হাতে পিচে আসলেও সতীর্থদের একে একে বিদায় তাকে ভাবিয়ে তোলে। ১০৫ রানেই নেই ক্যারিবিয়ানদের ৫ উইকেট। পাড়ি দিতে হবে তখন দুই-তৃতীয়াংশ পথ। জেমি এডামস কিছুটা ভরষা দেন লারাকে। দুইজন মিলে করেন ১৩৩ রানের জুটি। এডামসের বিদায়ের পর ৬ উইকেটে ইন্ডিজের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৩৮! ১০ রান যোগ করতেই আরও ২ উইকেট হারায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ক্ষীণ হয়ে আসে জয়ের আশা। এরই মাঝে শতক তুলে নেন লারা।

২৫৪ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে চা-বিরতিতে যায় ক্যারিবিয়ানরা। এমব্রোস ছিলেন লারা সঙ্গি। দুই জনে মিলে ৩৯ বলে ৫৪ রানের জুটি গড়েন। জয় থেকে ৬ রান দূরে থাকতে শেষ উইকেটে আসেন ওয়ালশ। এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে লারার তখন দাঁড়িয়ে দেড়শো রানের দৌড় গোড়ায়। ওয়ালশ কোন রান না করেও ৫ বল খেলে অপরাজিত ছিলেন। মাইলফলক স্পর্শ করে লারা দলকে ঐতিহাসিক এক জয়ের সুভাসে ভাসান। চতুর্থ ইনিংসে অজি বোলাররা দাপট দেখালেও লারার কাছে এসে তারা বারবার পরাস্ত হয়েছেন। বলার অপেক্ষা রাখেন না, ব্রায়ান লারার ১৫৩ রানের অপরাজিত এই ইনিংসটি সর্বকালের অন্যতম সেরা একটি টেস্ট ইনিংস।

৬. ভিরেন্দর শেবাগ; শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অপরাজিত ২০১ রান; গল, ২০০৮

সমুদ্রপাড়ের স্টেডিয়াম গলে সে দিন কোন ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস না থাকলেও, আজান্তা মেন্ডিস আর মুত্তিয়া মুরালিধরনের ঘূর্ণিতে যে বেসামাল হয়ে পড়তে পারে ভারতে ব্যাটিং লাইনআপ তা মোটামুটি জানাই ছিল। ১৬৭ রানের উদ্বোধনী জুটির দুর্দান্ত শুরুর পর মেন্ডিসের আঘাতে লন্ডভন্ড হতে শুরু করে ভারতের ব্যাটিং লাইনআপ। গৌতম গাম্ভির(৫৬), ভিভিএস লক্ষ্মণ(৩৯) আর ভিরেন্দর শেবাগ(২০১*) ছাড়া কোন ব্যাটসম্যান দুই অঙ্কের ঘরে রান তুলতে পারেনি।
cover
সতীর্থরা যখন উইকেট বিলিয়ে যাওয়া আসার মিছিলে ব্যস্ত, রান তোলার দায়িত্ব তখন নিজ কাঁধে তুলে নেন শেবাগ। ৩৭ মানের পিচ কোয়ালিটি ইনডেক্সে বোলারদের কচুকাটা করে ছাড়েন তিনি। ব্যাট ঘুরিয়েছিলেম ওডিআই মেজাজে। ২০১ রানের ইনিংস খেলেন মাত্র ২৩১ বলে। দলের মোট সংগ্রহের ৬২% আসে তার উইলো থেকে। এমন বোলিং সহায়ক পিচেও মুরালিধরন, চামিন্দা ভাস এমনকি ওই ইনিংসে ৬ উইকেট নেওয়া মেন্ডিসও শেবাগকে তার শিকারে পরিনত করতে পারেননি। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে মারমুখি ইনিংস খেলে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে ডাবল সেঞ্চুরি তুলে নেওয়ার কৃতিত্ব কয়জনই বা অর্জন করতে পারে?

৭. ইয়ান বোথাম; অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অপরাজিত ১৪৯ রান; হেডিংলি, ১৯৮১

'৮০ দশকের প্রথম দিকে ইয়ান বোথামের অধিনায়কত্ব নিয়ে নানা কথা উঠতে থাকে, এক পর্যায়ে তার পরিবর্তে অধিনায়ক করা হয় মাইক ব্রেয়ার্লিকে। অধিনায়কত্বের বোঝা হালকা হতেই নিজের ক্যারিয়ারের প্রতি মনোনিবেশ করেন বোথাম। ১৯৮১ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হেডিংলি টেস্টের কথা। ম্যাচটিতে নিজেদের প্রথম ইনিংসে ফলো-অন এড়াতে ব্যর্থ হয় ইংল্যান্ড। সে ইনিংসে ব্যর্থ হয়ে ছিলেন বোথাম নিজেও। ফলো-অনে পড়ে নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে একই দশা ইংলিশ ব্যাটিং লাইনআপে। ব্যতিক্রম শুধু ইয়ান বোথামের ব্যাট। তিনি যখন পিচে আসেন তখন দলের সংগ্রহ ৫ উইকেট হারিয়ে ১০৫ রান। এমন পরিস্থিতি থেকে দলকে টেনে বেরার চেষ্টা করেন, কিন্তু দেড়শো রানের গন্ডি না পেরুতেই আরও ২ উইকেট হারায় ইংল্যান্ড। নিরুপায় বোথাম বুঝতে পারেন লড়াইটা এখন তার একার। টেইলেন্ডারদের সঙ্গি করেই যার করার করতে হবে।
cover
৮ম উইকেটে গ্রাহাম ডিলি অসাধারন জুটি গড়েন ইয়ান বোথামের সাথে। পূর্ণ করেন অর্ধশতকও(৫৬)। অন্যপ্রান্তে বোথাম বুঝতে পারেন সময় গড়িয়ে লাভ নেই, ব্যাট চালাতে হবে, আক্রমনাত্মক হতে হবে, ডিলিকে সাথে নিয়েই দলের স্কোর বড় করতে হবে তাকে। চারের বন্যায় শতক তুলে নিতে দেরী করলেন না। ডিলিও বিদায় নিলেন। ক্রিস ওল্ড(২৯) কিছুটা ভাল সঙ্গ দিলেন। শেষ উইকেটে আসা বব উইলিস থিতু হতে পারলেন না। ওইদিকে, ডিলি আউট হওয়ার পর দলের মোট সংগ্রহে যোগ হয় ১০৪ রান। যার ৭০% আসে বোথামের ব্যাট থেকে। উইলিসের বিদায়ে ইংল্যান্ডের ইনিংসের সমাপ্তি ঘটে। পিচের অন্য প্রান্তে ১০০.৬৭ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করে ১৪৯ রানে আপরাজিত থাকে মাঠ ছাড়তে হয়ে লড়াকু বোথামকে। মোটামুটি ১৩০ রানের সম্মানজনক স্কোর পায় ইংল্যান্ড। প্রথম ইনিংসে ৪০০ পেরুনো অস্ট্রেলিয়ার কাছে এই রান নিছক কিছুই নয়। জয়টা সহজেই তাদের হতে চলেছে।

এমন যারা ভেবেছেন, তাদের পুনরায় ভাবতে বাধ্য করেছেন বব উইলিস। ৪৩ রানে তিনি শিকার করেন ৮ উইকেট। অজিদের ইনিংসের সমাপ্তি ঘটে জয় থেকে ১৮ রান দূরে থেকে। সে ম্যাচের পিচ কোয়ালিটি ইনডেক্স ছিল ৪৪। যা সাম্যাবস্থার ইঙ্গিত দেয়। সে ফায়দা সম্পুর্ন ভাবে হাসিল করেন বোথাম। প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট শিকারের পাশাপাশি শতকও পূর্ন করেন।

৮. ভিভিএস লক্ষ্মণ; অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২৮১ রান; কলকাতা, ২০০১

একাধারে ১৬ টেস্ট জয়ের রেকর্ড নিয়ে ভারতের বিপক্ষে কলকাতায় নামে অস্ট্রেলিয়া। এমন পরাশক্তির বিপক্ষে পেরে উঠতে যে কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে তা জানা ছিল ভারতের। এর প্রতিফলন দেখা যায় নিজেদের প্রথম ইনিংসে, যখন ২৭৪ রান পিছিয়ে থেকে ভারত ফলো-অনে পড়ে। ইনিংসটিতে ভারতের অর্জন বলতে কেবলই ভিভিএস লক্ষ্মণের ৫৬ রানের ইনিংস। দলের ব্যর্থতার মাঝে তার এমন সাফল্যের কারনে ইনিংস ব্যবধানে হার এড়াতেই ৬ থেকে ৩ নম্বরে ব্যাট করতে পাঠানো হয় দ্বিতীয় ইনিংসে। 
cover
দায়িত্ব পুরোপুরি বুঝে নিয়েছেন তিনি। যে কোন মূল্যে দলকে বড় সংগ্রহ এনে দিতে হবে, এমন অঙ্গিকারে ব্যাট চালাতে থাকেন লক্ষ্মণ। ৩ নম্বরে তাকে জায়গা ছেড়ে দেওয়া রাহুল দ্রাবিড় ৬ষ্ঠ উইকেটে তারা সাথে সামিল হন। দুই জন মিলে ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক জুটি গড়েন। লক্ষ্মণের ইনিংসটি শুধু রক্ষণাত্মকই ছিল না, ছিল ম্যাচ বাঁচানোর লড়াইও।

প্রথম ইনিংসে ভারতকে ঘুড়িয়ে দেওয়া জেসন গিলিপসি, শেন ওয়ার্ন, গ্লেন ম্যাকগ্রাদের নাকানিচুবানি খাইয়ে ৪৪ বাউন্ডারিতে ২৮১ রানের সর্বকালের অন্যতম সেরা একটি ইনিংস খেলেন। যেখানে ভারত প্রথম ইনিংসে ২০০ রানও করতে পারেনি। ইনিংসটি এই তালিকার ৮ নম্বরে থাকলেও উইজডেনের তালিকায় আরও উপরে রয়েছে। লক্ষ্মণের এই দুর্দান্ত ইনিংসের পেছনে ১৮০ রান করা রাহুল দ্রাবিড়েরও অনবদ্য অবদান রয়েছে. ৫৬ মানের ব্যাটিং সহায়ক পিচে তার সঙ্গ না পেলে হয়তো এত সুন্দর ইনিংস উপহার দিতে পারতেন না ভিভিএস।

৯. সাঈদ আনোয়ার; ভারতের বিপক্ষে অপরাজিত ১৮৮ রান; ইডেন গার্ডেন, ১৯৯৯

১৯৯৯ সালে এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে পাকিস্তান নিজেদের প্রথম ম্যাচে ভারতের মুখোমুখি হয়। সে ম্যাচে জাভাগাল শ্রীনাথ(৫) আর ভেঙ্কেটেশ প্রসাদের(২) গতি এবং সুইং ভারী করে তোলে ইডেনের পরিবেশ। তাদের তান্ডবে প্রথম ইনিংসে ২৬ রানেই ৬ উইকেট হারায় পাকিস্তান। মঈন খানের ৭০ রানের উপর ভর করেন কোন মতে ১৮৫ রান সংগ্রহ করে। জবাবে নিজেদের প্রথম ইনিংসে পাকিস্তানের চেয়ে ৩৮ এগিয়ে থেকে সবকয়টি উইকেট হারায় ভারত।
cover
লিড পূর্ণ করে ভারতের সামনে বড় সংগ্রহ দাঁড় করাতে না পারলে ম্যাচ জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী হওয়া যাবে না তা বুঝতে পারেন পাকিস্তানি ওপেনার সাঈদ আনোয়ার। প্রথম ইনিংসে ডাক মারলেও এই ইনিংসে একাবারে শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন। ইডেনের পিচ সেদিন বোলারদের পক্ষে আচরণ করছিল। পিচ কোয়ালিটি ইনডেক্স ছিল ৩৭।

এমন প্রতিকূল পিচে বোলারদের বুড়ো আঙুল দেখি সেঞ্চুরি তুলে নেন আনোয়ার। তার সতীর্থ হিসেবে কেবল মোহাম্মদ ইউসুফই কিছুটা বেশি সময় মাঠে কাটিয়েছেন, অর্ধশতক করেছেন, ভালো সঙ্গ দিয়েছেন। এছাড়া আর কেউ থিতু হতে পারেননি। একে একে প্যাভিলিয়নের পথ ধরতে থাকলে ১৮৮ রানে অপরাজিত থাকতে হয় আনোয়ারকে। ডাবল সেঞ্চুরি আক্ষেপ নিয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরেন তিনি। তার এই ইনিংসের ফলে ৩১৬ রান সংগ্রহ করে পাকিস্তান এবং ভারতকে ২৭৯ রানের টার্গেট দেয়। ৪৬ রান দূরে থাকতেই ভারত ইনিংস গুটিয়ে যায়। বিদেশের মাটিতে পাকিস্তান স্বাদ ভোগ করে এক অনন্য টেস্ট জয়ের।

১০. নেইল জনসন; পাকিস্তানের বিপক্ষে ১০৭ রান; পেশওয়ার, ১৯৯৮

নেইল জনসনের ১০৭ রানের ইনিংসটি সেরা ১০এর মধ্যে থাকায় আপনি কিছুটা বিচলিত করতে পারে। তবে, ম্যাচটি সম্পর্কে পূর্ণ ধারনা পেলে আপনি নিশ্চিত ভাবে ইনিংসটিকে অন্যভাবে দেখবেন। সিরিজের প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে পাকিস্তান করে ২৯৬ রান। সে লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ৬৩ রানেই ৪ উইকেট হারায় জিম্বাবুয়ে। তখন ব্যাট হাতে মাঠে নামেন নেইল জনসন। ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিস, আকিব জাবেদ, মুস্তাক আহমেদকে নিয়ে গঠিত পাকিস্তানের বোলিং বিভাগ তখন ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম সেরা। 
cover
আকরাম, ওয়াকারদের বিপক্ষে ব্যাট হাতে রান তুলতে যে কাউকে বার বার চিন্তা করে ব্যাট চালাতে হতো। কিন্তু সে ইনিংসে ঘটলো উল্টো ঘটনা। তার জন্য বল করতেই যেনো বার বার চিন্তা করতে হচ্ছিলো বোলারদের। নেইল নামার পর দলকে এক হাতে টেনে নিয়ে যান। তিনি পিচে থাকাকালীন জিম্বাবুয়ের স্কোরবোর্ডে যোগ হয় ১৫৫ রান, যার ১০৭ রানই আসে তার উইলো থেকে। বল মোকাবেলা করেন মাত্র ১১৭টি। ইনিংসটির মহত্ত্ব বুঝতে পিচ কোয়ালিটি ইনডেক্সের দিকে নজর দেওয়াই যথেষ্ট। ৩৭.৬ মাঠে বোলিং সহায়ক এই পিচে ৯০ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করে সেঞ্চুরি তোলা চাট্টিখানি কথা নয়।

বোলাররা এতটাই সুবিধে পেয়েছে যে পাকিস্তান পরের ইনিংসে ১০৩ রানেই গুটিয়ে যায়। ১৬২ রানের টার্গেট পেয়ে নিজেরদের টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম এক জয় তুলে নেয় জিম্বাবুয়ে।
cover
যে ইনিংসটি সেরা দশটির একটি না হয়েও সেরা-

১১. চার্লস ব্যানারম্যান; ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অপরাজিত ১৬৫; মেলবোর্ন, ১৮৭৭

ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম বল মোকাবেলাকারী, প্রথম সেঞ্চুরিয়ান চার্লস ব্যানারম্যান। প্রথম টেস্টের প্রথম দিনই তিনি সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন। সে ইনিংসে তার দল ২৪৫ রানের অলআউট হয়ে যায়। ৩১.৬ মানের বোলিং সহায়ক পিচে তার কম রানে গুটিয়ে যাওয়ারই কথা। তবে ম্যাচটিতে বিশেষ ভাবে নজর কাড়েন সেঞ্চুরি হাঁকানো ব্যানারম্যান। এমন বৈরী উইকেটে রান করেন ১৬৫। ম্যাচের দ্বিতীয় দিন রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে ১৬৫ রানে অপরাজিত থেকে রিটায়ার্ড হার্টে মাঠ ছাড়েন তিনি। অবশ্যই ইনিংসটি সেরাদের সেরা একটি ইনিংস।


cover
যে ইনিংসগুলো শীর্ষ ২৫ এর মধ্যে নেই-

২৬. ডগ ওয়াল্টার্স; নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অপরাজিত ১০৪; অকল্যান্ড, ১৯৭৪

২৭. ব্রায়ান লারা; অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২২৬; অ্যাডিলেইড, ২০০৫

২৮. অ্যাডাম গিলক্রিস্ট; বাংলাদেশের বিপক্ষ ১৪৪; ফতুল্লা, ২০০৬

২৯. ক্লাইড ওয়ালকট; ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২২০; ব্রিজটাউন, ১৯৫৪

৩০. টিপ ফস্টার; অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২৮৭; সিডনি, ১৯০৩

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021