Link copied.
ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ বাহিনী হামাসের উত্থান কীভাবে?
writer
১৮ অনুসরণকারী
cover
ফিলিস্তিনের ব্যাপারে খোঁজ রাখেন আর হামাসের ব্যাপারে শোনেন নি এমন মানুষ পাওয়া যাবে না৷ হামাস ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার শাসনকারী দল। দলটিকে দেখা হয় ফিলিস্তিনীদের সবচেয়ে বড় উগ্রপন্থী গোষ্ঠী হিসেবে। গাজা এলাকার আনুমানিক ৩০ শতাংশ মানুষ এই গোষ্ঠীর সদস্য৷ এই লেখায় হামাসের উত্থান ও বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলোচনা করবো। 

যেভাবে সৃষ্টি
১৯৮০-এর দশকে ইয়াসির আরাফাতের প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)-র বিরোধিতায় হামাসের জন্ম৷ তখনকার কট্টর ইসরায়েলবিরোধী আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে পরিচিত শেখ আহমাদ ইয়াসিনের নেতৃত্বে আবদেল আজিজ আল-রান্তিসি ও মাহমুদ জহর হামাস প্রতিষ্ঠা করেন। ইয়াসিন মূলত ছিলেন তৎকালীন ইখওয়ানুল মুসলিমীনের ফিলিস্তিন শাখার নেতা। ইয়াসিন ছিলেন পঙ্গু কিন্তু তবুও যুবক বয়স থেকেই তিনি ছিলেন গাজার নেতা। ২০০৪ সালের মার্চে গাজায় ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হন আহমাদ ইয়াসিন। পরের মাসেই নিহত হন আজিজ আল-রান্তিসি। সংগঠনটির বর্তমান প্রধান খালেদ মিশাল।

পিএলও-র বিরোধী শক্তি হিসেবে দাঁড় করাতে শুরুর দিকে ইসরায়েল সরকার হামাসকে অর্থ সহায়তা দিয়েছিল বলে অনেকক্ষেত্রে দাবি করা হয়৷ তবে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠায় কোনো ধরনের ভূমিকার কথা বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে সংশ্লিষ্টরা৷ 

cover
উদ্দেশ্য
হামাস প্রাথমিকভাবে দুটি উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ শুরু করে। প্রথমত, এর সামরিক শাখা ইজ্জেদিন আল-কাশেম ব্রিগেডসের মাধ্যমে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়ত, ফিলিস্তিনে বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা। পিএলও-র মতো হামাস ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকারে বিশ্বাস করে না৷ তাদের প্রতীকে রয়েছে জেরুসালেমের ‘ডোম অব দ্য রক’৷ ইসরায়েল, গাজা ও পশ্চিম তীরকে একক ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হিসেবে তারা বিবেচনা করে৷

প্রতিষ্ঠার পর থেকে হামাস গোষ্ঠী ফিলিস্তিনী জনসাধারণের ব্যাপক সমর্থন লাভে সক্ষম হয়৷ উগ্রপন্থী ফিলিস্তিনী গোষ্ঠীগুলোর মাঝে হামাসই এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি হামলা চালিয়েছে- যাতে বহু ইসরাইলী নিহত হয়েছে৷ আর সংস্থার নেতারা বারংবার তাদের লক্ষ্যের কথা জানিয়েছেন এই বলে যে , তারা তাদের হামলা চালিয়ে যাবেন৷ হামাস মনে করে, আলোচনার টেবিলে তাদের কোন ভবিষ্যত নেই৷ তাই তারা প্রতিরোধী৷ আর এ জন্যই হামাসের ওপর আঘাত হানা খুব কঠিন কাজ৷




অর্থের যোগান
হামাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সহযোগী কাতার৷ এখন পর্যন্ত দেশটি হামাসকে ১৮০ কোটি ডলার দিয়েছে৷ হামাসের প্রতি তুরস্কেরও সমর্থন রয়েছে৷ সংগঠনটির নেতা ইসমাইল হানিয়ের পক্ষে রাজনৈতিক অবস্থান রয়েছে তুর্কি প্রশাসনের৷ এছাড়াও বিভিন্ন উদ্যোগ ও ফাউন্ডেশনের সহযোগিতাও পায় তারা৷ গাজা অঞ্চলে প্রায় দুই হাজার একর ওয়াকফ কৃত কৃষি জমি রয়েছে এই দলটির মালিকানায়। তাছাড়া আল আকসা ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংকের ২০ শতাংশ শেয়ার, রিয়েল স্টেট ব্যবসা, এপার্টমেন্ট ও মার্কেট ভাড়ার ইত্যাদি ব্যবসা থেকে দলটি আয় করে থাকে। 

গোষ্ঠীর বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থ যোগায় সৌদী আরব , ইরান এবং ইউরোপে বসবাসরত ফিলিস্তিনীরাও৷

cover
হামাস কি সন্ত্রাসী সংগঠন?
১৯৯৩ সালে ইয়াসির আরাফাত অসলো চুক্তির অধীনে ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করেন, যার মধ্য দিয়ে ১৯৮৭ সালে শুরু হওয়া প্রথম ইন্তিফাদার অবসান হয়৷ হামাস এই শান্তি প্রক্রিয়া প্রত্যাখ্যান করে ইসরায়েলে হামলা অব্যাহত রাখে৷ এটাই ছিল হামাসের প্রথম সহিংসতার আশ্রয় নেয়ার ঘটনা৷ ১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র হামাসকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করে৷ ২০০৩ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নও তাদেরকে সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াও হামাসকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করেছে৷

২০০৫ সালে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হওয়ার পরের বছরই ফিলিস্তিনি আইন পরিষদ প্যালেস্টিনিয়ান লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের (পিএলসি) নির্বাচনে জয়ী হয় হামাস। এরপর ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন দল ফাতাহর সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ২০০৭ সালের জুনে গাজায় হামাস ও ফাতাহর মধ্যে প্রচণ্ড লড়াই বেঁধে যায়। এরপর হামাস গাজায় সরকার গঠন করে। এখনো গাজার শাসনক্ষমতায় তারা। পশ্চিম তীরের শাসনক্ষমতা ফাতাহর হাতে।  


cover
সাংগঠনিক ব্যাপ্তি
সংগঠন হিসেবে হামাস মূলত তিনটি শাখার সমষ্টি হিসেবে কাজ করে। রাজনৈতিক শাখা, সমাজকল্যাণমূলক শাখা এবং সামরিক শাখা। মজলিশে শূরা হামাসের প্রতিনিধিদের মিলনস্থল, যার মাধ্যমে হামাস সমগ্র ফিলিস্তিনে তার কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। তবে হামাসের নীতিনির্ধারণী পরিষদ হলো পনেরো সদস্যের “পলিটিক্যাল ব্যুরো”। 

হামাসের কার্যক্রমের ৯০ শতাংশ হলো সামাজিক, শিক্ষা বিস্তার, সংস্কৃতি ও জনকল্যাণমূলক কাজ, এবং এই সামাজিক কাজের মধ্যে দাতব্য চিকিৎসা, মসজিদ স্থাপন, স্কুল ও শিশুশিক্ষা অর্থায়ন, খেলাধূলার জন্য ক্লাব প্রতিষ্ঠা অন্যতম। শত অবরোধের মধ্যেও বার্ষিক ৭০-৯০ মিলিয়ন ডলারের একটি বাজেট দিতে সক্ষম হয় হামাস, যার প্রায় ৮৫ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কাজে। প্রতিরক্ষা এবং সামরিক খাতে বরাদ্দ যায় মাত্র ১৫ শতাংশ।

২০১২ সালের হিসাব মতে, গাজা উপত্যকায় শিক্ষার হার প্রায় ৯৯ শতাংশ। সেখানে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এছাড়া প্রায় চার লক্ষাধিক ছাত্রছাত্রীর জন্য ৬৮৩ টি স্কুল রয়েছে যার মধ্যে ৩৮৩ টি স্কুল সরকার অর্থাৎ হামাস পরিচালনা করে।

cover
শিশুদের জন্য অসংখ্য নার্সারি, কিন্ডারগার্টেন স্কুল বা মক্তব প্রতিষ্ঠা করেছে হামাস, যার মাধ্যমে তাদের এক বেলা খাবারও সরবরাহ করা হয়। বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা বা দাতা দেশ থেকে আসা সাহায্য ও আর্থিক অনুদান ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট দক্ষতা ও স্বচ্ছতার পরিচয় দিয়েছে হামাস।

হামাসের সামরিক শক্তি কতটা?
হামাসের সামরিক শাখা ইজ্জদ্দিন আল ক্কাসাম ব্রিগেড যাকে সংক্ষেপে আল ক্কাসাম ব্রিগেড বলা হয়। এটি ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং তখন থেকেই ইসরায়েলকে সামরিকভাবে তটস্থ করে রেখেছে তারা। এই সংগঠনে বর্তমানে নিবন্ধিত ২০ হাজার স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধা রয়েছেন, যারা কোনো বেতন নেন না। বর্তমানে আল ক্কাসাম ব্রিগেডের প্রধান- মোহাম্মদ দিয়েফ এবং উপপ্রধান মারওয়ান ঈশা।  

হামাসের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের ক্ষেপণাস্ত্র। স্থল থেকে স্থলে আঘাত হানতে সক্ষম বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে হামাসের। সম্প্রতি ব্যবহার করা কর্নেট গাউডেড অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তারা মিশরের সিনাই উপদ্বীপ থেকে টানেলের মাধ্যমে নিয়ে আসা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে বেশিরভাগ অস্ত্রই গাজা উপত্যকার অভ্যন্তরে হামাস ও অন্যান্য জিহাদি গোষ্ঠীর অস্ত্রাগারে তৈরি হয়। 

cover
হামাস অস্ত্রগুলো খুব গোপনীয়তার সঙ্গে উৎপাদন ও সংরক্ষণ করে। এজন্য তাদের কাছে আসলে কী পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র আছে- তা অনুমান করা অসম্ভব। ক্কাসাম (১০ কিলোমিটার) ও কুদস ১০১ (১৬ কিলোমিটার) এর মতো স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর বিশাল মজুদ রয়েছে হামাসের। এছাড়া রয়েছে গ্রেড সিস্টেম (৫৫ কিলোমিটার) এবং সেজিলের (৫৫ কিলোমিটার) মতো ক্ষেপণাস্ত্রও। হামাসের অস্ত্র ভাণ্ডারে থাকা বেশিরভাগই এই ধরনের স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র। মর্টার ফায়ারের মাধ্যমে এগুলো শক্তিশালী করা যায়। 

এগুলোর পাশাপাশি হামাস এম-৫৫ (৭৫ কিলোমিটার), ফজর (১০০ কিলোমিটার), আর-১৬০ (১২০ কিলোমিটার) এর মতো বিভিন্ন ধরনের দূর পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাগুলোও পরিচালনা করে। সীমিত সাধ্যের মধ্যেও লিমিটেড টেকনোলজী আর অর্থায়নে ক্কাসাম রকেট দিয়েই ইসরায়েলি বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের আয়রন ডোম অ্যান্টিমিসাইল সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ করেছে। সাম্প্রতিক নানান সংঘাতে ইসরায়েলের উদ্দেশ্যে প্রতিদিন শতাধিক রকেট ছুঁড়েছে হামাস৷ দীর্ঘদিন হামাস রকেটের জন্য ইরানের উপর নির্ভরশীল ছিল৷ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সুদান ও মিশর হয়ে সেখান থেকে অস্ত্র চোরাচালান হতো৷ তবে বর্তমানে গাজাতেই হামাস রকেট বানাচ্ছে বলেও ধারণা করা হয়৷ 





Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021