Link copied.
মহামারী করোনাকালে নতুন রোগ হিসেবে ‘ফাঙ্গাস’ কতটা ভয়াবহ?
writer
১৮ অনুসরণকারী
cover
বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারীর মধ্যেই চিন্তার নতুন কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ফাঙ্গাস নামের একটি রোগ। মূলত ব্ল্যাক, হোয়াইট এবং ইয়েলো ফাঙ্গাসের সংক্রমণ চিন্তার ভাঁজ ফেলছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয়। সম্প্রতি প্রতিবেশী দেশ ভারতে ‘ব্ল্যাক ফাঙ্গাস’ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ার খবর মিলেছে। দেশটিতে এ পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজারের অধিক মানুষ এই ফাঙ্গাসে সংক্রমিত হয়েছেন। বাংলাদেশেও রোগটি সংক্রমণের খবর এসেছে। 

আজকের এই লেখায় ফাঙ্গাস কতটা ভয়াবহ সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করবো।  
ফাঙ্গাস এর নানান ধরণ
প্রচন্ড গরমে তাপমাত্রা যত বাড়ে, চর্মজাতীয় রোগ তত বৃদ্ধি পায়। তাপমাত্রা বাড়ায় শরীরের ঘাম থেকে ত্বকে ঘটতে পারে ছত্রাক বা ফাঙ্গাসের সংক্রমণ। ত্বকের উপরিভাগে যেসব ফাঙ্গাস সংক্রমণ ঘটে তাদের মধ্যে ক্যানডিডা ও ম্যালাসেজিয়া নামক ইস্ট ট্রাইকোফাইটন, মাইক্রোস্পোরাম, ইপিভারমোফাইটন নামক ডার্মাটোফাইট প্রধান। ক্যানডিডা প্রজাতির ছত্রাক দু ধরনের হয়- অরিস এবং অ্যালবিকান্স। তৃতীয় আরেক প্রজাতির ফাঙ্গাস আছে যার নাম অ্যাসপারগিলাস। এর থেকে র‍্যাশ বা ক্ষতের সৃষ্টি হয় এবং এটা প্রধানত ফুসফুসকে আক্রমণ করে। 

পঞ্চাশ লাখের বেশি প্রজাতির ছত্রাক বা ফাঙ্গাস আছে যেগুলোর মধ্যে মানুষের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক হল ক্যানডিডা এবং অ্যাসপারগিলাস। এই দুই প্রজাতির ছত্রাকের সংক্রমণ হলে মানুষ মারা যেতে পারে। ক্যানডিডা একটা জীবাণু যেটা নিত্য প্রয়োজনীয় অনেক জিনিসের ওপর লেগে থাকতে পারে। ডাক্তাররা বলছেন, ক্যানডিডা অরিস (সংক্ষেপে সি. অরিস) ছত্রাকের সংক্রমণ রক্তপ্রবাহে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকসময় তা শ্বাসতন্ত্র, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র এবং শরীরের ভেতরের অঙ্গগুলোকে সংক্রমিত করে। চামড়াতেও সংক্রমণ হয়। ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে ওঠা এই ক্যানডিডা অরিসের প্রথম হদিস মিলে এক দশকের বেশি আগে- ২০০৯ সালে। অ্যাসপারগিলাস ছত্রাকও পরিবেশের মধ্যে থাকে। সাধারণত ঘর গরম করার জন্য হিটিং সিস্টেম বা এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেমের মধ্যে এই জীবাণু বাস করে।

cover
ব্ল্যাক ফাঙ্গাস
ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের বৈজ্ঞানিক নাম মিউকোরমাইকোসিস। এটিকে খুবই বিরল একটি সংক্রমণ হিসেবে ধরা হচ্ছে। মিউকোর নামে একটি ছত্রাকের সংস্পর্শে এলে এই সংক্রমণ হয়। সাধারণত এই ছত্রাক পাওয়া যায় মাটি, গাছপালা, সার এবং পচন ধরা ফল ও শাকসবজিতে। এই ছত্রাক মাটি এবং বাতাসে এমনিতেই বিদ্যমান থাকে। এমনকি নাক ও সুস্থ মানুষের শ্লেষ্মার মধ্যেও এটা স্বাভাবিক সময়ে থাকতে পারে। এই ছত্রাক সাইনাস, মস্তিষ্ক এবং ফুসফুসকে আক্রান্ত করে। কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত ব্যক্তিদের ফুসফুস যেহেতু দুর্বল থাকে, সেজন্য তাদের ক্ষেত্রে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ঢাকার বারডেম হাসপাতালের রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলছেন, ব্ল্যাক ফাঙ্গাস যেহেতু সংক্রামক নয়, সেজন্য এটা নিয়ে চিন্তার কোন কারণ নেই। তবে অণুজীববিজ্ঞানী বেনজির আহমদের মন্তব্য, এটি মানুষে থেকে মানুষে ছড়ায় না বটে, তবে এটি ভিন্নভাবে ছড়াতে পারে। যেমন রোগীর চিকিৎসা-বর্জ্য হিসেবে এটি প্রকৃতিতে গেলে সেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা যদি নিরাপদ না থাকেন বা তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। 


ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে সংক্রমিত রোগীদের সাধারণত যেসব উপসর্গ দেখা দেয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

  • নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং নাক থেকে রক্ত পড়া
  •  নাকের চামড়ার চারপাশে কালো ছোপ ছোপ দাগ দেখা দেয়া
  •  চোখে ব্যথা এবং চোখ ফুলে যাওয়া
  • চোখের পাতা ঝুলে পড়া
  •  চোখে ঝাপসা দেখা, যার থেকে পরে দৃষ্টিশক্তি চলে যায়


হোয়াইট ফাঙ্গাস
ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের পর ভারতে হোয়াইট ফাঙ্গাসের সংক্রমণ দেখা গেছে৷ ভারতীয় চিকিৎসকরা বলছেন ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের বিপজ্জনক রূপ হলো হোয়াইট ফাঙ্গাস বা সাদা ছত্রাক। হোয়াইট ফাঙ্গাসের উপসর্গ আর করোনার উপসর্গ প্রায় একই ধরনের ৷ সিটি স্ক্যান বা এক্স রে করালে সংক্রমণ ধরা পড়ে ৷ এই রোগের প্রভাবে ফুসফুসজনিত সমস্যা তৈরি হতে পারে। পেট, যকৃত, মস্তিষ্ক, নখ, ত্বক এবং গোপনাঙ্গেও ক্ষতি করতে পারে হোয়াইট ফাঙ্গাস। বিজ্ঞানীদের একাংশের মত, হোয়াইট ফাঙ্গাস গর্ভবতী মহিলা এবং শিশুদের বেশি পরিমাণে আক্রান্ত করতে পারে। 



cover
ইয়েলো ফাঙ্গাস
ইয়োলো ফাংগাস রোগের সংক্রমন হলে ক্লান্তি, ত্বকে গোটা, জ্বালা ভাব দেখা দিতে পারে। এই রোগ ফুসফুস থেকে জন্ম নেয় না। কিন্তু মানব দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গের কার্যকলাপ কে বিঘ্নিত করে। শুরুতেই এই রোগের চিকিৎসা শুরু না হলে মারাত্বক আকার ধারণ করতে পারে এই রোগ। 

ইয়োলো ফাংগাস সংক্রমণের কয়েকটি কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য : 

  1. দীর্ঘদিন স্ট্রেরোয়েড ব্যবহার
  2. দূষিত ও সংক্রমিত পরিবেশ 
  3.  অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস 
  4. অপরিষ্কার আশপাশ 
  5. দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা 
  6. বিভিন্ন কো মর্বিডিটি



ভারতে ফাঙ্গাসের শুরু যেভাবে
মে মাসে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ভারতের কলকাতার এক হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি হয়েছিলেন মধ্য বয়সী এক ব্যক্তি। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে ভেন্টিলেটারে দেয়া হয়। প্রাণ বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় স্টেরয়েড ওষুধ দিয়ে তার চিকিৎসা করা হয়। এই স্টেরয়েড পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। কলকাতার ওই রোগী দীর্ঘদিন আইসিইউ-তে থেকে ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করার পর যখন সুস্থ হয়ে বাড়ি যাবার পথে, তখন ডাক্তাররা দেখেন তার শরীরে ক্যানডিডা অরিস নামে একধরনের ছত্রাকের সংক্রমণ হয়েছে, যা প্রাণঘাতী এবং যা সারাতে ওষুধ কাজ করে না। এভাবেই ভারতে সংক্রমণ শুরু এই ফাঙ্গাসের। 

cover
হঠাৎ করে কেন ফাঙ্গাস নিয়ে চিন্তা?
করোনা মহামারির এ সময়ে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস ছড়ানোর কথা বেশি শোনা যাচ্ছে। ফুসফুসে যখন ভাইরাসটি যায়, তখন আমাদের শরীরে অনেক বেশি প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এমন মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়াকে আমরা ‘স্টর্ম’ও বলে থাকি। এতে রোগীর অবস্থা অনেক খারাপ হয়ে যায়। এই স্টর্ম বা ঝড়ের মধ্যে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বা অন্য যেকোনো ‘সুযোগসন্ধানী’ জীবাণু, যেগুলো কিনা সাধারণ পরিস্থিতিতে আক্রমণ করে না, তারা এ সময় সক্রিয় হয়ে ওঠে। স্টেরয়েড প্রয়োগ করে রোগীর এই বাড়াবাড়ি অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। 

কিন্তু যদি এই স্টেরয়েডের পরিমাণ বেশি দিয়ে দেওয়া হয় অথবা রোগীর কোমর্বিডিটি থাকে, তখন রোগীর প্রতিরোধের ক্ষমতা কমে যায়। এসব মানুষের মধ্যে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে অন্য যেকোনো জীবাণুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। স্টেরয়েডের সঠিক ব্যবহারে এর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। আবার যখন স্টেরয়েডটা দেওয়া হচ্ছে, তখন পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। পরিচ্ছন্নতার অভাব এই ফাঙ্গাস ছড়ানোর একটি কারণ হতে পারে।
ফাঙ্গাস থেকে কি বাঁচা সম্ভব?
cover
মিউকরমাইকোসিস আসে পরিবেশ থেকে। তাই একে রোধ করা কঠিন। এর কোনো টিকা নেই। যেসব মানুষের প্রতিরোধশক্তি কম, তাদের জন্য কিছু পরামর্শ আছে ঝুঁকি কমানোর। তবে এর মাধ্যমে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকা যাবে, এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এর প্রতিবেদন
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এক প্রতিবেদনে বলছে, মিউকরমাইকোসিস আসে পরিবেশ থেকে। তাই একে রোধ করা কঠিন। এর কোনো টিকা নেই। যেসব মানুষের প্রতিরোধশক্তি কম, তাদের জন্য কিছু পরামর্শ আছে ঝুঁকি কমানোর। তবে এর মাধ্যমে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকা যাবে, এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নির্মাণকাজ বা খননকাজ চলছে এমন স্থানে যাওয়া যাবে না। যদি যেতেই হয় তবে এন-৯৫ মাস্ক পরে যাওয়া উচিত। বন্যা বা পানিতে ডুবে ছিল এমন ভবনে না যাওয়া উচিত। ধুলাবালু এড়িয়ে চলতে হবে, এড়িয়ে চলতে হবে স্যাঁতসেঁতে এলাকাও। বাগানে, উঠানে বা বনের মধ্যে ঘুরতে গেলে জুতা, ফুল প্যান্ট এবং ফুল স্লিভ শার্ট পরতে হবে। মাটি ধরতে হয়—এমন কাজের জন্য অবশ্যই গ্লাভস পরে থাকতে হবে। চামড়ার মাধ্যমে যেন সংক্রমণ না হয়, সে জন্য আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার রাখতে হবে। বিশেষ করে এসব স্থানে যদি ধুলাবালু লাগে, তবে অবশ্যই তা সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। রোগীর স্টেরয়েড ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাবধানী হতে হবে। 

কোভিড-১৯ রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। শরীরের চামড়ায় যাতে কোন ইনফেকশন না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা। কোথাও কেটে গেলে কিংবা চামড়া উঠে গেলে সেটি যাতে ধুলো-ময়লার সংস্পর্শে না আসে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। মাস্ক ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে। সংস্থাটি বলছে, এসব সতর্কতা মূলক ব্যবস্থা নিলেই যে মিউকোরমাইকোসিস সংক্রমণ এড়ানো যাবে সেটি এখনো পুরোপুরি প্রমাণিত নয়।




Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021