Link copied.
বার্সা সাম্রাজ্যের করুণ পরিণতি: ধ্বংসের পেছনে কারা?
writer
অনুসরণকারী
cover
চলতি মাসে বার্সেলোনার নতুন কোচ জাভি হার্নান্দেজ যখন বলেন, 'দলের অনেক ফুটবলারই পাসিং ফুটবল বুঝেনা' তখন সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে দর্শকদের মাঝেও অনেক অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কৌতূহলী সমর্থক, সমালোচক প্রায় সবারই নজর গিয়েছে কয়েকজন নির্দিষ্ট ফুটবলারের দিকে যারা ঢাকঢোল পিটিয়ে বার্সেলোনায় এলেও দলকে ব্যক্তিগতভাবে কিছুই দিতে পারেননি এখনো। এটাতো এখনকার ঘটনা! কিন্তু ১ বছর আগের সময়ে ফেরা যাক। বার্তামেউ যখন বার্সেলোনার প্রেসিডেন্ট তখন সমীকরণ দাঁড়িয়েছিল হয় মেসি থাকবে নয়তো বার্তামেউ! হয়তো পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘটনা কখনোই ঘটেনি যেখানে একজন খেলোয়াড়ের থাকা না থাকার কারণে পদত্যাগ করতে হয়েছে কোনো ক্লাবের প্রেসিডেন্টকে। ২০২০ সালের দলবদলে মেসির দল ছাড়া অনেকটাই নিশ্চিত হয়েছিল। ম্যানচেস্টার সিটি অপেক্ষা করেছিল তাকে স্বাগত জানানোর জন্য। সিটির কোচ গার্দিওলা তখন শুধু মেসিকেই পেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সবশেষে মেসি থেকে গেলেন কিন্তু বিদায় নিলেন বার্তামেউ। 
cover
তার পদত্যাগের মধ্যদিয়ে সমর্থকেরা ধরেই নিয়েছিলেন দুর্দিন পার করে নতুন আলোয় আলোকিত হওয়ার সময় বুঝি এসেই গেলো! ইউরোর আগে নেদারল্যান্ডসকে বিদায় জানিয়ে কোচ হিসেবে আসলেন রোনাল্ড কোম্যান! ক্লাবের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ডিফেন্ডারও তিনি! যতোদিন মেসির পা থেকে গোল আসছিল ততদিন সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল কোম্যানের! চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচে ধরাশায়ী হওয়ার পর তাকে নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। কিন্তু এত এত ব্যর্থতা কিংবা সমালোচনার জন্য মাঠের ফুটবল ঠিক যতোটা দায়ী মাঠের বাইরের পরিচালনা পর্ষদ কি দায়ী নয়? এখন অবধি এই প্রশ্নের উত্তর যেমন কেউ খুঁজেনি তেমনি এটি নিয়ে আলোচনাও কেউ করেনি। আজ আমরা আলোচনা করব বার্সেলোনার এমন চরম পতনের পেছনে সামগ্রিক কারণ সমূহ নিয়ে! 
বার্তামেউ বোর্ড ঠিক কতোটুক দায়ী?

২০১৫ সালের ১৯ জুলাইয় তারিখে ৫৪.৬৩ শতাংশ ভোট পেয়ে বার্সেলোনার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন জোসেফ মারিয়া বার্তামেউ। বর্তমান প্রেসিডেন্ট লাপোর্তা সেবার পেয়েছিলেন ৩৩.০৩ শতাংশ ভোট। এর আগে লাপোর্তা ২০০৩ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। সেবারের নির্বাচনে কিংবদন্তী ক্রুয়েফ লাপোর্তার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। তবুও ভোটাররা বার্তামেউকে নির্বাচিত করে নতুন কিছুর আশায় দিনযাপন করেন। বার্তামেউ ক্লাবের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময়ে সর্বমোট ১৮টি শিরোপা জিতে বার্সেলোনা। সফলতা হিসেব করলে এই অর্জনটি অনন্য। তার অধীনেই কোচ লুইস এনরিকে গড়েছিলেন অন্যতম সেরা আক্রমণ ত্রয়ী। তাহলে কেন গত দুই বছর যাবত এই বার্তামেউকে ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে প্রেসিডেন্টের তকমা দিতে চাচ্ছেন দলের সমর্থকদের একাংশ?
cover
এর উত্তরের জন্য একাধিক বিষয় আলোচনা করতে হবে। প্রথমতো, বার্তামেউর নিজের স্বীকারোক্তি পর্যালোচনা করা যাক। পদত্যাগের পর তিনি সংবাদমাধ্যমে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের দুটো ভুলের কথা স্বীকার করেন। ২০১৯ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নকআউট পর্বের ম্যাচে লিভারপুলকে ঘরের মাঠে পরাজিত করেও অ্যানফিল্ডে ৪-০ গোলের ব্যবধানে হেরে যায় বার্সেলোনা। সে সময় তিনি রদবদলের সিদ্ধান্ত নেননি কোনোপ্রকার। তার মতে অনেক খেলোয়াড়ই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছিল তাকে, কিন্তু তিনি পরিচালকদের কথা প্রাধান্য দিতে গিয়ে খেলোয়াড়দের অবজ্ঞা করেছেন। অতঃপর তিনি বলেছেন কোভিড-১৯ পরবর্তীতে অর্থনৈতিক লাগাম ধরে রাখতে না পারার ব্যর্থতা। তার মতে তিনি আগেই এত এত অর্থ ব্যয় করেছেন যার কারণে নতুন করে বিষয়গুলোকে সামলাতে পারেননি। 
cover
বার্তামেউর পদত্যাগের পর জানা গেলো বার্সেলোনার মোট ঋণের পরিমাণ ১.৩ বিলিয়ন ইউরো! এত এত অর্থ তিনি যে আত্মসাৎ করেছেন তাও কিন্তু না। বরঞ্চ তার সময়ে বার্সেলোনায় যোগ দেয়া কৌতিনহো, ডেম্বেলে, গ্রিজম্যানদের দলবদলে উচ্চ মাত্রায় অর্থ ব্যয় করেছিল তার বোর্ড। বার্তামেউ বোর্ডের পরিচালকের দায়িত্বে থাকা এরিক আবিদালও একাধিক খেলোয়াড় বিকিকিনি করে বিতর্কের সৃষ্টি করেছিলেন। যাইহোক, বার্তামেউ নিজের ভুল স্বীকার করেও সমর্থকদের কাছে হারানো জনপ্রিয়তা খুঁজে পাননি। পদত্যাগের পর গ্রেফতার হয়েছিলেন তিনি। যদিও গ্রেফতারের একদিন পরেই তাকে ছেড়ে দেয় কাতালান পুলিশ। শেষেদিকে, লিও মেসির সমর্থণ থেকেও বঞ্চিত হয়েছিলেন বার্সেলোনার ইতিহাসে অন্যতম সফল এই সভাপতি। অথচ তিনি মেসিকে উপহার দিয়েছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বেতনের চুক্তি!
মেসির বেতন কি বার্সেলোনাকে ডুবিয়েছে?

সাম্প্রতিকালে মেসির ১৫ বছরে ১০ বার চুক্তি নবায়নের বিষয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। কারো কারো মতে লিওকে খুঁশি করতে গিয়েই ডুবেছে বার্সেলোনা ক্লাবটি। প্রকৃতপক্ষে কী তাই? কেন সমর্থকদের একাংশ এবং সমালোচকরা এভাবে অভিযোগ তুলছেন সে বিষয়ে জানা যাক। প্রথমতো, প্রতি মৌসুমে বার্সেলোনা প্রায় ৫০০ মিলিয়নের অধিক বাজেট নিয়ে শুরু করে। যার মধ্যে খেলোয়াড়, স্টাফদের বেতনভাতাও থাকে। পেছনে ফেরা যাক, ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লিও মেসি ক্যারিয়ারের প্রথম পেশাদার চুক্তি সাক্ষর করেন বার্সেলোনার সাথে। এই চুক্তির ৯ মাস পরেই মূলদলের হয়ে অভিষেক হয় তার। এরপর ২০০৫ সালের জুন মাসে তার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করে ক্লাবটি। ২০১০ সাল অবধি সাক্ষরিত চুক্তিতে মেসির রিলিজক্লজ নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৫০ মিলিয়ন ইউরো। মূলত মেসিকে দলের জন্য অপরিহার্য এবং সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বোঝাতেই দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি প্রস্তাব করেছিল ক্লাবটি। সভাপতিও তখন হুয়ান লাপোর্তা!
cover
জুনে চুক্তি সাক্ষরের ৩ মাস না যেতেই একই বছরের সেপ্টেম্বরে আবারো নতুন একটি চুক্তি সাক্ষর করেন মেসি যেখানে ২০১৪ সাল অবধি দ্বিগুণ বেতন গ্রহণ করবেন বলে উল্লেখ রয়েছে। ২০০৭ সালের মার্চ মাসে ক্লাবের সঙ্গে সম্পর্কের চুক্তি নবায়ন না করলেও বেতনের চুক্তি নবায়ন করেন মেসি। সেবারের চুক্তিতে সপ্তাহে ১ লাখ ইউরো শুধুমাত্র বেতন নিবেন এমন চুক্তিতে সম্মত হন মেসি এবং বার্সেলোনা। ২০০৮ সালের জুলাইয়ে মেসি হয়ে যান বার্সেলোনার সর্বোচ্চ বেতনভোগী তারকা। রোনালদিনহো বিদায়কালে মেসিকে ১০ নম্বর জার্সি দিয়ে যান। ২০০৯ সালে বার্সেলোনা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার ৩ মাসের মাথায় আবারো নতুন করে চুক্তি নবায়ন করেন মেসি। চুক্তি অনুযায়ী বেতন দ্বিগুণের পাশাপাশি ২০১৬ সাল অবধি বার্সেলোনায় থাকার জন্য চুক্তিবদ্ধ হন এই আর্জেন্টাইন তারকা। এরপরের চুক্তি নবায়নের জন্য মেসিকে অপেক্ষায় থাকতে হয়েছিল ২০১৩ সাল অবধি। সেবারের চুক্তি অনুযায়ী মেসি ২০১৮ সাল অবধি বার্সেলোনায় থাকার ব্যাপারে সম্মত হন। চুক্তি নবায়নের এক বছরের মাথায় গুঞ্জন রটে ম্যানচেস্টার সিটি মেসির ২৫০ মিলিয়ন রিলিজক্লজ পরিশোধ করতে আগ্রহী। মেসির বাবা জর্জ মেসি একাধিক মেইল পেয়েছিলেন বলেও সংবাদমাধ্যমে গুঞ্জন রটেছিল। এমতাবস্থায় তার বেতন বাড়িয়ে নতুন করে চুক্তিবদ্ধ হয় কাতালান ক্লাবটি।
cover
২০১৫ সালে বার্সেলোনা ট্রেবল জেতায় মেসি সহ একাধিক খেলোয়াড়কে চুক্তি নবায়নের প্রস্তাব দেয়। যদিও ২০১৬ সালে গিয়ে নবায়ন করেছিলেন তিনি। একইসাথে বলেছিলেন বার্সেলোনায় ক্যারিয়ার সমাপ্ত করার কথা। একই বছর করফাঁকি মামলার নিষ্পত্তি হয় তার। সেখানে সরাসরি মেসিকে সাহায্য করেন লা লিগা প্রেসিডেন্ট তেবাস। যদিও মেসির সঙ্গে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চুক্তিটি করে ২০১৭ সালে। বার্সা প্রেসিডেন্ট বার্তামেউ মেসিকে ২০২১ সাল অবধি ৬৫০ মিলিয়ন ইউরো বেতন ভাতা দেয়ার ব্যাপারে সম্মত হন। যদিও তখন কিছুই প্রকাশ হয়না সংবাদমাধ্যমে। ২০১৯ সালে বার্সার ভরাডুবির পর বার্তামেউর সাথে মেসির সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করলে এসব বিষয় ফাঁস হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে বিতর্কিত হন মেসি নিজেও। অনেক সাংবাদিক মনে করেন মেসিকে এই বিশাল চুক্তির অর্থ প্রদান করতে গিয়েই ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল ক্লাবকে। যার ফলে বার্সেলোনার ঘাঁড়ে ১.৩ বিলিয়ন ব্যাংক লোনের বোঝা গিয়ে ঠেকেছে। যদিও এত এত অর্থের বিনিময়ে বার্সেলোনার ইতিহাসের সিংহভাগ যে আবার তিনিই লিখেছেন সে বিষয়টিও এড়িয়ে চলার উপায় নেই। অন্যদিকে, বার্তামেউকে যারা ভিলেন বানান তাদেরও মনে রাখা উচিত মেসিকে খুঁশি করতে গিয়েই এত এত অর্থ খুইয়েছেন তিনি এবং তার বোর্ড। এখন দেখার বিষয় জাভি হার্নান্দেজ তরুণদের দিয়ে কিভাবে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি ভিত্তি গড়তে পারেন সে বিষয়টি। কিংবদন্তী জাভির জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জ হলেও বার্সেলোনার সামনে বিকল্প কিছুই নেই।

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021