Link copied.
পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে ভিডিও গেম ইন্ডাস্ট্রির একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের গল্প
writer
অনুসরণকারী
cover
অবসর কাটানোর জন্য মানুষ যুগ যুগ ধরে নানা বিনোদন মাধ্যমের আশ্রয় নিয়ে এসেছে। খেলাধুলা, সঙ্গীত, চলচ্চিত্র এগুলো অনেক আগে থেকেই সর্বস্তরের মানুষের বিনোদনের খোরাক মিটিয়ে আসছে। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে যেমন সঙ্গীত ও চলচ্চিত্র উপভোগ সহজসাধ্য হয়েছে, তেমনি আবির্ভাব ঘটেছে নতুন নতুন বিনোদন মাধ্যমের। এমনই একটি মাধ্যম হলো ভিডিও গেম। সঙ্গীত ও চলচ্চিত্র যেখানে অনেক পুরনো, সেখানে মাত্র পঞ্চাশ বছর আগে আবির্ভূত হয়ে ভিডিও গেম বিনোদনের বাজারে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে। আর এর শুরুটা আসলে হয়েছে কম্পিউটারের পর্যায়ক্রমিক উন্নতির হাত ধরেই। 
পারসোনাল কম্পিউটার (পিসি) ছাড়াও এখন গেম খেলার জন্য বিভিন্ন কনসোল ব্যবহৃত হয়। প্রতি বছর নিত্য নতুন গেম মুক্তি পাচ্ছে আর এই সেক্টর থেকে গেম প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো আয় করছে কয়েক বিলিয়ন ডলার। ভিডিও গেমের এই জগতের যাত্রা কীভাবে শুরু হয়েছে এবং এর ভবিষ্যৎ কী, তা নিয়েই আজ আমরা বিস্তারিত আলোচনা করবো। 
cover
শুরুর গল্প
ভিডিও গেমের প্রথম ধারণা আসে মূলত ষাটের দশকে। তখন ল্যাবে বিভিন্ন গেমের প্রোগ্রাম তৈরি করা হতো। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে গেমিং ইন্ডাস্ট্রির যাত্রা শুরু হয় আতারি ইন্টারেক্টিভ নামে এক ফরাসি কোম্পানির মাধ্যমে। তারা ১৯৭২ সালে ‘পং’ নামের একটি গেম বাজারজাত করে। এটি ছিল মূলত একটি টেবিল টেনিস গেম। পিক্সেল আকারে তৈরি এসব টু ডাইমেনশনাল গেমকে তখন আরকেড গেম বলা হতো। এ গেমটির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে দেখে অনেক কোম্পানি একে নকল করে নিজেদের সংস্করণ বের করতে থাকে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আতারি ইন্টারেক্টিভ শুধু এই গেম খেলার জন্যেই ১৯৭৫ সালে নিজেদের কনসোল বাজারে বের করে। পরবর্তীতে এর হালনাগাদ সংস্করণ হিসেবে ১৯৭৭ সালে বের হয় আতারি ২৬০০ হোম কনসোল। 
cover
অনেক অল্প সময়ের মাঝেই আরকেড গেমগুলো বাজারে জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়। নকল পং গেমের ভীড়ের মাঝে ভিন্নতা যোগ করতে ১৯৭৮ সালে আগমন ঘটে স্পেস ইনভেডার গেমের। আর এরই মাঝে শহরের সকল জায়গায় আরকেড মেশিন স্থাপন করা শুরু হয়ে যায়। বাজারে আগমন ঘটে আরো বেশ কিছু জনপ্রিয় গেম। প্যাক-ম্যান, ডংকি কং এর মতো বেশ কিছু গেম পেয়ে যায় বিপুল জনপ্রিয়তা। স্কুল-কলেজগামী ছেলেমেয়েরা ভীড় করতে থাকে আরকেড মেশিনগুলোর দোকানে। পকেট ভর্তি কয়েন নিয়ে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় পার করে দিতো এই মেশিনের সামনে। এতে করে ১৯৮২ সালের মাঝেই আরকেড গেমের বাজার চলচ্চিত্র ও সংগীতের বাজার থেকে বেশি আয় করতে শুরু করে। 
cover
প্রযুক্তি যেভাবে বদলে দিয়েছে ভিডিও গেমের বাজার
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ভিডিও গেম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ফুলে ফেঁপে উঠতে শুরু করে। আতারি কোম্পানি উচ্চ মানের প্যাক-ম্যান বের করে। একই সাথে তৎকালীন মুক্তি প্রাপ্ত জনপ্রিয় জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ই.টি. দ্য এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল এর গেম সংস্করণ তারা বের করে। কিন্তু তড়িঘড়ি করে মুক্তি দেওয়ায় এরা অনেক নিম্ন মানের হয়। আর এর প্রভাবে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি কোম্পানির ব্র্যান্ড ভ্যালুতেও আঘাত লাগে। 
১৯৮২ সাল থেকে পারসোনাল কম্পিউটারে গেমিং জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে বাজারে কমোডোর ৬৪ নামক ৮-বিট কম্পিউটার আসার পর। মূলত সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির উত্তরোত্তর উন্নতির উপর ভর করেই গেমিংয়ের বাজার প্রতিযোগিতামূলক হতে শুরু করে। ১৯৮৫ সালে গেম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নিনটেন্ডো তাদের নিজস্ব গেমগুলোর জন্য কনসোল বাজারজাত করে। তাদের কনসোলের নাম ছিল নিনটেন্ডো এন্টারটেইনমেন্ট সিস্টেম (এনইএস) হোম কনসোল। তাদের বের করা জনপ্রিয় গেমগুলো কেবল তাদের ডিভাইসেই খেলা যেত। এভাবে জাপানী এই প্রতিষ্ঠানটি গেমের বাজারে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে। একই সাথে ডাকহান্ট, এক্সাইটবাইক ও সুপার মারিও ব্রোস-এর মতো গেম নিনটেন্ডো কনসোলের জনপ্রিয়তা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। 
cover
নিনটেন্ডো কনসোল ও তাদের আরেক সংযোজন গেমবয় এর মাধ্যমে এই কোম্পানি তাদের আধিপত্য বজায় রেখেছিল ঠিকই। কিন্তু অন্যান্য কোম্পানিগুলোও এই প্রতিযোগিতার বাজারে একেবারে পিছিয়ে ছিল না। ১৯৮৮ সালে সেগা নামক অপর একটি প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব সেগা মেগা ড্রাইভ কনসোল বের করে। উত্তর আমেরিকার এ প্রতিষ্ঠানটি তাদের যন্ত্রের প্রসেসিং ক্ষমতার উপর বেশি জোর দেয়। 
পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে এসে গেমের প্রতিযোগিতায় নাম লেখায় ইলেকট্রনিক্স কোম্পানি সনি। প্রত্যেক গেমের স্টোরেজ বৃদ্ধির জন্য তারা সিডি-রম ব্যবহারের প্রচলন শুরু করে। সনির বের করা প্রথম প্লেস্টেশন বিশ্বের ভিডিও গেম বাজারে ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়। বিশ্বব্যাপী এই কনসোলের প্রায় ১০ কোটি ইউনিট বিক্রি হয়েছিল। প্লেস্টেশন ১ ব্যবসাসফল হলে সনি পরবর্তীতে প্লেস্টেশন ২ ও প্লেস্টেশন ৩ বাজারে ছাড়ে। প্রত্যেকটি যন্ত্রে পর্যায়ক্রমে আধুনিক প্রসেসর, সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যারের সংযোজন করা হয়। এভাবে ভিডিও গেম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সনি বর্তমানে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। 
cover
এতকিছু দেখার পর মাইক্রোসফটও গেমের জগতে পা দেয়। তারা নিজেদের ডিরেক্ট এক্স এপিআই ভিত্তিক গেম খেলার কনসোল বাজারে ছাড়ে। এই কনসোলের নামকরণ করা হয় এক্সবক্স। বর্তমান কনসোল বাজারে প্লেস্টেশন ও এক্সবক্স একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। 
ইন্টারনেটের আগমন
ইন্টারনেট আসার পর ভিডিও গেমের কোম্পানিগুলোর ব্যবসা বলতে গেলে কয়েক গুণ বেড়ে যায়। কাহিনী ভিত্তিক গেমের জায়গায় অনলাইন গেম বেশি জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। অনলাইনে গেম খেলার সময় কোম্পানির সার্ভারের সাথে যুক্ত থাকা লাগে। এছাড়াও রয়েছে অনলাইন ক্রয়-বিক্রয়ের সুব্যবস্থা। 
মোবাইল ফোন টেকনোলজির নজিরবিহীন উন্নতি ভিডিও গেম ভোক্তাদের এক নতুন দল তৈরি করে দিয়েছে। এখন আমরা স্মার্টফোনেই নানারকম গেম খেলে সময় পার করতে পারি। অনলাইন গেমকে সঠিকভাবে উপভোগ করার জন্য কোম্পানিগুলোও নানা সুবিধা দিতে শুরু করেছে। এই যেমন মাইক্রোসফট এক্সবক্স লাইভ নামক সুবিধা দিচ্ছে। এর মাধ্যমে এক মাসের জন্য একটি নির্দিষ্ট ফি দিয়ে সকল প্রকার অনলাইন গেম খেলা যায়। রয়েছে অত্যাধুনিক ভয়েস চ্যাট সুবিধা। প্লেস্টেশনও এক্সবক্স এর মতো পিএসএন প্লাস নামক সার্ভিস চালু করেছে।
প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে নেই পারসোনাল কম্পিটারও। পিসি গেমিং ভিত্তিক কোম্পানি ব্লিজারড ২০০৪ সালে মুক্তি দেয় তাদের মাল্টিপ্লেয়ার গেম ওয়ার্ল্ড অফ ওয়ারক্রাফট। বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ১৪ মিলিয়ন গেমার এই অনলাইন গেমটি খেলে থাকে। 
cover
মোবাইল গেম ভোক্তাদের নজরে রেখে নোকিয়া ও ব্ল্যাকবেরি তাদের মোবাইল ফোন গুলোতে গেম খেলার জন্য আলাদা ইঞ্জিন ব্যবহার করতে শুরু করে। কিন্তু এই মোবাইল গেম সেক্টরের আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে অ্যাপলের আইফোন। তারা নিজেদের অ্যাপস্টোর বের করে। যার মাধ্যমে আইফোন ব্যবহারকারীরা ফ্রীতে অথবা নির্দিষ্ট দামে ইচ্ছামতো গেম কিনে খেলতে পারবে। পরবর্তীতে গুগল তাদের এন্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম এর জন্য প্লে স্টোর তৈরি করে। এটি মূলত অ্যাপল স্টোরের মতোই। তবে এটি সকল এন্ড্রয়েড ফোন ইউজার ব্যবহার করতে পারবে। 
cover
মোবাইল গেমের জনপ্রিয়তা স্বল্প পুজিতে তৈরি গেম কোম্পানিগুলোর জন্য সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলে দেয়। স্মার্টফোন চালায় কিন্তু অ্যাংরি বার্ডস গেমের নাম শোনেনি এমন মানুষের সংখ্যা অনেক কম। ২০১০ সালে এই গেম থেকে রোভিও এন্টারটেইনমেন্ট এর আয় ছিল ৬.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১১ সালে যা পৌঁছে দাঁড়ায় ৭৫.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এভাবে বহু মোবাইল গেম বিভিন্ন সময়ে সাধারণ মানুষের মন জয় করে নিয়েছে। অবসর সময় কাটানোর জন্য এরকম গেমগুলোর এখনো চাহিদা অনেক বেশি। আর এখন প্রতিযোগিতাও অনেক।
একে একে গুগল, আমাজন, সনি, মাইক্রোসফট সকল টেক জায়ান্টরা এই সেক্টরে বিনিয়োগ করছে। আর করবেই বা না কেন। পোকেমন গো নামের এক ভিন্নধর্মী মোবাইল গেমই বছরে এক বিলিয়ন ডলার আয় করে ফেলছে। এদিকে গ্র্যান্ড থেফট অটো ৫ এর মাধ্যমে রকস্টার গেমস মাত্র তিন দিনেই এক বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছুঁতে পেরেছে। 
ভিডিও গেমের ভবিষ্যৎ
মূলত প্রযুক্তি যত আধুনিক থেকে আধুনিকতর হবে, তার সাথে ভিডিও গেমেরও উন্নতি সাধন হবে। বর্তমানে অনলাইন গেমের বাজারে আধিপত্য বিস্তার করেছে ব্যাটল রয়াল গেমগুলো। একের পর এক নতুন নতুন ব্যাটল রয়াল গেম বের হচ্ছে। এদের ভোক্তাও বাড়ছে দ্রুত বেগে। ক্লাউড ভিত্তিক গেমিং সেবা চালু হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই। ভার্চুয়াল রিয়ালিটির ব্যবহারও এখন পাকাপোক্তভাবে শুরু হয়েছে। গুগল তাদের স্টেডিয়া নামক গেমিং সুবিধার মাধ্যমে আশ্বাস দিচ্ছে যে ভবিষ্যতে উচ্চমানের গেমের জন্য কেবল উচ্চমানের ইন্টারনেট গতিই যথেষ্ট। দামী যন্ত্রের প্রয়োজন হবে না। যদিও এ ধরণের প্রযুক্তির সফলতা অনেক কিছুর ওপর নির্ভরশীল। 
cover
গেমের ব্যবসা এখন কেবলমাত্র গেম বিক্রির মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই। ইউটিউব, ফেসবুক ও টুইটারের মতো ওয়েবসাইটের মাধ্যমে গেমাররাও গেম খেলে এই খাত থেকে অর্থ উপার্জন করতে পারছে। যেই বোর্ড গেমগুলো খেলতে কয়েকজনের একসাথে এক জায়গা বসা লাগতো, তা এখন দূর দূরান্ত থেকেও খেলা সম্ভব। এভাবে গেমের মাধ্যমে সামাজিক দূরত্বও একরকম কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
কোনো কিছুই ক্ষতির ঊর্ধ্বে নেই। মাত্রাতিরিক্ত ভিডিও গেমের পেছনে সময় দিলে তা আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও প্রভাব ফেলে। প্রত্যেক গেমের রেটিং সিস্টেম রয়েছে। অর্থাৎ চলচ্চিত্রের মতো সব গেমও সব বয়সের মানুষের জন্য না। এই রেটিং সিস্টেম অনুসরণ না করে বাচ্চাদের প্রাপ্তবয়স্কদের গেম খেলতে দেওয়া উচিত নয়। তাছাড়াও বাচ্চারা যাতে গেমে অতিরিক্ত পরিমাণে আসক্ত হয়ে না পড়ে সেদিকে অভিভাবকদের নজর দিতে হবে। 
cover

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021