Link copied.
ইতিহাস বিখ্যাত নৌ-যুদ্ধ ‘ব্যাটেল অফ ট্রাফালগার’
writer
অনুসরণকারী
cover
আধুনিক সমরবিদ্যায় নৌবাহিনী খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। মানুষ সভ্য হওয়ার পরপরই যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। শুরুদিকে সেটি স্থলকেন্দ্রিক যুদ্ধই বেশি ছিলো। আস্তে আস্তে নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা বিকশিত হওয়ার পর, উপকূল এবং জল সীমানায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তৃতের জন্য নৌবাহিনীর প্রয়োজন অনুভূত হয়। স্থলযুদ্ধে বিভিন্ন কৌশল আয়ত্ত্ব এবং সেটার যথোপযুক্ত প্র্যোগ সম্ভব হলেও, নৌ যুদ্ধে কৌশলের প্রয়োগ করা খুব কঠিন কাজ। আজকে আমরা জানবো “নেপোলিয়নিক যুদ্ধকাল” সময়ে সবচেয়ে বিখ্যাত নৌ যুদ্ধ ব্যাটেল অফ ট্রাফালগার নিয়ে। এই যুদ্ধের রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবের পাশাপাশি, নৌযুদ্ধে যেই কৌশল ব্যবহার করা হয়, সেটি পরবর্তীতে সমরবিদ্যায় খুব গুরুত্বপূর্ণ স্থান লাভ করে।
যুদ্ধের প্রেক্ষাপট
ইউরোপে তখন বিশ্বজয়ী নেপোলিয়নের জয় জয়কার। ফ্রান্স, স্পেন, জার্মান দখল করে বিশাল সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আসীন হয়ে আছেন তিনি। স্থল যুদ্ধে নেপোলিয়নের বাহিনী তখন অদম্য, দুর্দমনীয়। সেই সময়ে তখন তাদের প্রবল প্রতিপক্ষ ব্রিটিশরা। স্থল যুদ্ধে নেপোলিয়নরা অদম্য হলে, নৌযুদ্ধে ব্রিটিশদের ধারে কাছে কেউ নেই। ব্রিটিশদের রয়্যাল নেভী বর্তমান যুগেও অন্যতম অভিজাত বাহিনী হিসেবে তাদের সুনাম রয়েছে। এবার একটু পেছনে যাওয়া যাক।

সময়টা তখন ১৮০০ সাল। ফ্রান্স তখন ম্যারেঙ্গা আর হোহানলাইডেন দখল করে অস্ট্রিয়াকে আলাদা শান্তি চুক্তিতে আসতে বাধ্য করেছে। ফ্রান্সের জলপথকেন্দ্রীক ব্যবসায়িক রুটগুলোতে তখন ব্রিটিশরা বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তৈরী করে রেখেছে। এই কর্মকান্ডে ফ্রান্স ছাড়াও ইউরোপের বাকি দেশগুলোও সমস্যায় পড়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রুশিয়া (বর্তমান জার্মানী), দাশিয়া, ডেনমার্ক, ব্রিটেন বিরোধী জোট গঠন করে এবং স্থলপথ কেন্দ্রিক ব্যবসায়িক রুট তৈরী করে। ব্রিটিশরা এটা দেখে চুপচাপ বসে থাকে নাই, তারা ১৮০১ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেন আক্রমণ করে এবং ডেনমার্ককে চাপ দিয়ে সেই জোট থেকে বের হয়ে যায়। পরবর্তীতে রাশিয়ার জার পল প্রথম মারা গেলে তার পুত্র আলেকজান্ডার প্রথম ক্ষমতায় আসে। সে ব্রিটিশদের সাথে সমঝোতায় আগ্রহী হয়ে ওঠে, এর পরেই সেই জোট মূলত অকার্যকর হয়ে যায়। এতে সবচেয়ে ক্ষতি হয় ফ্রান্সেরই। 
cover
১৮০২-১৮০৩ ইউরোপ মোটামুটি শান্ত সময়ই পার করে, খুব বড় কোনো যুদ্ধ এই সময়ে সংগঠন হয়নি। তবে সাগরে ফ্রান্স আর ব্রিটেনের চোরপুলিশ খেলা চলতেই থাকে। ১৭৯১ সালে ফ্রান্সের উপনিবেশ হাইতিতে বিদ্রোহ সংগঠিত হয়। নেপোলিয়ন সেই বিদ্রোহ দমন করার জন্য, একটি জাহাজ পাঠালে, ব্রিটিশরা সেই জাহাজের পেছনে তাড়া করে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরবর্তীতে সেখানে একটা শান্তি চুক্তি করে তারা। সেই চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটিশরা হাইতির উপর আবরোধ তুলে ফেলে এবং মাল্টা ও মিশর থেকে কলোনী সরিয়ে নেয়ার জন্য রাজী হয়। এর পরবর্তীতে ফ্রান্স , নেপলস এবং প্যাপাল প্রদেশ থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে রাজী হয়। কিন্তু এই চুক্তি ঠিক মতো কার্কর করে নি কোনো পক্ষই। নেপোলিয়ন ব্রিটিশ দখল করার জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেয়া শুরু করে। তিনি তার সৈন্যবাহিনীকে ব্যুলোন নামক জায়গায় সমাবেশ করান।

তবে তারা যুদ্ধ ঘোষণা করার আগেই ব্রিটিশরা যুদ্ধ ঘষণা করে, ইতিহাসে সেই যুদ্ধকে ‘ব্যাটেল অফ থার্ড কোয়ালিশন’ বলা হয়। সেই যুদ্ধে ফ্রান্স পুরোপুরি তৈরী ছিলো না। ব্রিটিশদের সাথে যুদ্ধ করতে গেলের ফরাসীদের একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী দরকার ছিলো। কিন্তু সে সময়ে নেপোলিয়নের যুদ্ধ জাহাজগুলো বিভিন্ন জায়গায় অবরুদ্ধ হয়েছিলো ব্রিটিশদের দ্বারা। যেমন: ২১ টা জাহাজ ব্রেস্ট উপকূলে, ১২ টা জাহাজ তুলন উপকূলে এবং ৯ টা আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থান করছিলো। 
cover
১৮০৪ সালে নেপোলিয়ন পরিকল্পনা করে যে তার একটি নৌবহর ব্রিটিশদের ফাঁকি দিয়ে সাগরের মুক্ত অঞ্চলে চলে যাবে, তারপর ফিরে এসে সজোরে আক্রমণ করে, প্রতিবন্ধকগুলো ভেঙে বাকি নৌবহর গুলোর সাথে যুক্ত হবে,। যুক্ত হয়ে, ব্রিটিশ উপকূলে আঘাত হানার জন্য তৈরী হবে।

যুদ্ধ
নেপোলিয়নের এই পরিকল্পনা পুরোপুরি সফল হয় নাই। অক্টোবরে ব্রিটিশ নৌবাহিনী স্পেনের কিছু নৌযান ডুবিয়ে দেয় যার ফলে স্পেন ফ্রান্সের সাথে ব্রিটিশ বিরোধী যুদ্ধ্বে যোগ দেয়। ১৮০৫ সালের এপ্রিলে ফ্রান্সের তুলন বন্দর থেকে ভাইস এডমিরাল পিয়ের‍্যে ভিলানোভ এর নেতৃত্বে একটা নৌবহর জিব্রাল্টার প্রণালি দিয়ে কিছু স্প্যানিশ যুদ্ধ জাহাজ নিয়ে, ব্রিটিশ কলোনী গুলোতে হামলা চালায়।

ফ্রান্সে অবস্থিত ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জেনারেল নেলসন তার পিছু নিয়ে তাকে আটকানোর চেষ্টা করলেও সফল হয়নি। ফরাসী বাহিনী ব্রেস্ট উপকূল পর্যন্ত পৌছাতে পারে নি, তারা স্পেনের কাদিজ বন্দরে ফিরে আসে। ওদিকে অস্ট্রিয়া এবং রাশিইয়া থার্ড কোয়ালিশনে যোগ দিলে,নেপোলিয়ন তার সেনাদের পশ্চিম দিকে সরিয়ে নিতে হয়, এরজন্য তাকে ব্রিটেন আক্রমণ এর পরিকল্পনা বাদ দিতে হয়। 
cover
ইংল্যান্ড আশা করছে আজকে তার প্রতিটি লোক তাদের উপর দেওয়া দায়িত্ব পালন করবে।
এডমিরাল হোর‍্যাইটো নেলসন
এদিকে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর সেনাপতি নিয়োগ দেয়া হয় নেলসন কে। দায়িত্ব পেয়েই নেলসন ভিলানোভ কে আটকানোর জন্য নৌবহর পাঠায়। নেপোলিয়ন তার কমান্ডারকে ইতালির দিকে যাওয়ার নির্দেশ দিলে, ভিলানোভ সেটা প্রত্যাখ্যান করে। সে কাদিজ থেকে জিব্রাল্টার প্রণালির দিকে এগোতে শুরু করে। ব্রিটিশরাও চাচ্ছিলো ফরাসীরা যতটুকু সম্ভব কাদিজ থেকে দূরে চলে যাক, যাতে রসদ পেতে না পারে।

২১ শে অক্টোবর,১৮০৫ সালে কেপ ট্রাফালগারের নিকটে ভিলানোভরা বুঝতে পারেন, ব্রিটিশরা তার পেছনে রয়েছে। ভিলানোভ তার বহর কে দক্ষিণদিকে মুখ করে, একটা সরল রেখায় দাড়াতে নির্দেশ দিলেন। ভিলানোভার বহরে ৩৩ টা জাহাজ ছিলো। যার মধ্যে ১৮ টা ফরাসী এবং ১৫ টি স্প্যানিশ।“ব্যুসেনতয়ু” ছিলো ভিলানোভ এর ফ্ল্যাগশিপ। অন্যদিকে ব্রিটিশরা তাদের ২৭ টি জাহাজের বহরকে দুটি স্কোয়াড্রনে ভাগ করে। একটি নেতৃত্বে ছিলেন কাটবার্ট কলিংউড তার ফ্ল্যাগশিপ ছিলো “রয়্যাল সভার্জিন”।

আরেকটি স্কোয়াড্রনের নেতৃত্বে ছিলো স্বয়ং নেলসন তার “ভিক্টোরি” জাহাজে। যুদ্ধশুরু হওয়ার আগে যোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে দেয়া নির্দেশ ইতিহাসে এখনো বিখ্যাত হয়ে আছে , তিনি বলেন “ইংল্যান্ড আশা করছে আজকে তার প্রতিটি লোক তাদের উপর দেওয়া দায়িত্ব পালন করবে।” 
cover
ঐ সময়ের যুদ্ধের কৌশল ছিলো, শ্ত্রুর কত দ্রুত ক্ষতি সাধন করা যায়। যত দ্রুত আক্রমণ এবং লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা যায়, বিজয় তত শিঘ্রই আসবে। সংখ্যায় ফরাসী বাহিনী এগোনো থাকলেও, পরিবেশগত দিক এবং কৌশলের দিক থেকে ব্রিটিশরা এগিয়ে ছিলো।

বিকেলের দিকে কলিংউড তার জাহাজ নিয়ে দ্রুত গতিতে শ্ত্রুর লাইনে ঢুকে পরে। তার জাহাজটা দ্রুতগামী হওয়ায় তার সাথীরা একটু পেছনে থাকলে। কলিংউড প্রচন্ড বীরত্ব দেখিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। তার বাকি জাহাজ গুলো এসে, শত্রুর বাকি জাহাত গুলোতেও আক্রমন করে। প্রবল যুদ্ধ দেখে ওখানের ছোট জাহাজগুলো আত্নসমর্পণ করে।

ওদিকে নেলসনের জাহাজ গুলো বাতাসের বিপরীত বেগের জন্য গতি খুব কমে যায়। ফরাসীরা একের পর এক ভলি তথা কামানের গোলা মারতে থাকে। নেলসন তার জাহাজ বহরকে একটা “ফেক টার্ন” নিতে বলে, এতে শত্রুপক্ষ ভাবে যে তারা সরল রেখায় এগোচ্ছে। এই কৌশলটা খুব কাজে দেয়। ভিলানোভ সেই অনুযায়ী কৌশল সাজাতে সাজাতে নেলসন তার ভিক্টোরি জাহাজ নিয়ে শত্রু লাইনে ঢুকে পড়ে। যুদ্ধে নেলসন স্নাইপারের গুলিতে মারত্নক আহত হন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের বিজয় দেখে যেতে পেরেছিলেন । ভিলানোভ বন্দি হন, তার প্রায় ২০ টা জাহাজ ধ্বংস প্রাপ্ত হয়, সে দিক থেকে ব্রিটিশদের কোনো জাহাজই ধ্বংস হয়নি। 
cover
যুদ্ধেরপ্রভাব
এই যুদ্ধের মাধ্যমেই দ্বিগ্বিজয়ী নেপোলিয়নের প্রতাপে চিড় ধরে। ব্রিটিশরা যে জলপথে অদম্য সেটা আবার প্রমাণিত হয়। আধুনিক নৌ সমর বিদ্যায় এই যুদ্ধের প্রভাব অনেক। শত্রুপক্ষ যদি সরল রেখায় থাকে তাহলে দুটো স্কোয়াড্রনে ভাগ হয়ে আক্রমণ করার কৌশল যে সফল সেটা এই যুদ্ধ থেকেই বোঝা যায়। কমান্ডার নেলসনকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান দিয়ে সমাহিত করা হয়। তার নামে লন্ডনে একটু মনুমেন্টও আছে যার নাম, “ট্রাফালগার স্কয়ার”।
cover
তথ্যসূত্র
  • https://www.britannica.com/event/Battle-of-Trafalgar-European-history
  • https://www.history.com/this-day-in-history/battle-of-trafalgar
  • https://www.britishbattles.com/napoleonic-wars/battle-of-trafalgar/
  • https://www.youtube.com/watch?v=sRtUrvmok-c

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021