Link copied.
মুসলিম দেশ তুরস্ককে যে গোপন পরিকল্পনায় জোটভূক্ত করেছে ন্যাটো
writer
১৮ অনুসরণকারী
cover
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে পথচলা শুরু হয়েছিল ন্যাটোর। সামরিক ও রাজনৈতিক জোট হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এই সংগঠন দিনে দিনে হয়ে উঠেছে শক্তিশালী এক জোট। জোটে পশ্চিমা দেশের আধিক্য থাকলেও মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে আছে তুরস্ক ও আলবেনিয়ার নামও। সশস্ত্র হামলা প্রতিহত করার সমন্বিত জোট হিসেবে কাজ করা এই সংগঠনে মুসলিম রাষ্ট্রের ভূমিকা কী? কেন তুরস্ক যুক্ত হয়েছিল এই সংগঠনে? 


ন্যাটো কী ও কেন?
১৯৪৯ সালের ৪ এপ্রিল যাত্রা শুরু করে উত্তর আটল্যান্টিক নিরাপত্তা জোট বা নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন সংক্ষেপে ন্যাটো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ইউরোপের ১০টি দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা মিলে গঠন করে ন্যাটো। উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। দাপ্তরিকভাবে অবশ্য ন্যাটো গঠনের উদ্দেশ্য ছিল "উত্তর আটল্যান্টিক অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ও কল্যাণ" নিশ্চিত করে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর 'স্বাধীনতা, অভিন্ন ঐতিহ্য এবং সভ্যতার' রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করা। সদস্যদেশগুলোর মধ্যকার চুক্তি অনুযায়ী, ন্যাটোভুক্ত যে কোনো দেশের উপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটি জোটভুক্ত সব দেশের উপর হামলা বলেই গণ্য হবে এবং সব দেশ একে অন্যের সহায়তায় এগিয়ে আসবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সাম্যবাদকে জোটটি তাদের বড় হুমকি মনে করতো সে সময়।

cover
কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকে ন্যাটোর সীমান্ত রাশিয়ার মস্কোর দিকে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার অগ্রসর হয়েছে। এছাড়া ১৯৮৯ সালে পূর্ব ইউরোপে বিপ্লব এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে জোটটি সাবেক সোভিয়েত স্যাটেলাইট জাতিকে নিজেদের সদস্য হিসেবেই গণ্য করে। এখন আর সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্ব নেই। নেই সেই স্নায়ু যুদ্ধও কিন্তু তার মানে এই নয় যে, পশ্চিমারা মস্কোকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করা বন্ধ করে দেবে। এ ধরণের পরিস্থিতির কারণে ন্যাটোর ভূমিকা পরিবর্তিত হয়ে এটি হস্তক্ষেপকারী জোটে পরিণত হয়েছে। যার উদাহরণ মেলে বসনিয়া এবং কসোভোয় সার্বিয়ার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বিমান হামলা, নৌপথে প্রতিরোধ এবং শান্তিরক্ষা বাহিনী হিসেবে ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে।২০০১ সালে ন্যাটো প্রথম ইউরোপের বাইরে তাদের অভিযান চালায়। নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারে হামলার পর আফগানিস্তানে জাতিসংঘের নির্দেশনায় যৌথ বাহিনীর কৌশলগত নেতৃত্ব নেয় এই সংগঠন। আফগানিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ, উপদেশ এবং সহযোগিতার উদ্দেশ্যে এখনো পর্যন্ত দেশটিতে ন্যাটোর নেতৃত্বে ১৭ হাজার সেনা রয়েছে।

ন্যাটোর সদস্য কারা?
১৯৪৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, পর্তুগাল, নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, লুক্সেমবার্গ, ইতালি, আইসল্যান্ড, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, কানাডা ও বেলজিয়ামের সমন্বিত উদ্যোগে গঠিত হয় ন্যাটো। ১৩তম দেশ হিসেবে ১৯৫২ সালে এই সংগঠনে নাম লেখায় মুসলিম দেশ তুরস্ক। একই বছর যোগ দেয় গ্রিসও। এরপর একে একে জার্মানি, স্পেন, চেক রিপাবলিক, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুনিয়া, রোমানিয়া, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া, আলবেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, মন্টিনেগ্রো যোগ দেয় এই সংগঠনে। ২০২০ সালে সর্বশেষ উত্তর ম্যাসিডোনিয়া ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার পর সংগঠনের সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ত্রিশে। 

cover
তুরস্ক ন্যাটোতে কেন?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের দেশসমূহ অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দূর্বল হয়ে পড়ে। একে অপরের সাথে দ্বন্দ্ব, মারামারি ও সংঘাতে জড়িয়ে দেশগুলো নিজেদের এত ক্ষতি করে যে, বলতে গেলে ইউরোপে সকল দেশই আরো যুদ্ধ করার মত শক্তি ও অবস্থায় কোনোটাই ছিল না। ব্রিটিশ পরাশক্তিও দূর্বল হয়ে পড়ে। ঠিক এই সময় ইউরোপে জয়ী ও আগ্রাসীশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন (USSR) এর থেকে ইউরোপের বাকিদেশ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকে। তারা ইউএসএসআর কে নিজেদের সার্বভৌমত্বের জন্য সব চেয়ে বড় হুমকি মনে করে। ১ম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক হেরে যাবার ফলে তুরস্কের কী হাল হয়েছিল সে কথা বিবেচনা করে তুরস্ক ২য় বিশ্বযুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকার এই সিদ্ধান্ত নেয়। ২য় বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক নিরপেক্ষ দেশ হিসেবে অবস্থান করে। তারা যুদ্ধে মিত্রবাহিনী বা নাৎসি কোন পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকে। তুরস্কের খুব কাছাকাছি এসে গিয়েছিল ইউএসএসআর। 

তুরস্ক বুঝে গিয়েছিল, ন্যাটো গঠনে অংশীদার না হলে যেকোন সময় ইউএসএসআর তার আগ্রাসন চালাতে পারে এবং তুরস্কের নিজেদের রক্ষা করতে এমন জোটে যোগ দেওয়া উচিত যেটি তুরস্ককে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ও ভৌগোলিক নিরাপত্তায় সহায়তা দিবে। সেই ভাবনা থেকেই ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় দেশটি। তুরস্কের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ স্টিভেন এ.কুক বলছেন, ১৯৫২ সালে তুরস্কের ন্যাটোতে যোগ দেওয়াটা ছিল স্নায়ুযুদ্ধের কৌশল। সে সময় প্রথমবারের মতো ন্যাটোতে নতুন করে সদস্য যুক্ত করা হয়। তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান চেয়েছিলেন, ন্যাটোতে সাম্যবাদী ভাবধারার সম্প্রসারণ করতে। সে চাওয়ার সফল প্রতিফলন ছিল গ্রিস ও তুরস্কের সংগঠনটিতে যোগ দেওয়া। কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা ছিল ন্যাটোর নীতি নির্ধারকদের। সেই চেষ্টা তারা শুরু করতে চেয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশকে নিজেদের সংগঠনের সদস্য হিসেবে টানার মধ্য দিয়ে। তুরস্ক ছিল সেই ভাবনাকে সত্য করারই অংশ। 







তুরস্ক কি বেরিয়ে যাবে ন্যাটো থেকে?
২০০০ সালে রিসেফ তাইয়েফ এরদোয়ানের নেতৃত্বে জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিরও বদল ঘটতে থাকে। আরব বসন্তের ধাক্কায় আঞ্চলিক রাজনীতি থেকে মিসর হারিয়ে যায়। ধীরে ধীরে ইরানের উত্থান ঘটতে থাকে। পাশাপাশি তুরস্কও বিভিন্ন সংকটে নিজের অবস্থান দৃঢ় করার সুযোগ পায়। বিভিন্ন দিক থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোকে তুরস্ক ঘিরে ফেলছে। এর পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বকে সৌদির প্রভাব বলয় থেকে বের করে আনার চেষ্টা করছে। গত দুই দশকে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন বাঁক বেশ লক্ষণীয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২৩ সালে রিপাবলিক গঠিত হওয়ার পর পশ্চিমাদেরই অনুসরণ করেছে তুরস্ক। এরদোয়ান ক্ষমতায় এসে পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপক পরিবর্তন করেন। তুরস্ক এখন আর পুরোপুরি পশ্চিমা বা ন্যাটোনির্ভর নীতি অবলম্বন করছে না। মার্কিন প্রভাবের বাইরে গিয়ে নিজের অবস্থান সংহত করার চেষ্টা করছে। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হয়েও রাশিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি করছে। কিছুদিন আগে ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়ের চুক্তি করেছে। 
cover
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায়, যুক্তরাষ্ট্র জানিয়ে দিয়েছে তুরস্ককে একশ’র মতো অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তি তারা স্থগিত করছে। একইসাথে, তারা তুরস্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপানোর পরিকল্পনা শুরু করেছে। তুরস্কের পাশ্চাত্য সামরিক মিত্ররা মানতে পারছে না যে ন্যাটোর সদস্য হয়েও তুরস্ক রাশিয়ার কাছে থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এমন ক্ষেপণাস্ত্র কিনছে। তুরস্কের বক্তব্য যে তারা বাধ্য হয়েছে। বেশ কয়েক বছর আগেই তুরস্ক আমেরিকার কাছ থেকে তাদের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে চেয়েছিল। ওবামা প্রশাসন বেশ কিছুদিন ঝুলিয়ে রেখে তুরস্ককে জানিয়ে দেয় প্যাট্রিয়ট তাদের দেওয়া হবে না।

cover
প্রত্যাখ্যাত হয়ে ২০১৭ সালে তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হওয়া স্বত্ত্বেও জোটের প্রধান বৈরী শক্তি রাশিয়ার দ্বারস্থ হয়। প্রস্তাব সাথে সাথেই লুফে নেয় রাশিয়া। তখন থেকেই আমেরিকা ও ন্যাটো জোটের পক্ষ থেকে তুরস্ককে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র কেনা থেকে বিরত রাখার বহু চেষ্টা হলেও প্রেসিডেন্ট এরদোগানকে টলানো যায়নি। সম্প্রতি তুরস্ক গ্যাস পাইপলাইনের চুক্তি করেছে মস্কোর সাথে। এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার নির্ভরতা কমে তুরস্কের ওপর ইউরোপের নির্ভরতা বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে ইউক্রেন দিয়ে রাশিয়া, ইউরোপে গ্যাস রপ্তানি করে। তুরস্ক রাশিয়ার জন্য বিকল্প পথ বের করে দিয়েছে। অন্যদিকে, ইউরোপের সঙ্গে তুরস্কের দর-কষাকষির সুযোগ বেড়ে যাবে নতুন এই চুক্তির কারণে। ন্যাটোর জন্য তুরস্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তুরস্ক নিষ্ক্রিয় হলে ইউরোপের পূর্ব সীমান্তে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা বলয় হুমকিতে পড়বে। বৃটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির জনথান মার্কাস মনে করছেন, তুরস্কের সাথে দিন দিন রাশিয়ার সখ্যতা বাড়বে, আর ন্যাটোর সাথে সম্পর্ক আলগা হতে থাকবে। তুরস্ক মনে করছে যদিও তাদের স্বার্থ এবং রাশিয়ার স্বার্থ এক নয়, তবু এটাই তাদের মন্দের ভালো।  





Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021