বাজাউ: সমুদ্রের গভীরে বসবাসকারী এক বিচিত্র জাতি
আন্তর্জাতিক
বাজাউ: সমুদ্রের গভীরে বসবাসকারী এক বিচিত্র জাতি
কিছু কিছু মানুষ পানির মাঝেই নিজেদের জীবনকে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। ফিলিপাইন, সুলাওয়েসি ও বোর্নিওর মধ্যবর্তী প্রবাল সাগরে এমন অসংখ্য মানুষ বাস করে, যারা সমুদ্রের সাথে নিজেদের জীবনকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ফেলেছে। এমন অসংখ্য জাতির একটি হলো 'বাজাউ' গোত্র। যারা সমুদ্রের মাঝেই নিজেদের জীবনকে খুঁজে পায়। এ জাতি নিজেদের বসবাসের ঘরটিও নির্মাণ করে থাকে গভীর সমুদের মাঝেই। বাজাউরা সমুদ্রের সাথে নিজের অস্তিত্বকে এমনভাবে মিশিয়ে ফেলেছে যে, এরা সময়ের হিসাব কষতেও ব্যবহার করে সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার ছন্দ। ঘণ্টা কিংবা মিনিটের হিসাব সম্পর্কে তারা একেবারে অজ্ঞ। 
এই গোত্রের শিশুরা একেবারে মায়ের কোল থেকেই নিজেদের গড়ে তোলে সমুদ্রের জলজ পরিবেশে। সমুদ্রের মাঝে তাদের শিশুরা এমনভাবে নিজেদের তৈরি করে যে, অনেকসময় তাদের দৃষ্টিশক্তি ভূমি কিংবা ডাঙার তুলনায় সমুদ্রের গভীর পানির তলেই বেশি তীক্ষ্ণ হয়। সাগরের পানিতে ডুব দিয়ে পানির নিচে মাছ শিকার করে আনাই এই জাতির প্রধান নেশা ও পেশা। পরিণত বয়সে বাজাউরা সমুদ্রের তলদেশে সময় কাটাতে এতটাই দক্ষ হয়ে উঠে যে, বিশ্বের বিজ্ঞানীদের মতে- মানুষের এ ধরণের সামর্থ্য অসম্ভবের কাছাকাছি!  
বাজাউরা বিশ্বাস করে, সমুদ্রের তলদেশেই তারা বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে থাকে। প্রথমে তারা অর্ধ-চেতন অবস্থায় নিজেদের নিয়ে যাওয়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নেয়। তারপর দীর্ঘ শ্বাস নিয়েই যাত্রা শুরু সমুদ্রের গভীর জগতে। তারা ডুব দিয়ে সমুদ্রের ৬০ থেকে ৭০ ফুট গভীরে অবস্থিত প্রবাল কলোনি প্রবেশ করে ফেলে। এটাই মূলত তাদের মাছ কিংবা খাদ্য শিকারের প্রধান স্থান। তারা নিজেদের এতটাই গভীরে নিয়ে যায় যেখানে মানুষের ফুসফুসের আয়তন এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসে। ওই স্থানে অক্সিজেনের অভাবে হৃদপিণ্ডের স্পন্দন প্রতি মিনিটে ৩০-এর কাছাকাছি নেমে যায়। ফলে মানুষের সমস্ত শরীর সংকুচিত হতে শুরু করে। তারা নিজেদের এতটাই চাপের মধ্যে নিতে সক্ষম, যেখানে তাদের দেহ হাঁটার জন্য কোনো ভার ছাড়াই ঋণাত্মক প্লবতা অর্জন করে।
এমন পরিস্থিতিতে, শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড, অক্সিজেনের জন্য ব্যাকুলতা তৈরি করে। এতো কিছুর মধ্যেও তারা সেই গভীরতায় অত্যন্ত দক্ষতার সাথে শিকারে গভীর মনোযোগ স্থাপন করার শক্তি অর্জন করে। নিজেদের শিকার নিয়ে বীরের বেশে ফেরত আসে। জানা যায়, বাজাউদের কেউ কেউ সমুদ্রের ১০০ ফুট গভীরতায় পর্যন্ত নিজেদের নিয়ে যেতে সক্ষম। যা বিজ্ঞানের সকল তত্ত্বকে হার মানায়। এরা ৫ থেকে ১০ মিনিট পর্যন্ত নিজেদের নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখতে পারে! পৃথিবীতে মানুষের দ্বারা অসম্ভব এমন অনেক কিছুই হয়তো রয়েছে। কিন্তু চেষ্টা করলে যে মানুষ কল্পনাকেও হার মানাতে পারে, তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে যেন পৃথিবীতে বেঁচে আছে এই বাজাউ জাতি। যাদের জীবনকাহিনী শত কোটি বছর ধরে শুনে আসা অসংখ্য রূপকথার গল্পকেও হার মানায়!    
আন্তর্জাতিকএক্সক্লুসিভ
আরো পড়ুন