Link copied.
বিশ্ব জলবায়ু সংকট ও একজন স্কুলপড়ুয়া গ্রেটা থানবার্গের সংগ্রাম!
writer
১৮ অনুসরণকারী
cover
সকালের সূর্য যখন উঁকি দিচ্ছে পূব আকাশে। এ সময়টায় শহর থেকে শহর যখন ঘুমিয়ে থাকে রোজ, তখনই স্কুল পড়ুয়াদের ঘোর ব্যস্ততার শুরু। সকালের ক্লাস ধরতে উঠে যেতে হয় কাকডাকা ভোরে, কিছু একটা মুখে দিয়ে বেরিয়ে পড়তে হয় স্কুলের উদ্দেশ্যে। গ্রেটা থানবার্গের দিনগুলোও এমনই ছিল। ক্লাসের মনোযোগী ছাত্রীটি একদিন বেঁকে বসলেন। ক্লাস বর্জন করে শুরু করলো আন্দোলন, সংগ্রাম ও তার পরিবেশ বাঁচানোর এই আন্দোলন সাড়া ফেলেছে সারাবিশ্বে৷
আগস্টের একদিনে গ্রেটা
গ্রেটা থানবার্গ জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে প্রথম জানতে পারেন ২০১১ সালে, তখন তার বয়স মাত্র আট বছর। ধীরে ধীরে বৈশ্বিক এই সমস্যাটির ভয়াবহতা সম্পর্কে জানতে গিয়ে চিন্তায় পড়ে এই সুইডিশ স্কুল ছাত্রী৷ সে সিদ্ধান্ত নেয় জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতারোধে পরিবার থেকেই সচেতনতা শুরু করবে৷ সে লক্ষ্যে গ্রেটা তার মা বাবাকে বোঝাতে শুরু করে, কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমাতে জীবনযাপনে পরিবর্তন আনতে উৎসাহিত করে তোলে তাদের।

২০১৮ সালের আগস্ট মাস, গ্রেটা থানবার্গের বয়স তখন ১৫। সেই মাসের ২০ তারিখ স্কুলের ক্লাস না করে গ্রেটা সুইডিশ পার্লামেন্ট ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে যায় প্ল্যাকার্ড হাতে, সেটিতে সুইডিশ ভাষায় লেখা ‘স্কুল স্ট্রাইকস ফর ক্লাইমেট’। এর তিন সপ্তাহ পরই ছিল সুইডেনের জাতীয় নির্বাচন। সে উপলক্ষকে সামনে রেখে স্কুলের দিনগুলোয় গ্রেটা স্টকহোমের পার্লামেন্ট ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে। তার দাবি ছিল একটাই, জলবায়ু সংকটের মহাবিপর্যয় রোধে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত যাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়। শুরুতে এই আন্দোলনে গ্রেটা একা থাকলেও তার এই উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকেই তার সাথে এসে যোগ দেয়, শামিল হয় স্কুলের বন্ধুরাও।

cover
হ্যাশট্যাগ #FridaysForFuture
আন্দোলনের দিন পনেরো পর গ্রেটা এবং তার সহযোগী বন্ধুরা সিদ্ধান্ত নেয় আন্দোলনকে আরও বেগবান করার। সিদ্ধান্ত হয় সুইডিশ নীতিতে যতক্ষণ পর্যন্ত প্যারিস চুক্তিতে তাপমাত্রা দুই ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে রাখার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অন্তর্ভুক্ত না হবে ততদিন পর্যন্ত তারা এই আন্দোলন চালিয়ে যাবে। সেপ্টেম্বরের আট তারিখ তারা সামাজিক মাধ্যমগুলোয় #FridaysForFuture নামে একটি হ্যাশট্যাগ চালু করে। উদ্দেশ্য শুধু সুইডেন নয়, পুরো বিশ্বকেই যাতে এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা যায়। খুব কম সময়ের মধ্যে এই আন্দোলন দেশে দেশে ছড়িয়েও পড়ে, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা মোকাবিলায় মানুষ শহরে শহরে জমায়েত হয়, শুরু করে আন্দোলন। জন্ম নেয় ভবিষ্যত প্রজন্মদের পৃথিবী বাঁচানোর এক আন্দোলন।

cover
মূল লক্ষ্যে অটল থাকা
ফ্রাইডে’স ফর ফিউচারের ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য নীতি নির্ধারকদের নীতিগতভাবেই চাপ দেওয়া যাতে তারা বিজ্ঞানীদের কথা শোনেন এবং তাদের পরামর্শ মেনে বৈশ্বিক উষ্ণতার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যনস্থা নিতে উদ্যোগী হোন। আন্দোলনকারীরা বলছেন, তাদের এই গন আন্দোলন দেশের কোনো সীমানায় আবদ্ধ নয়, বরং এটি সারাবিশ্বের আন্দোলন। এই আন্দোলনে রাজনীতির কোনো সম্পৃক্ততা যেমন নেই, তেমনি নেই কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার আকাঙ্খা। পৃথিবীকে ভালোবেসে পৃথিবীর জন্যই তাদের এই আন্দোলন। তাই লক্ষ্য পথে অবিচল থেকে আন্দোলন সফল করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে গ্রেটা ও তার সহযোগীরা।

cover
কীভাবে সম্পৃক্ত হওয়া যায় আন্দোলনে?
গ্রেটা’র ওয়েবসাইটটিতে আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে দুই ধরণের উপায় বলে দেওয়া হয়েছে৷ একটি উপায় সাধারণ জনগণের জন্য , অন্যটি স্কুল পড়ুয়াদের জন্য।সাধারণ জনগণ বেশ কয়েকটি ধাপের মাধ্যমে সহজেই এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে পারবেন।

১. প্রথম উপায়টি আন্দোলন শুরু করার প্রাথমিক পর্যায়। এই উপায়ে আপনার পরিবার এবং আশেপাশের মানুষকে সচেতন করে তুলতে পারেন, তুলে ধরতে পারবেন জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতার দিকটি। মানুষকে সচেতন করতে পোস্টার, ব্যানার কিংবা ফেস্টুন বানাতে পারেন। খবর দিতে পারেন স্থানীয় মিডিয়াকে, তারা যাতে আপনার এই আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করতে পারে।

২. এই পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে পারেন আপনার আন্দোলনের খবর। সেটা হতে পারে মিডিয়াকে জানিয়ে কিংবা সামাজিক মাধ্যমের হ্যাশট্যাগে।

৩. এই পর্যায়ে স্বশরীরে রাস্তায় গিয়ে আন্দোলনে করার আগে স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি নেয়ার কথা বলা হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই এই অনুমতি নিতে হয়। গ্রেটার ওয়েবসাইট বলছে, পরিবেশ বাঁচানোর এই আন্দোলনে প্রশাসন থেকে বাঁধা আসবে না বলেই তাদের বিশ্বাস।

৪. প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে জনগণকে সম্পৃক্ত করে আন্দোলন শুরুর কথা বলা হয়েছে এই পর্যায়ে। এক্ষেত্রে শুক্রবার দিনটিকে বেছে নিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

৫. যারা স্বশরীরে উপস্থিতি হতে পারবে না তাদের ক্ষেত্রে বিকল্প উপায় হিসেবে বাসায় থেকেই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে একটি প্লাকার্ড বানিয়ে সেটি নিয়ে ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে পারেন।

৬. এই আন্দোলনের কয়েক বছরের সংস্কৃতিকে অনুসরণ করতে বলা হয়েছে, যেখানে নেই কোনো উচ্ছৃঙ্খলতা, নেই কোনো ধ্বংসাত্মক ক্রিয়াকলাপ। কোনো লাভের আশায় নয়, বরং বিজ্ঞানীদের পরামর্শ মেনে পরিবেশ বাঁচানোর এক নিঃস্বার্থ আন্দোলন এটি।

৭. এই আন্দোলনে সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে নিজের নিরাপত্তা। নিজে সুস্থ থেকে, শুধুমাত্র পরিবেশ এবং জলবায়ুকে বাঁচানোী চিন্তা থেকে যে কেউ এই আন্দোলনে শামিল হতে পারবেন।

cover
স্কুল পড়ুয়াদের আন্দোলন কেমন হবে?
স্কুল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ক্ষেত্রে যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে গ্রেটা’র ওয়েবসাইটে।

১. স্কুলের ক্লাস বর্জন করা।

এটি করতে শিক্ষকদের সাথে পরামর্শ বা আলোচনা করতে আহ্বান জানানো হয়েছে। একইসাথে স্কুলে আন্দোলন সম্পর্কিত সচেতনতা মূলক পোস্টার সাঁটাতে বলা হয়েছে। 

২. স্কুল বর্জনের বিকল্প

অনেকেই হয়ত স্কুলের নানান নিয়ম কানুনের চাপে পড়ে ক্লাস বর্জনে উৎসাহিত হয় না। সেক্ষেত্রে কিছু বিকল্প পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

-শুক্রবার স্কুল শুরুর আগে সকাল বেলা স্কুলের বাইরে আন্দোলন করা। 

– শুক্রবার দিনের পুরো কিংবা একটা সময়ে চুপ থাকা। যোগাযোগের জন্য হাতে কাগজ রাখা। এটিকে বলা হচ্ছে ক্লাইমেট সাইলেন্ট স্ট্রাইক।

– শুক্রবার দিন দুপুরের খাবারের সময় আন্দোলন করা।

– গণস্বাক্ষরের ব্যবস্হা করা।

৩. শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা

শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়৷ শিক্ষকরাও যোগ দিতে পারেন পৃথিবী বাঁচানোর এই উদ্যোগে। সেক্ষেত্রে একজন শিক্ষক তার ক্লাসের শিক্ষার্থীদের জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা তুলে ধরে সচেতনতার বার্তা দিতে পারেন। বোঝাতে পারেন তার সহকর্মীদের। স্কুল প্রধানের সাথে আলোচনা করে আয়োজন করতে পারেন জলবায়ু বিষয়ক সচেতনতা মূলক সমাবেশের।



cover
গ্লাসকো কপ–২৬ জলবায়ু সম্মেলন নিয়ে যা ভাবছেন থুনবার্গ
৩১ অক্টোবর থেকে আগামী ১২ নভেম্বর পর্যন্ত স্কটল্যান্ডে কপ–২৬ জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০১৫ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর এটিই সবচেয়ে বড় জলবায়ু সম্মেলন। বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার গতি কমাতে বিশ্বজুড়ে কার্বন নিঃসরণের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ আলোচনাকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।

এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্দোলনে সাড়া জাগানো সুইডেনের অধিকারকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ বলেন, গ্লাসগোতে অনুষ্ঠেয় বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের (কপ–২৬) ব্যাপারে খুব একটা আশাবাদী হতে পারছেন না তিনি। বৈশ্বিক উষ্ণতা মোকাবিলায় এ বৈঠক শেষ সুযোগ বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ‘বড় ধরনের পরিবর্তন’ আসবে বলে মনে করেন না তিনি। বাস্তব পরিবর্তনের জন্য বিশ্ব নেতাদের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে অধিকারকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন থুনবার্গ। 
‘এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে না এ সম্মেলনে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে। অনবরত আমাদেরকে চাপ দিয়ে যেতে হবে। আমার আশা, অবশ্যই এক দিন বুঝতে পারব যে আমরা অস্তিত্ব সংকটের মুখে আছি এবং এরপর ব্যবস্থা নিব।’
গ্রেটা থানবার্গ
থুনবার্গ বলেন, ‘কপ–২৬–এর মতো আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোর মধ্য দিয়ে পরিবর্তন আনার সুযোগ রয়েছে। কারণ, এগুলোতে অনেক মানুষ একত্র হয়। সুতরাং আমাদের নিশ্চিত হবে যে সত্যিকারের পরিবর্তন আমরা যে সুযোগ আছে আমরা তা ব্যবহার করছি কি না।’

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021