Link copied.
বজ্রপাতে কীভাবে বিশ্বে প্রতি বছর ২৪ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে?
writer
১৮ অনুসরণকারী
cover
প্রতি বছর গড়ে বিশ্বে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। মৃত্যু হয় প্রায় ২৪ হাজার মানুষের৷ বজ্রপাত আবহাওয়ার একটি সাধারণ ঘটনা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাতে দেশে মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব জিওগ্রাফির অধ্যাপক ড. টমাস ডাব্লিউ স্মিডলিনের ‘রিস্কফ্যাক্টরস অ্যান্ড সোশ্যাল ভালনারেবিলিটি’ নামের এক গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, “বজ্রপাতে বছরে বাংলাদেশে দেড়’শ এর মতো লোকের মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যম প্রকাশ করলেও প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যা ৫০০ থেকে ১ হাজার৷’’

বজ্রপাত কী?
কোনো একটি স্থানের আবহাওয়ার এমন একটি অবস্থাকে বজ্রপাত হিসেবে অভিহিত করা হয় যেখানে একইসাথে তীব্র আলোর ঝলকানি এবং উচ্চ শব্দ ও তাপসহ বজ্রের সৃষ্টি হয়। এই আলোর ঝলকানিকে ইংরেজিতে বলা হয় বোল্ট অফ লাইটেনিং (Bolt of Lightening)৷ এই যে আলোর ঝলকানি বা বিদ্যুৎ চমকানো- এর আনুভূমিক দূরত্ব ৭০৯ কি. মি. পর্যন্ত বিস্তৃতির রেকর্ড রয়েছে। একটি একক বিদ্যুৎ চমকানোর সর্বোচ্চ স্থায়িত্ব হতে পারে ১৬.৭ সেকেন্ড পর্যন্ত।
বজ্রপাত কীভাবে হয়?
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা স্ট্যাট বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন ফ্লোরিডা ক্লাইমেট সেন্টার বজ্রপাত নিয়ে গবেষণা করেছে। তাদের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বজ্রপাত সৃষ্টির জন্য সাধারণত তিনটি উপাদানকে দায়ী করা হয়েছে।

  1. আর্দ্রতা, যেটি মেঘ এবং বৃষ্টির সৃষ্টি করে থাকে।
  2. অস্থির বায়ু, যেটি উষ্ণ বা গরম বায়ুকে দ্রুত বায়ুমন্ডলের উপরের স্তরে নিয়ে যায়।
  3. লিফট বা উত্তোলনে সাহায্যকারী, যেটি শীতল বা উষ্ণ ফ্রন্ট (ফ্রন্ট হচ্ছে বায়ুমন্ডলের মধ্যে এমন একটি এলাকা যেখানে দুটি ভিন্ন অবস্থায় থাকা বায়ু রূপান্তরিত হতে পারে), সমুদ্রের বায়ু কিংবা পাহাড় বা সূর্য থেকে আসা উত্তাপকে বজ্রপাত সৃষ্টির কাজে সাহায্য করে।

আর্দ্রতা, অস্থির বায়ু এবং লিফট- এই তিনটি উপাদানের সমন্বয়ে সাধারণত তিনটি ধাপে বজ্রপাতের একটি চক্র সম্পন্ন হয়।
cover
প্রথম ধাপ
আকাশে সাধারণত চার প্রকারের মেঘ দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত প্রকারটি স্তুপাকার বা কিউম্যুলাস (Cumulus) মেঘ। এই কিউম্যুলাস মেঘ খন্ড খন্ড অংশে আকাশে ভেসে বেড়ায়। কখনও বা খন্ডগুলো একত্রিত হয়েও আকাশের দীর্ঘ এলাকাজুড়ে তাদের বিস্তৃতি ঘটাতে পারে। তাপের পরিচলন প্রক্রিয়ায় এই কিউম্যুলাস মেঘের সৃষ্টি হয়। অনেকটা ফুলকপির মতো দেখতে এই মেঘ সাধারণত রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশে দেখতে পাওয়া যায়। ভূমি থেকে ১,২০০ থেকে ৬,৫০০ ফুট উচ্চতার মধ্যে বিস্তৃত এই মেঘ কখনও ২০ হাজার ফুট উচ্চতায়ও উঠতে পারে।

এই মেঘের নিচের অংশ কিছুটা কালচে হলেও সূর্যের আলো পেয়ে উপরের অংশ উজ্জ্বল সাদা দেখায়। এই সময়ে যদি অল্প পরিমাণ বৃষ্টিও হয় সেক্ষেত্রে বৃষ্টির সাথে মাঝে মাঝে বজ্রপাতের দেখা মেলে। তবে বজ্রপাত ঘটানোর মূল কারিগর বলা হয় কিউম্যুলোনিম্বাস (Cumulonimbus) নামের আরেক ধরনের মেঘকে। এদের প্রায়ই ছোট আকারের উত্তপ্ত কিউম্যুলাস মেঘ থেকে পরিচলন প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হতে দেখা যায়।
লিডার স্ট্রোক
শীতল বায়ুতে বরফের স্ফটিকের দেখা মেলে। এই বরফের স্ফটিক তৈরি হয় শীতল পানির সংকোচনের মাধ্যমে। একইভাবে উষ্ণ বায়ুতে থাকে পানির কণা। নাসা বলছে, ঝড়ের তীব্রতার ফলে এই বরফের স্ফটিক ও পানির কণার মাঝে সংঘর্ষ হয় এবং তারা ছিটকে সরে যায়। এই অবস্থায় মেঘে স্থির বৈদ্যুতিক চার্জ সৃষ্টি হয়। এই চার্জের ধনাত্মক অংশটি থাকে মেঘের শীর্ষদেশ অর্থাৎ উপরিভাগ জুড়ে। আর ঋণাত্মক অংশটি থাকে মেঘের নীচের অংশ জুড়ে।

স্থির বৈদ্যুতিক চার্জের নীচের অংশে পর্যাপ্ত ঋণাত্মক চার্জ বাতাসে ভেসে বেড়ায় এবং বিপরীত চার্জে চার্জিত বস্তুর দিকে এগিয়ে যায়। বজ্রপাতের এই শক্তির একটি নামও আছে, লিডার স্ট্রোক। এটি শক্তিশালী রূপ নিয়েই ভূমিতে আঘাত হানতে পারে, কারণ ভূমি হচ্ছে বিপরীত অর্থাৎ ধনাত্মক চার্জযুক্ত।
cover
কী ঘটে বাতাসে?
দুই বিপরীতমুখী চার্জ মিলিত বা সংঘর্ষ হওয়ার আগে এদের মধ্যে চলাচলের একটি মাধ্যম দরকার হয়। বাতাসে থাকা ঋণাত্মক চার্জ ও ভূমিতে থাকা ধনাত্মক চার্জের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গায় বিভব পার্থক্যের সৃষ্টি হয়। এই বিভব পার্থক্য যথেষ্ট শক্তি অর্জন করার পর তড়িৎ পরিবাহিতার সৃষ্টি হয়। এই সময় একটি রুট বা চ্যানেল গঠিত হয়। এটির নাম স্টিপেড লিডার। এই স্টিপেড লিডার হচ্ছে একটি স্বল্প বা অনুজ্জ্বল আলোর রেখা যা বজ্রপাতের সময় মেঘের নীচের অংশ থেকে ভূ-পৃষ্ঠের দিকে নেমে আসে। ভূ-পৃষ্ঠের কাছাকাছি গেলে এর সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য মাটির ধনাত্মক চার্জ উপরের দিকে তাপের প্রবাহ সরবরাহ করে। এটিই পথ দেখায় ঋণাত্মক চার্জের ইলেকট্রনকে মাটির ধনাত্মক চার্জের কাছে আসতে। এটি খালি চোখে দেখতে পাওয়া যায় না।

সাধারণত ভূমিতে থাকা উঁচু গাছ বা স্থাপনা থেকেই স্টিপেড লিডারের শুরু হয়। যদি একবার ঋণাত্মক আর ধনাত্মক চার্জের মিলন ঘটে, তারপর থেকে চার্জদের আদান-প্রদান হতেই থাকে। এটি আলোর ঝলকানির সৃষ্টি করে, যেটি আমরা খালি চোখেই দেখতে পাই। একইসাথে বাতাসে দুই বিপরীতমুখী চার্জ যথেষ্ট উত্তপ্ত হয়ে বজ্রপাতের ভয়াবহতা ঘটায়। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি করপোরেশন অফ এটমসফেরিক রিসার্চের (ইউসিএআর) এক তথ্য বলছে, এই চার্জ পার্শ্ববর্তী মেঘেও স্থানান্তরিত হতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি, এটি ঠিক কী কারণে এর চলতি পথ পরিবর্তন করে।
দ্বিতীয় ধাপ
এই ধাপে মেঘগুলো তাপের পরিচলন প্রক্রিয়ায় ৪০ থেকে ৬০ হাজার ফুট উচ্চতায় উঠতে থাকে। ঝড় বা বৃষ্টির সময়কালে মেঘের কাছাকাছি বায়ুর উর্ধ্বমুখী প্রবাহ এবং নিম্নমুখী প্রবাহ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। শক্তিশালী করে তোলে বজ্রপাতকেও। বায়ুপ্রবাহের এই তারতম্য বজ্রপাতের সৃষ্টিতে মূল ভূমিকা রাখে।
শেষ ধাপ
cover
এই ধাপে বায়ুর উর্ধ্বমুখী প্রবাহ কমে যাওয়ায় নিম্নমুখী প্রবাহ শক্তির গতি বাড়ে। স্থির বৈদ্যুতিক চার্জ গতি হারিয়ে ফেললে উষ্ণ আর্দ্র বায়ুর সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় ঋণাত্মক চার্জের সরবরাহও। ফলে কমে আসে বজ্রপাতের তীব্রতা। বজ্রপাতের সময় তড়িৎ বিভবের পার্থক্য দশ মিলিয়ন ভোল্ট পর্যন্ত হতে পারে, আর তড়িৎ প্রবাহের মাত্রা ৩০ হাজার অ্যাম্পিয়ার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। প্রবাহের এই মাত্রা বিভবের পার্থক্যের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। এই সময় বাতাসের তাপমাত্রাও ২০ থেকে ৩০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যায়। এই প্রচন্ড শক্তির স্থায়িত্ব সেকেন্ডের মাত্র দশ ভাগের এক ভাগ। তবে তীব্রতাভেদে স্হায়িত্বেরও আছে তারতম্য। গত বছর আর্জেন্টিনায় একটি বজ্রপাতের স্থায়িত্ব রেকর্ড করা হয় ১৬.৭ সেকেন্ড। শব্দ আর বিদ্যুৎ একইসাথে তৈরি হলেও গতির পার্থক্যের কারণে আমরা আগে আলো দেখতে পাই, পরে শুনি শব্দ। 
বজ্রপাতে মৃত্যু হয় কীভাবে?
বজ্রাঘাতে মৃত্যুর পেছনে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হিসেবে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে বৈদ্যুতিক পোলারাইজেশনকে দায়ী করে থাকেন বিজ্ঞানীরা। খোলা মাঠে যখন মানুষ অবস্থান করে তখন বিদ্যুতায়িত হয়ে থাকা বাতাস মূলত মানুষের শরীরের উপরিভাগ দিয়ে বজ্রবিদ্যুৎপ্রবাহের কারণে স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে এবং ফুসফুসের কার্যকারিতা হ্রাস পেয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। তৎক্ষণাৎ কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থা করা যায় না বলে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে আক্রান্ত ব্যক্তি মারাও যেতে পারেন। এছাড়াও অক্সিজেনের পরিমাণ হঠাৎ করে অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়েও মৃত্যু হয় অনেকের। তবে তৎক্ষণাৎ মুখে মুখ লাগিয়ে কৃত্রিমভাবে শ্বাসের ব্যবস্থা করলে রোগী বেঁচে যেতে পারেন।

বজ্রাঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বজ্রপাতের কারণে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয় না কারণ বজ্রপাতের বিদ্যুৎ বিভব বজ্রাঘাত ঘটানোর সময় কোন বাধা না পেয়ে মানুষের শরীরের চামড়া দিয়ে মাটিতে চলে যায়। তাদের শরীর মাটি, ধাতব বেড়া, ধাতব পাইপ, টেলিফোনের তার, বা বৈদ্যুতিক সিস্টেমে সংযুক্ত কোন যন্ত্রের সংস্পর্শে থাকলে বৈদ্যুতিক প্রবাহের কারণে কিছুমাত্রায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হতে পারে। এতেও মৃত্যু ঘটে অনেকের। বজ্রপাতে যারা মারা যান বা আহত হোন, তাদের শরীরে পোড়া বা ক্ষতও সৃষ্টি হয় না কারণ বজ্রপাতের প্রচন্ড তাপমাত্রা শরীরে মাত্র ১-২ মাইক্রো সেকেন্ড স্হায়ী হয়। এই স্বল্প স্থায়ীত্ব কোনো ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে না।



Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021