Link copied.
করোনাকালীন বিশ্বে সবচেয়ে ঊর্ধ্বগামী ও ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতির দেশ এবং বাংলাদেশ পরিস্থিতি
writer
অনুসরণকারী
cover
গত এক দশকে আমাদের দেশের মানুষকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় অর্থনীতির কোন শব্দ সবচেয়ে বেশী শুনেছেন? সে চোখ কান বন্ধ করে বলে দিবে, জিডিপি যেটা হচ্ছে Gross Domestic product এর সংক্ষিপ্ত রূপ, বাংলায় করলে দাঁড়ায় মোট দেশজ উৎপাদন। খালি চোখে বললে জিডিপি অর্থ দাঁড়ায় যে একটি দেশের উৎপাদিত মোট পণ্য এবং সেবার মূল্য। তবে অর্থনীতি বিষয়টা আপাতপক্ষে এতো সোজা না, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি জিডিপি আসলে মোটেও সোজা না এর ভেতরে অনেক প্যাচ আছে। একটু ছোট করে বলি, 
cover
বাজারে বিদ্যমান সকল পণ্য, এবং এরসাথে সম্পর্কিত লেনদেন জিডিপিতে আসবে, অর্থাৎ ধরেন আপনি হচ্ছেন  যদু ভাই, আপনার কোম্পানিতে মধু আপার কাজ করতেন এবং বেতন নিতেন, এই বেতনটা জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হবে। সেখান থেকে আপনার সাথে মধু আপার প্রণয় সেখান থেকে বিয়ে হয়ে গেলো, এখন আপনার কোম্পানিতে মধু আপা যেই কাজটা করবেন সেটা আবার জিডিপিতে আসবে না। এজন্য বলা হয় আমাদের মায়েরা সংসারে যেই কাজ করে, সেটা জিডিপিতে আসে না। সেটা আসা দরকার নাকি দরকার না সেটা নিয়ে অনেক বড় আলাপ আছে, আরেকদিন করবো।

এবার গল্পে ফিরি, আপনাদের কোম্পানী বাইরের থেকে সুতা এনে কাপড় বানিয়ে বিক্রি করে, অর্থনীতিতে সেই সুতাটা হচ্ছে ইন্টারমিডিয়েট গুড, জিডিপিতে এই ইন্টারমিডিয়েট গুড হিসাব হয় না, জিডিপি হিসাব করে ফাইনাল গুড অর্থাৎ সেই কাপড়টা। এখন জিডিপি হিসাব করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় লাগে, অর্থাৎ সেই কাপড়টা আপনার সেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উৎপাদিত হলে সেটা জিডিপিতে আসবে।এখন আবার ধরেন যে আপনি কাপড় উৎপাদন করে অনেক টাকার মালিক হলেন, সে জন্য আপনি ভিয়েতনামে একটা কারখানা দিলেন, সেটার উৎপাদিত পণ্যের মূল্য আপনার দেশের জিডিপিতে অবদান রাখবে না কোনো, সেটা ভিয়েতনামের জিডিপিতে চলে যাবে।  
একটি নির্দিষ্ট সময়ে, একটি নির্দিষ্ট দেশের মধ্যে উৎপাদিত সকল পণ্য এবং সেবার বাজারমূল্য।
তাহলে জিডিপির অর্থনীতির সংজ্ঞা হচ্ছে “একটি নির্দিষ্ট সময়ে, একটি নির্দিষ্ট দেশের মধ্যে উৎপাদিত সকল পণ্য এবং সেবার বাজারমূল্য।” এই বাজারমূল্য যদি বর্তমান বাজারমূল্য দিয়ে হিসাব করা হয়, সেটাকে বলে Nominal GDP। তাহলে জিডিপি হিসাব করে কিভাবে? এইটা জটিল প্রক্রিয়া যদি সোজা করে বলতে চাই, জিডিপিতে একটি ইকোনোমির সর্বমোট ব্যয় কতো সেটা দেখা হয়, সরকার যেটাকে হিসাব করে যে একটি ইকোনোমিতে , ভোগ, বিনিয়োগ, সরকারের ব্যয় এবং আমদানী রপ্তানীর পার্থক্য সব কিছু যোগ করে। এতো কথা বলছি কারণ আজকে কথা হবে জিডিপি নিয়ে, আমরা দেখবো যে বিশ্বের দেশ গুলোর জিডিপি পার ক্যাপিটার অবস্থা কি রকম। আচ্ছা! এই জিডিপি পার ক্যাপিটা আবার কি? ভয় পাইয়েন না , পুরো জিডিপি কে যদি জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে দেয়া হয়, তাহলে এই জিডিপি পার ক্যাপিটা পাওয়া যাবে অর্থাৎ মাথাপিছু জিডিপি কত সেটা পাওয়া যাবে। চলুন সেই বিষয়ে কথা শুরু করা যাক   
cover
জীবনযাত্রার মানদন্ড
ইতিহাস যদি ঘাটতে বসি তাহলে দেখা যাচ্ছে, ১৮২০ সাল থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে গড় জিডিপি পার ক্যাপিটা বেড়েছে প্রায় ১৫ গুণ। শিক্ষারতার হার, জীবন রক্ষাকারী টাকার ব্যবহার,জীবন যাত্রার মান বৃদ্ধি করেছে। দারিদ্র এবং শিশু মৃত্যুহার অনেক কমিয়ে এনেছে। স্ট্যাট বলছে ১৯৯০ সালে ১.৯ বিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যতার নিম্নসীমায় ছিলো যেটি পুরো পৃথিবীর জনসংখ্যার ৩৬%। জাতিসংঘ বলছে যেটি ২০৩০ সালের মধ্যে ৪৭৯ মিলিয়ন এ নেমে আসবে। যেটি মোট জনসংখ্যার মাত্র ৬%।

তবে এখনো এই বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ইন ইকুয়েলিটি অর্থাৎ ধনী গরীবের সম্পদের বৈষ্যম্য। জিডিপি পার ক্যাপিটায় সবচেয়ে বড়লোক দেশ হচ্ছে লুক্সেমবার্গ, যাদের জিডিপির পরিমাণ সবচেয়ে গরীব দেশ বুরুন্ডির চেয়ে ১১৫ গুণ বেশী!! চলুন ২০২১ সালের জিডিপি পার ক্যাপিটায় বিশ্বের সর্বোচ্চ ১০ টি দেশের লিস্টটা একটু দেখে আসি। 
cover
লিস্ট দেখে এটা ভাববেন না যে লুক্সেমবার্গের সবাই বড়লোক, তাদের দেশের ২৯% লোক তাদের ইনকামের ৪০% শুধুমাত্র বাসা ভাড়া এবং থাকা খাওয়ায় ব্যয় করে। আর ৩১% মানুষ তিনমাস চাকরী না করলে দারিদ্র্যসীমার মধ্যে চলে আসবে। অর্থাৎ বেশী সম্পদ মুষ্টিমেয় কিছু লোকদের কাছেই সীমাবদ্ধ।
বিকাশমান অর্থনীতি এবং উন্নয়নশীল দেশসমূহ
আগেই বলেছিলাম যে গত কয়েক দশকে দারিদ্র্যের হার নিম্মমুখী ছিলো। এই বছর এসে করোনা মহামারীর কারণে সেটা আবার উর্ধ্বমুখী হয়েছে। ১২০ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র‌্য সীমাতে চলে এসেছে যেটা বছর শেষে ১৫০ মিলিয়ন হতে পারে। অনুন্নত দেশগুলোতে দারিদ্র্যের হার ৭৫% ছেড়ে যেতে পারে। এবার দেখে আসি সবচেয়ে কম জিডিপি পার ক্যাপিটা দেশ গুলোর তালিকাটি।  
cover
সবার উপরে আছে আফ্রিকার দেশ বুরুন্ডি। সেখানে ৮০% লোক, কৃষি কাজে যুক্ত। তাদের নাগরিকদের প্রতি ৩ জনের মধ্যে একজন মানবিক সহায়তার উপর নির্ভরশীল। তাদের ইনকামের দুই তৃতীয়াংশ খাদ্যের উপর ব্যয় হয়। তবে অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে, আফ্রিকায় বিনিয়োগ হচ্ছে, সেই সম্পর্কিত "আফ্রিকা যেভাবে ভবিষ্যত পৃথিবীর অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে" শিরোনামে একটি লেখা আছে, আপনার চাইলে পড়তে পারেন।  
বাংলাদেশের কী অবস্থা
তথ্য বলছে, বাংলাদেশের পার ক্যাপিটা জিডিপি হচ্ছে ১৯৯০ মার্কিন ডলার। যেটি ভারতের চেয়ে বেশী। আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি করোনার আগে ২০১৮-১৯ সালে সেটি ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। সেটি কমে এসে গত অর্থবছরে ৫.৩ শতাংশে দাড়িয়েছে। আমাদের বর্তমান বাজেটে প্রবৃদ্ধি ৭.৩ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। মূলত ৯০ এর দশকে আমাদের অর্থনীতির চাকা ঘুরতে শুরু করে, বেসরকারি উদ্যোগগুলো সাফল্য পেতে শুরু করে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে ৫০ ভরে উদীয়মান অর্থনিতির দেশ হয়ে ওঠাটা একটি রোমাঞ্চকর গল্প।

গত ৫০ বছরে জিডিপির আকারও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৪ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা। তখন দেশে পণ্য উৎপাদন ও সেবায় এই পরিমাণ মূল্য সংযোজন হতো। সর্বশেষ গত অর্থবছরে স্থিরমূল্যে জিডিপির আকার দাঁড়ায় ১১ লাখ ৬৩ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা। এর মানে, ৫০ বছরের ব্যবধানে দেশের অর্থনীতির ক্ষমতা বেড়েছে ২৭১ গুণ। চলতি বাজারমূল্যের হিসাবে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৫তম বৃহৎ অর্থনীতি। আমাদের মাথা পিছু আয় ও বেড়েছে প্রায় ৩০১ গুণ।  
cover
করোনা প্রভাবের আগে দেশে সরকারি হিসাবে দারিদ্র্যের হার ছিলো ২১ শতাংশ, করোনার পর “সানেম” পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গিয়েছে যে দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ। তবে জরিপে উঠে আসা সার্বিক দারিদ্র্য হারের তুলনায় রংপুর, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগে দারিদ্র্যের হার বেশি। রংপুর, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগে দারিদ্র্যের হার ছিল যথাক্রমে ৫৭ দশমিক ৫, ৫৫ দশমিক ৫ এবং ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ। পরিবারগুলোর ৭০ শতাংশ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। ১৫ শতাংশ খাদ্য সংকটে ভোগে বা কোনো একবেলা না খেয়ে থাকে।

আর বিবিএসের গত সেপ্টেম্বর মাসের এক জরিপ অনুযায়ী, করোনা মহামারির প্রভাবে মানুষের মাসিক আয় ২০ দশমিক ২৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। মহামারিতে আয় কমে যাওয়ায় খাবার গ্রহণের পরিমাণ কমেছে ৫২ শতাংশের মতো পরিবারের।
জিডিপি আমাদের সব কিছুই পরিমাপ করে, কিন্তু যেই জিনিস গুলো জীবনকে মূল্যবান করে, সেগুলো পরিমাপ করে না।
মার্কিন সিনেটর রবার্ট কেনেডি

অর্থনীতির উন্নয়ন সূচক নির্ণয়ের জন্য জিডিপি ছাড়া অন্য কোনো মানদন্ড এখনো পরিচিত হয়নি। তবে জিডিপির সবচেয়ে বড় সমস্যা সেটি হচ্ছে “ইনইকুয়েলিটি” তারা হিসাব করতে পারে না। জিডিপি , বুদ্ধিমত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, এগুলোকে হিসাব করতে পারে না। অর্থনীতি এগোলেই যে আমাদের মানসিক বিকাশ বা ধ্যানধারণা সুন্দর হবে সেটি একটি ভূল ধারণা। মার্কিন সিনেটর রবার্ট কেনেডি বলেছিলেন, “জিডিপি আমাদের সব কিছুই পরিমাপ করে, কিন্তু যেই জিনিস গুলো জীবনকে মূল্যবান করে, সেগুলো পরিমাপ করে না।”  
তথ্যসূত্র
  • https://www.visualcapitalist.com/mapped-gdp-per-capita-worldwide/?fbclid=IwAR34BoLOECE0Ch0-qjIbFqR-
  • https://www.investopedia.com/terms/p/per-capita-gdp.asp
  • https://bangla.bdnews24.com/budget2021-22/article1897514.bdnews
  • https://www.prothomalo.com/business/economics/অর্থনীতি-বড়-হয়েছে-২৭১-গুণ
  • https://www.jugantor.com/todays-paper/window/388046/দেশে-দারিদ্র্যের-হার-কত

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021