সমুদ্রে সন্ধান পাওয়া ‘হাইড্রেট’ গ্যাসে কতদিন চলতে পারবে বাংলাদেশ?
অর্থনীতি
সমুদ্রে সন্ধান পাওয়া ‘হাইড্রেট’ গ্যাসে কতদিন চলতে পারবে বাংলাদেশ?
‘হাইড্রেট’ গ্যাস
‘হাইড্রেট’ গ্যাস
সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরে ১৭ থেকে ১০৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস হাইড্রেটের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই আবিষ্কার বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গ্যাস হাইড্রেট এবং এর আহরণ সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরাও অন্ধকারে ছিলেন এতদিন।নেদারল্যান্ডস ভিত্তিক গবেষক গত দুই বছরে বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকায় মাঠ পর্যায়ে গবেষণা কার্যক্রমের ভিত্তিতে এ গ্যাসের সন্ধান পেয়েছে। যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডস গ্যাস হাইড্রেট অনুসন্ধানে পরিচালিত এ গবেষণায় সহায়তা করেছে। রিভিউস অব জিওফিজিক্সের সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে গত দুই দশক ধরে গ্যাস (মিথেন) হাইড্রেটকে নিয়ে হওয়া গবেষণাগুলো মূল্যায়ন করা হয়েছে। বৈশ্বিকভাবে জ্বালানি হিসেবে গ্যাস হাইড্রেটের ব্যবহার তেমন ব্যাপকহারে শুরু হয়নি। পরিমাণ হিসেবে বঙ্গোপসাগরে ১৭ থেকে ১০৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস হাইড্রেট অনেক। প্রযুক্তিগত স্বল্পতার কারণে এই গ্যাস উত্তোলন সম্ভব কিনা বা উত্তোলন করা গেলে এতো পরিমাণ গ্যাস দিয়ে কতদিন চলতে পারবে বাংলাদেশ, এসব বিষয়াদির উত্তর জানা থাকা আবশ্যক।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) ওয়েবসাইটে বলা হয়, সমুদ্রের তলদেশে গ্যাস ও পানির সংমিশ্রণে তৈর হওয়া স্ফটিককে গ্যাস হাইড্রেট বলা হয়। এটা দেখতে বরফের মতো হলেও এতে প্রচুর পরিমাণে মিথেন থাকে। 
রিভিউস অব জিওফিজিক্সের নিবন্ধ
গ্যাস হাইড্রেট একটি বরফের মতো কঠিন পদার্থ যা পানি ও গ্যাস (মূলত মিথেন) দ্বারা গঠিত। এরা কেবল উচ্চ চাপ এবং নিম্ন তাপমাত্রায় জন্ম নিতে পারে। পানি ও গ্যাসের আধিক্য আছে এমন জায়গায় জন্ম নেয় এরা। তাপমাত্রা ও চাপে হালকা পরিবর্তন হলেই তা গ্যাস হাইড্রেটকে আবার পানি ও গ্যাসে আলাদা করে দিতে পারে। এ কারণে কৃত্রিমভাবে গ্যাস হাইড্রেট তৈরি করা বা অধ্যয়ন করাটা অনেক কষ্টসাধ্য। তবে প্রকৃতিতে এমন অবস্থা বেশ অহরহ। উদাহরণস্বরূপ, পৃথিবীর মহাদেশীয় প্রান্ত বরাবর পলি স্তরের মধ্যে এবং আর্কটিক পারমাফ্রস্টের ভেতর ও নিচে অনেক গ্যাস হাইড্রেটের মজুদ রয়েছে।
প্রাকৃতিক গ্যাস হাইড্রেট কার্বন চক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব গ্যাস হাইড্রেট পৃথিবীর মোট জৈব কার্বনের ৫ থেকে ২২ শতাংশ ধারণ করে বলে মনে করা হচ্ছে।মিথেন নিজেই একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউজ গ্যাস, যার উষ্ণায়ন ক্ষমতা কার্বন ডাই অক্সাইডের চেয়ে ৪০ গুণ বেশি। বড় বড় প্রাকৃতিক গ্যাস হাইড্রেট ক্ষেত্র থেকে নিঃসৃত হওয়া মিথেন জলবায়ু পরিবর্তনেও ভূমিকা রাখে। মিথেন হাইড্রেটে প্রচুর জ্বালানি মজুদ থাকে। হিমায়িত মিথেন হাইড্রেটের প্রতিটি ইউনিট ১৬৪ ইউনিট প্রাকৃতিক গ্যাস তৈরি করতে পারে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রকৃতিতে মিথেন হাইড্রেটের মজুদ অনেক। যার মানে সবচেয়ে বড় অপ্রচলিত শক্তির উৎসগুলোর মধ্যে একটি এটি। এবং এই মিথেন হাইড্রেট অপরিশোধিত তেল বা কয়লার চেয়ে অনেক বেশি পরিবেশ-বান্ধব। শুধুমাত্র মেক্সিকো উপসাগরে থাকা মিথেন হাইড্রেটের মজুদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েকশ বছর প্রাকৃতিক গ্যাসের জ্বালানি দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
গ্যাস হাইড্রেট কী
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, গবেষণায় বঙ্গোপসাগরে গ্যাস হাইড্রেট পাওয়া গেছে। এটি মূলত, উচ্চচাপ ও নিম্ন তাপমাত্রায় গঠিত জমাট বরফ আকৃতির এক ধরনের কঠিন পদার্থ, যা স্তূপ আকারে থাকা বালির ছিদ্রের ভেতরে ছড়ানো স্টম্ফটিক আকারে কিংবা কাদার তলানিতে ক্ষুদ্র পিন্ড, শিট বা রেখা আকারে বিদ্যমান থাকে। এই গ্যাস হাইড্রেট থেকে মিথেন গ্যাস পাওয়া সম্ভব। গবেষণায় দেখা যায়, মহীসোপানের প্রান্তসীমায় ৩০০ মিটারের বেশি গভীর সমুদ্রের তলদেশে গ্যাস হাইড্রেট পানি ও মাটির চাপে মিথেন বা স্টম্ফটিক রূপে পাওয়া যায়। সাধারণত এই গ্যাস হাইড্রেট ৫০০ মিটার গভীরতায় স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে। স্থিতিশীল গ্যাস হাইড্রেট সমৃদ্ধ এ অঞ্চল সমুদ্রের তলদেশে প্রায় ১০ থেকে ১০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে।
বেশিরভাগ প্রাকৃতিক হাইড্রেটের মিথেন জীবাণুর জৈবজনন (বায়োজেনেসিস) থেকে আসে। কারণ অণুজীবগুলো সাধারণত পলিতে থাকা জৈব কার্বন গ্রহণ করে। এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা এখনও বিকশিত হচ্ছে। বায়োজেনিক গ্যাস ইতোমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তির উৎস হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ইসরায়েলের উপকূলের কাছে পাওয়া বায়োজেনিক গ্যাস ক্ষেত্র, লেভিয়াথান সম্বন্ধে বলা হচ্ছে, এটি কয়েকশ বছর ইসরায়েলের জ্বালানি খাতে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা মেটাতে পারবে। গত বছর এখান থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলের জ্বালানি খাতই পুরোপুরি বদলে গেছে। তবে মিথেন হাইড্রেট কোনো দেশের জ্বালানি খাতকে এভাবে পরিবর্তন করে দিবে, সে সম্ভাবনা এখনও ক্ষীণ। কেননা, এই জ্বালানির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনও নিশ্চিত না বিজ্ঞানীরা। 
গ্যাস হাইড্রেট হলো জমাটবদ্ধ মিথেন গ্যাস। এই গ্যাস আমরা গাড়ি-বাড়ি সব জায়গায় ব্যবহার করি। মূলত উচ্চচাপ ও নি¤œ তাপমাত্রায় এটা বরফের আকার নেয়। সাগরতলে মাটির চাপে এটা আইস হয়ে যায়। সাধারণভাবে ৩০০ মিটারের বেশি গভীর সমুদ্র তলদেশে গ্যাস হাইড্রেট পানি ও মাটির চাপে মিথেন বা স্ফটিক আইস আকারে থাকতে দেখা যায়। এটা সমুদ্র তলদেশে প্রায় ১০ থেকে ১০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে।
খুরশীদ আলম, সমুদ্র বিশেষজ্ঞ
the daily star
the daily star
গ্যাস হাইড্রেট কতটা মূল্যবান
খুরশীদ আলম বলেন, ‘মিথেন গ্যাস অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় পরিবেশবান্ধব। তবে এর প্রযুক্তি এখনও সব জায়গায় বিস্তার লাভ করেনি বলেই আমরা রেস্ট অব স্টাডি করেছি। এটা করে আমরা যে তথ্যটা পেলাম, তা জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেব। পরবর্তী সিসমিক সার্ভে ও এই গ্যাস উত্তোলনের বিষয়ে পদক্ষেপ তারা গ্রহণ করবে।’ গ্যাস হাইড্রেট এবং এর আহরণ সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরাও অন্ধকারে ছিলেন এতদিন। তবে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো থেকে গ্যাস হাইড্রেট কীভাবে প্রকৃতিতে জমা হয় সে ব্যাপারে নতুন অন্তর্দৃষ্টি পাওয়া যাচ্ছে। বৈশ্বিকভাবেই প্রাকৃতিক গ্যাস হাইড্রেটের মজুদ এতো বেশি যে তা কার্বন চক্রে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। নবায়নযোগ্য শক্তির উৎসগুলোর জন্যও এ গ্যাস হাইড্রেট একটি জ্বালানি-সেতু হয়ে উঠতে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ ড. এম শামসুল আলম বলেন,  গ্যাস হাইড্রেট মিথেন ও পানি মিলিয়ে গঠিত একটি কঠিন পদার্থ। এমন পদার্থে সমৃদ্ধ অনেক দেশই। পানি হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন মিলিয়ে গঠিত একটি তরল পদার্থ। তা থেকে আহরিত হাইড্রোজেনকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। প্রযুক্তি সহজলভ্য হলে নিশ্চয়ই হাইড্রোজেন বিকল্প জ্বালানি হিসেবে বাজারে আসবে। পরিবেশ সংরক্ষণে কার্বনমুক্ত জ্বালানি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে এই জ্বালানি এখনও বিবেচনায় আসেনি।
জাপান ও কানাডার মতো কিছু দেশ দরকারি প্রযুক্তির তৈরির চেষ্টা করছে। তবে তারা সফল হলেও বাংলাদেশের এটি পেতে আরও ১০-১৫ বছর সময় লেগে যাবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতাত্ত্বিক ড. বদরুল ইমাম
গ্যাস হাইড্রেট উত্তোলনের প্রযুক্তি কোথায় পাবে বাংলাদেশ?
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতাত্ত্বিক ড. বদরুল ইমাম বলেন, গ্যাস হাইড্রেট থেকে গ্যাস উত্তোলনের প্রযুক্তি বিশ্বে এখনও সহজলভ্য হয়নি। এ কারণে এই বিশাল আবিষ্কার থেকে বাংলাদেশ তেমন লাভবান হতে পারবে না। তিনি আরও বলেন, 'জাপান ও কানাডার মতো কিছু দেশ দরকারি প্রযুক্তির তৈরির চেষ্টা করছে। তবে তারা সফল হলেও বাংলাদেশের এটি পেতে আরও ১০-১৫ বছর সময় লেগে যাবে।' এছাড়াও এ ধরনের মজুদ থেকে কত শতাংশ গ্যাস উত্তোলন করা যাবে, তা এখনও অজানা বলে মন্তব্য করেন তিনি।  
অন্যদিকে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, যেকোনো সামুদ্রিক এলাকায় এ ধরনের গ্যাস হাইড্রেটের উপস্থিতি খুবই স্বাভাবিক। উদাহরণস্বরূপ, বঙ্গোপসাগরে, বিশেষ করে ভারতের কৃষ্ণ-গোদাভারী অববাহিকায় বিপুল পরিমাণ গ্যাস হাইড্রেটের মজুদের সম্ভাবনা বিষয়ে ভারত ইতিমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারত বঙ্গোপসাগরে বিশেষ করে কৃষ্ণা-গোদাবরী অববাহিকায় বিশাল গ্যাস হাইড্রেট রিজার্ভের সম্ভাবনার কথাও নিশ্চিত করেছে, ভারতের অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস কর্পোরেশনের তথ্য বলছে।
গ্যাস হাইড্রেটের উত্তোলন কেমন ব্যয়বহুল
বাংলাদেশের একান্ত অর্থনৈতিক এলাকায় ০.১১ থেকে ০.৬৩ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট সম্ভাব্য প্রাকৃতিক গ্যাস হাইড্রেট জমার অনুমান পাওয়া গেছে যা ১৭-১০৩ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদের সমান। এ বিপুল পরিমাণ গ্যাস হাইড্রেট এর উপস্থিতি ও মজুদের সমূহ সম্ভাবনা আগামী শতকে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সামগ্রিক চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে সরকার আশা করছে। তবে গ্যাস-হাইড্রেট উত্তোলনের প্রযুক্তি সহজলভ্য না হওয়ায় অনেক উন্নত দেশ এখনও গ্যাস-হাইড্রেট উত্তোলন শুরু করতে পারেনি।
অর্থনীতিএক্সক্লুসিভ
আরো পড়ুন