Link copied.
দক্ষিণ কুরিয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর সিরিয়াল কিলার: ২০ জনকে নৃশংসভাবে খুন করে ইউ ইয়ং চুল
writer
অনুসরণকারী
cover
ইউ এর সংক্ষিপ্ত জীবনী
ইউ ইয়ং চুল ১৮ই এপ্রিল, ১৯৭০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থিত জিওনবুকের গোচাং-এ জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকে অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেন। আর্থিক শোচনীয় অবস্থার কারণে তাকে স্কুলে অনেক নির্যাতন সহ্য করতে হয়। যার প্রভাব দেখা যায় তার পরবর্তী জীবনে, ধনীদের জন্য তার মনে জন্ম নেয় ভীষণ রকমের ঘৃণা। ব্যক্তিগত জীবনে, ইউ ১৯৯১ সালে ভালোবেসে বিয়ে করেন তার বান্ধবীকে। তবে এই বিয়ে বেশিদিন টিকে নি। ২০০০ সালে ১৫ বছর বয়সী একটি মেয়েকে ধর্ষণের অপরাধে জেলে থাকাকালীন সময়ে সেই বছরই ২৭ অক্টোবর তার স্ত্রী তাকে তালাক দিয়ে দেন। এই কিশোরী ধর্ষণ অপরাধে তাকে প্রায় সাড়ে তিন বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়। অবশেষে ১১ সেপ্টেম্বর ২০০৩ সালে তিনি মুক্তি পান।
রেইনকোট কিলার
“রেইনকোট কিলার” ইউ ইয়ং-চুল দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে প্রায় ২০ জনকে হত্যা করে আতঙ্কের সৃষ্টি করেন, যা তাকে দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে মারাত্মক সিরিয়াল কিলারে পরিণত করেছিল। শুধু সিরিয়াল কিলার-ই নয়, তিনি ছিলেন একজন যৌন অপরাধী এবং স্ব-স্বীকৃত নরখাদক।

cover
ইউ এর অপরাধের দৃশ্য
২০০৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত, ইউ বেশ কয়েকজন ধনী প্রবীণ ব্যক্তির বাড়ি ভাংচুর করে তাদের হাতুড়ি দিয়ে হত্যা করে। ইউ তার হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো ধামাচাপা দেয়ার জন্য অপরাধের দৃশগুলিকে ডাকাতি করার মতন তুলে ধরে। কিন্তু তাতেও তার পক্ষে পুলিশের চোখে ধুলো দেওয়া সম্ভব হয় না। তদন্তকারীরা প্রথমে তার কর্মকাণ্ডে বিভ্রান্ত হলেও পরে তাদের চোখে ধরা পরে যে, হত্যাকারী কোনো টাকা বা মূল্যবান জিনিস সরায় নি। ইউ ইয়ং-চুল তার একাধিক হত্যার কথা স্বীকার করার পরে দেখা যায়, হত্যাকৃত সেসব ভিকটিমদের বেশিরভাগই ছিল যৌনকর্মী এবং ধনী বয়স্ক পুরুষ। সিউল কেন্দ্রীয় জেলা আদালত ২০ টি খুনের জন্য তাকে দোষী সাব্যস্ত করলেও তার মধ্যে একটি খুন জিওং নামের আরেক সিরিয়াল কিলার দ্বারা সংগঠিত হওয়ায় তা খারিজ হয়ে যায়। ধারণা করা হয় ইউ ২০ জনের মধ্যে ৩ জনকে পুড়িয়ে হত্যা করে এবং ১১ জনের দেহকে ভয়াবহভাবে বিকৃত করে। এমনকি কয়েকজনের কলিজাও খেয়ে ফেলে! সেপ্টেম্বর ২০০৩ থেকে জুলাই ২০০৪, এই সময়ের মধ্যে সে খুনগুলো করে।
দক্ষিণ পশ্চিম সিউলে গভীর রাতে একাধিক মহিলাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করার ব্যাপারে ইউ কে দোষী সাব্যস্ত করলেও তা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না পাওয়ায় সেগুলো ধুয়াশার মধ্যেই থেকে যায়। ইউ পশ্চিম সিউলে তার বাসভবনে যৌনকর্মীদের ডেকে তাদের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের পর নির্মমভাবে হত্যা করে। তাদের পরিচয় যাতে চিহ্নিত করা না যায় তাই হত্যার পর তাদের দেহ টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলে। ইউ এর গ্রেপ্তারের পর পুলিশ বোংওয়ান মন্দিরের পিছনের পাহাড় থেকে ১১ টি মৃতদেহ উদ্ধার করে। পরে তাদেরকে শহরের পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে সমাহিত করা হয়।
cover
সিরিয়াল কিলার হওয়ার আগেও ইউ কয়েকবার ( ১৯৯৮, ১৯৯১ এবং ১৯৯৩ সালের দিকে ) চুরির অপরাধে ধরা পড়ে এবং এর জন্য তাকে বেশ কয়েকমাস জেলে থাকতে হয়। ১৯৯৫ সালের দিকে শিশু পর্ণগ্রাফি বিক্রি করার অপরাধে তাকে আটক করা হয়। ১৯৯৮ সালে চুরি, জালিয়াতি এবং পরিচয় চুরির জন্য তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড-ও দেওয়া হয়েছিল।
ইউ এর হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস
২৪ সেপ্টেম্বর ২০০৩ সালে ইউ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লি ডিওক-সু নামে একজন ধনী ব্যক্তির বাড়িতে হামলা করে। অধ্যাপক এবং তার স্ত্রীকে প্রখরভাবে ছুরিকাঘাত করার পর পুনরায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে। ৯ অক্টোবর ইউ আবার একটি বাড়িতে ঢুকে হাতুড়ি দিয়ে একজন বৃদ্ধা এবং আরও ২ জনকে হত্যা করে। ১৬ অক্টোবর আরেকটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ইয়ু জুন-হি, একজন কোটিপতির স্ত্রীকে ছুরি দেখিয়ে হুমকি দেয় ইউ। বাড়িতে কেউ না থাকায় ইউ মহিলাকে টেনে বাথরুমে নিয়ে যায় এবং সেখানে নির্মমভাবে হত্যা করে। ঘটনার পর মহিলার ছেলে তাকে খুঁজে পেলেও বাঁচানো সম্ভব হয় নি।

১৮ নভেম্বর ইউ জোর করে আরও একটি বাড়িতে প্রবেশ করে। সেই বাড়ির গৃহকর্মী, বে জি-হে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তিনি কে। জবাবে তিনি তাকে তার ছুরি দেখিয়ে মালিকের বেডরুম কোথায় তা জানতে চান। সেখানে পৌঁছে সে বাড়ির মালিক কিম জং-সিওককে বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখে। ইয়ু সঙ্গে সঙ্গে তাকে হত্যা করে। সেই বাড়িতে একটি সেলফ খোলার চেষ্টা করতে গিয়ে আহত হওয়ায় প্রমাণ নষ্ট করার জন্য ইউ বাড়িটি পুড়িয়ে দেয়।
cover
১১ ডিসেম্বর, ২০০৩, এক নতুন মেয়ে ফ্রেন্ডের (এসকর্ট গার্ল) সাথে দেখা হয় ইউ-এর। কিন্তু পরবর্তীতে মেয়েটি ইউ-এর অপরাধের তালিকা খুঁজে পায় এবং ইউকে তার সাথে আর দেখা না করার জন্য বলে। যার কারনে ইউ ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিশোধ হিসেবে এসকর্ট মেয়েদের হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৬ মার্চ, ২০০৪ সালে ইউ শ্বাসরোধ করে একটি এসকর্ট মেয়েকে (২৩ বছর বয়সী ) হত্যা করে এবং তার দেহ বিকৃত করে সোগাং বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে একটি ট্রেইলে ফেলে দেয়। একইভাবে ২০০৪ সালের এপ্রিল বা মে মাসে একজন এসকর্ট মেয়েকে তার অ্যাপার্টমেন্টে প্রলুব্ধ করে নিয়ে যায় এবং সেখানেই মেয়েটিকে হাতুড়ি দিয়ে অজ্ঞান করে । অতঃপর বাথরুমে নিয়ে শিরঃচ্ছেদ করে মাথা থেঁতলে দেয় এবং শরীর বিকৃত করে ফেলে। দেহাবশেষগুলো ফেলে দেয় সেওডাইমুন-গুতে বংওয়ান মন্দিরের কাছে একটি নির্মাণস্থলে। ২০০৪ সালের মে থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত ইউ একইভাবে একাধারে প্রায় ৯ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এর মধ্যে অনেকেরই পরিচয় জানা যায় নি। তাদের সবারই বয়স ছিল ২৪ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
ইউ ইয়ং-চুলের গ্রেফতার
২০০৪ সালের ১৫ জুলাই সকাল ৫ টায়, সিউলের মাপো-গুতে গ্র্যান্ড-মার্টের কাছে ইউ-কে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। প্রাথমিকভাবে ইউ ১৯ জনকে হত্যার কথা স্বীকার করে। একটি ম্যাসাজ পার্লারে কয়েকদিন ফোন আসার পর সেই পার্লারের কয়েকজন কর্মচারী নিখোঁজ হয়ে যান। পার্লারের মালিক তা লক্ষ্য করেন এবং বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে সেই ম্যাসাজ পার্লারের মালিক বেশ কয়েকজন কর্মচারী এবং একজন পুলিশ অফিসারকে নিয়ে ইউ এর সাথে একটি মিউচ্যুয়াল বৈঠকে যান। ইউ পূর্বনির্ধারিত স্থানে আসার আগেই পুলিশ অফিসার সেখান থেকে সরে যান। পরবর্তীতে ইউ আসার সাথে সাথে ম্যাসাজ পার্লারের কর্মচারীরা তাকে ধরে ফেলেন এবং ইউকে আটক করার পর অন্য একজন পুলিশ অফিসার তার হাতে হ্যান্ডকাফ পড়িয়ে দেন। এরপর জেলে থাকাকালীন ইউ-এর মধ্যে মৃগী রুগের লক্ষণ প্রকাশ পায়।


cover
ইউ এর অ্যাপার্টমেন্টে ঘটে যাওয়া ঘটনার উপর ভিত্তি করে তাকে গ্রেফতারের পর ধারণা করা হয়, তার হত্যাকাণ্ডের নকশাগুলো কিছুটা সিনেমার ঘটনার মতন করে সাজানো হতো। ইউ পরবর্তীতে সিরিয়াল কিলার জিয়ং ডু-ইয়ং দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এসব নাটকীয় হত্যাকান্ড চালানোর কথা স্বীকার করেন, যে ১৯৯৯-২০০০ সাল পর্যন্ত বুসানে নয়জন ধনী ব্যক্তিকে হত্যা করেছিল।
ইউ ইয়ং চুলের নারী ও ধনীদের প্রতি বিদ্বেষ
cover
প্রসিকিউটররা বলেন যে ইউ তার শৈশবে দারিদ্র্যতার মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠার কারণে এবং ধনীদের দ্বারা লাঞ্চিত হওয়ার কারণে তাদের প্রতি একধরণের বিরূপ মানসিকতা বা ঘৃণা জন্মায়। সেই ঘৃণা থেকে মূলত বেছে বেছে ধনীদের হত্যা করার চিন্তা তার মাথায় আসে । নারী হত্যার বিষয়ে প্রসিকিউটররা বলেন যে, ইউ তার প্রেমিকার দ্বারা প্রতারিত হওয়ায় তার মধ্যে এক ধরনের বিরক্তি চলে আসে। সেই প্রতারনার প্রতিশোধ নিতে ইউ এর মধ্যে নারী হত্যার ইচ্ছা জাগে। ইও নিজেও স্বীকার করে যে, নারীদের প্রতি প্রচন্ড ঘৃণা থেকেই তাদের হত্যা করে।

ইমেজ সোর্স:  গুগল

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021