Link copied.
কী ঘটে যখন আপনি ধূমপান ছেড়ে দেন?
writer
১৭ অনুসরণকারী
cover
ধূমপান মৃত্যু ঘটায়, এ কথা সকলেই কম বেশি জানি আমরা। বিষয়টি জেনেও মানুষ নিজ হাতে নিজেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। জাতিসংঘের মাদকবিষয়ক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধূমপানের কারণে প্রতিবছর বিশ্বে ৫০ লাখ মানুষ মারা যায়। এর পরও মানুষ ধূমপান ছাড়তে রাজি নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ সর্বজনীনভাবে এটি স্বীকৃত যে, ধূমপান যক্ষ্মা, ফুসফুসের ক্যান্সারসহ নানা রোগের অন্যতম প্রধান কারণ। তাই ধূমপান থেকে নিজেকে বিরত রাখাটাই শারীরিক সুস্থতার পূর্বশর্ত। কিন্তু কীভাবে ছাড়া যায় এই নেশা? ছাড়লে শরীরে কি কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেবে?  

cover
কীভাবে ছাড়বেন ধূমপান?
মো: আমানুল্লাহ পেশায় একজন প্রকৌশলীর এক সময় প্রতিদিন ১০টি সিগারেট লাগতো ধূমপানের জন্য। বছর তিনেক হয়েছে তিনি এই অভ্যাস ত্যাগ করেছেন। কীভাবে ছাড়লেন ধূমপান সে প্রশ্নে বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছিলেন, "একদিন হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নিলাম সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দেব। এটা জাস্ট একটা ডিসিশন। অন্য কিছু না।" আপনি যদি ধূমপায়ী হয়ে থাকেন তবে আমানুল্লাহর মতো উপায় বেছে নিয়ে এই অভ্যাস ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এখনই। আরো কিছু উপায় সম্পর্কে বলা যাক। 
  • সপ্তাহে অন্তত একদিন ধূমপান করা থেকে বিরত থাকুন। এরপর পার্থক্য অনুভব করার চেষ্টা করুন। এভাবে ধীরে ধীরে সময় বাড়ান। দুইদিন , তিনদিন ধূমপান থেকে দূরে থাকুন। তাহলে অভ্যাস গড়ে উঠবে। বিভারলি হিলস ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক আলেক্স ফক্সম্যান বলেন, ‘ধূমপান বর্জন করতে কখনোই দেরি করা উচিত নয়। আপনি জীবনে এ অভ্যাসটি যত তাড়াতাড়ি ত্যাগ করবেন, আপনার শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য তত মঙ্গল হবে।’ 
  • আপনার আশপাশে যারা ধূমপান বর্জন করেছে তাদের অনুসরণ করুন। তাদের স্বাস্থ্যগত কী পরিবর্তন এসেছে সেটি জানার চেষ্টা করুন।
  • কথায় আছে, সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস আর অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ। এই প্রবাদ মেনে চলার চেষ্টা করুন। আপনার ধূমপায়ী বন্ধুদের সঙ্গ সুকৌশলে এড়িয়ে চলুন। 
cover
  • সিগারেট কিংবা তামাকজাত পণ্যের জন্য প্রতিমাসে আপনার কত টাকা খরচ হয়? হিসেব করে দেখলে ধূমপান ছাড়া আপনার জন্য সহজ হবে। সে টাকা জমিয়ে অন্য খাতে খরচ করতে পারেন। 
  • যে সময়টিতে আপনার ধূমপান করতে ইচ্ছা করবে সে সময়ে রাস্তায় হাঁটুন। তাহলে ধূমপানের চাহিদা থাকবে না। 
  • নিরুপায় হলে সর্বশেষ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে কাউন্সেলিং-এর সহায়তা নিতে পারেন।


ধূমপান ছাড়ার পরবর্তী অবস্থা
জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে ধূমপান ছাড়ার পর শরীরের অবস্থা কেমন হয় সেটি নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে ধূমপান ছাড়ার পরের বিভিন্ন সময়ের অবস্থা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, শেষ ধূমপানের মাত্র ২০ মিনিট পরেই শরীরের রক্তচাপ ও নাড়ির গতি স্বাভাবিক হয়ে যায়। ধূমপানের সময় সিগারেটের নিকোটিন শরীরের নার্ভ সিস্টেমকে সক্রিয় রাখার ফলে যতটুকু বেড়ে গিয়েছিলো তা আবার নামিয়ে নিয়ে আসে।

আপনি যদি দিনের অর্ধেকটা সময় অর্থাৎ ১২ ঘন্টা ধূমপান থেকে বিরত থাকেন তাহলে সিগারেটের জ্বলন্ত আগুন থেকে বের হওয়া যে বিষাক্ত গ্যাস শরীর গ্রহণ করেছিলো, তা ১২ ঘণ্টা পর থেকে স্বাভাবিক হয়ে আসে এবং শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়তে থাকে কারণ ধূমপান করার সময় রক্তে অক্সিজেন যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হয়ে থাকে।
cover
প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ধূমপানের কারণে স্বাদ ও গন্ধ নেওয়ার যে ক্ষমতা কমে গিয়েছিলো, তা ধূমপান বন্ধ করার মাত্র দুইদিন পরেই বাড়তে শুরু করে।

ডয়চে ভেলে বলছে, ধূমপান থেকে বিরত থাকার তিনদিন পরে থেকেই বুকের ভেতরটা হালকা মনে হবে এবং শ্বাস ক্রিয়া স্বাভাবিক সুস্থ মানুষের ন্যায় সহজ হয়ে আসতে শুরু করে। কারণ তখন আর শরীরের ভেতরে বিষাক্ত নিকোটিন থাকে না। আর সে কারণেই ধূমপান না করার লক্ষণগুলো ভালোভাবে ধরা পড়ে বা বোঝা যায়। তখন মাথাব্যথা, বমিভাব, প্রচন্ড ক্ষুধা পাওয়া, হতাশা বা আতঙ্কভাব হয়ে থাকে।

উপকার প্রতিফলিত হয় কয়েক মাস পরেও। ধূমপান বাদ দেয়ার কয়েকমাস পরেই দেখা যায় শরীরে রক্ত চলাচল অনেক ভালোভাবে হচ্ছে। আর আগের তুলনায় ফুসফুস শতকরা ৩০ ভাগ বেশি অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে এবং কাশিভাবও কমতে শুরু করে।
cover
ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ধূমপান ছেড়ে দেয়ার এক বছর পর থেকেই হৃদরোগের ঝুঁকি অর্ধেক কমে যায়। তাছাড়া দশ বছর ধূমপান না করলে একজন ধুমপায়ীর ফুসফুসের ক্যানসারে মারা যাওয়ার ঝুঁকির তুলনায় অর্ধেক কমে যায়। তারও পাঁচ বছর পর পর্যন্ত ধূমপান থেকে বিরত থাকলে তার করোনারি হৃদরোগ হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়, যে জীবনে কখনো ধূমপান করেনি তার মতো। অন্য এক গবেষণায় পাওয়া গেছে, ধূমপান ত্যাগের ১০ বছরের মধ্যে ধূমপায়ীদের ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকির পরিমাণ কমে অধূমপায়ীদের ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকির সমান হয়ে যায়। 

বিশ্বখ্যাত গবেষণা পত্রিকা নেচার-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ধূমপানের কারণে ক্ষতিগ্রস্থ না হওয়া ফুসফুসের কয়েকটি কোষই পরবর্তীতে পুরো ফুসফুসটিকে আবারো স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসতে ভূমিকা রাখে।
cover
নেচারের গবেষণাটির বরাত দিয়ে বিবিসি বলছে, টানা ৪০ বছর ধরে প্রতিদিন এক প্যাকেট সিগারেট খাওয়ার পর যারা ধূমপান ছেড়েছেন, তাদের ফুসফুসের ক্ষেত্রেও অভূতপূর্ব এই বিষয় লক্ষ্য করা গেছে। যেসব মানুষ ধূমপান ত্যাগ করে, তাদের ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কোষের গঠন 'কখনো ধূমপান না করা' মানুষের কোষের গঠনের মতো হয়ে যায়।

যুক্তরাজ্যের স্যাঙ্গার ইন্সটিটিউটের ডক্টর পিটার ক্যাম্পবেল বিবিসিকে বলেন, "কিছু কোষ থাকে যেগুলো, অনেকটা জাদুকরীভাবেই, শ্বাসনালীর প্রান্তগুলোকে পুনর্গঠন করে।" 

ধূমপান ছাড়লে সুফল আসলে দ্বিগুণ উল্লেখ করে যুক্তরাজ্যের ক্যান্সার রিসার্চ কেন্দ্রের ডক্টর রাচেল ওরিট বলছেন, "এটি খুবই অনুপ্রেরণাদায়ক একটি বিষয়। প্রথমত, ফুসফুসের কোষে ধূমপান সংম্লিষ্ট ক্ষয়ক্ষতি কমে যাবে, এবং দ্বিতীয়ত ফুসফুস নিজেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সুস্থ কোষ দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ কোষের প্রতিস্থাপন শুরু করবে।"

স্বাস্থ্য সচেতনতায় থাকুক খেয়াল
ধূমপানের ফলে স্বাস্থ্যের অনেকখানি ক্ষতি হয়ে যায়। ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার পর তাই পুরনো স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনায় জোর দিতে হবে। তার জন্য কিছু পরামর্শ জেনে নেওয়া যাক। 

  • ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার পর স্বাস্থ্যের যত্নের জন্য আপনাকে স্ট্রেস লেভেলের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। মানসিক চাপে শান্ত থাকার জন্য এবং ধূমপান পুনরায় শুরু না করতে সৃজনশীল উপায় খুঁজুন। সৃজনশীল যে কোনো উপায়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। 
  • প্রতিদিন ব্যায়াম চর্চা করা হচ্ছে সুস্থ জীবনের মূলভিত্তি। সাবেক ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে এটি আরও বাস্তব। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়ে থাকেন প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট ব্যায়াম করার।
  • কিছু খাবার অন্যান্যদের তুলনায় সাবেক ধূমপায়ীদের জন্য বেশি প্রয়োজনীয় বলে মত দিয়েছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা। অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট সমৃদ্ধ খাবার সেলুলার লেভেলে প্রদাহ ও ড্যামেজ হ্রাস করতে পারে, যা তামাক ব্যবহারজনিত ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু মেরামতে সাহায্য করতে পারে। উচ্চ অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট সমৃদ্ধ ফলের মধ্যে ব্লুবেরি, লাল আঙুর, পার্পল আঙুর, রেড বেরি, গাঢ় সবুজ পাতাযুক্ত শাকসবজি, মিষ্টি আলু, বাদাম, চা ও হোল গ্রেন অন্তর্ভুক্ত। 

cover
  • যেহেতু একজন সাবেক ধূমপায়ী হিসেবে আপনার ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের জন্য স্ট্রেস কমানো গুরুত্বপূর্ণ, তাই আপনার স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনতে স্ট্রেস হ্রাস করতে পারে এমন অভ্যাসে অভ্যস্ত হওয়টাও জরুরি। স্ট্রেস বা মানসিক চাপ কমানোর একটি চমৎকার উপায় বাতলে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন মেডিটেশন চর্চা করতে। 
  • ধূমপানের সঙ্গে ঘুম ব্যাহত হওয়ার সম্পর্ক থাকার প্রমাণ মিলেছে বহু বছর আগেই। গবেষকরা বলছেন , ধূমপায়ীদের নিম্নমাত্রার ঘুমের জন্য নিকোটিন দায়ী। যারা ধূমপান ছেড়ে দিয়েছেন, এখন পর্যাপ্ত ঘুম যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার সময় বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যেতে হবে, বিছানায় থাকাকালীন ইলেক্ট্রনিকস ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং প্রতিরাতে সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।  

ধূমপায়ীদের সচেতন হওয়ার এখনই সময়। 






Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021