Link copied.
সোশাল মিডিয়া যেভাবে বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করছে
writer
অনুসরণকারী
cover
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার ইতিহাসের যে কোনো সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। সর্বাধিক ব্যবহৃত ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসএপ, উই চ্যাট, স্ন্যাপ চ্যাট মোটামুটি পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই প্রচলিত রয়েছে। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে সাথে এই মাধ্যমগুলো ধনী, গরিব প্রায় সর্বস্তরের মানুষের নিকট সহজে পৌঁছাতে পেরেছে। আর এই সহজলভ্যতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে কেউ বাণিজ্য পরিচালনা করছেন, কেউ উদ্যোক্তা হয়েছেন আবার কেউবা মিলিয়ন ডলার আয় করছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন আশীর্বাদ হিসেবে এসেছে তেমনি এর খারাপ দিকগুলোও সমাজে দারুণভাবে প্রভাব ফেলেছে। কিশোর এবং যুবক শ্রেণির দৈনন্দিন কাজের একটা বড়সড় সময় নষ্ট হচ্ছে এই প্ল্যাটফর্মে। আবার তথ্য পাচারের হিড়িক পড়েছে এসবের কল্যাণে যা দেশ, রাষ্ট্র, সমাজ এবং বিশ্বের জন্য অমঙ্গলজনক। ইতোমধ্যে এসব দমনের জন্য নানারকম ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন এই প্ল্যাটফর্মের উদ্যোক্তারা। কিন্তু ঠিক কতটুক লাগাম ধরতে পেরেছেন সেটি এখনো প্রশ্নবিদ্ধ থেকেই যায়।
cover
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের মতে, গত এক যুগ ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা আদায় করেছেন বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদেরা। এমনকি কোনো কোনো দেশের নির্বাচনের মোড় ঘুরিয়ে দিতেও সাহায্য করেছে এই প্ল্যাটফর্মগুলো। এখানে বিনামূল্যে নিজের ইমেজ তৈরি করে নিচ্ছেন প্রার্থীরা। আবার প্রতিপক্ষের ইমেজ নষ্ট করা যাচ্ছে খুব সহজেই। ফলশ্রুতিতে বর্তমান সময়ে অনুষ্ঠিত প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে ফেসবুক এবং টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বড়সড় ভূমিকা রাখছে। সর্বশেষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও দেখা গেছে এমন চিত্র। বাধ্য হয়ে ফেসবুক এবং টুইটার কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দিয়েছিল দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একাউন্টগুলো। তার পরাজয়ের কারণ হিসেবে এটিকেও দাঁড় করান অনেক মার্কিন রাজনীতিবিদ। যাই হোক, আজ আমরা বিশ্ব রাজনীতিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ঠিক কিভাবে প্রভাব ফেলে সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
ভোটারদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ

অতীতের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় নির্বাচনী প্রচারণায় বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়াতেন প্রার্থীরা। গত শতাব্দীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বোঝা যাবে মূলত কতোটা পরিবর্তন হয়েছে এই প্রচারণা প্রক্রিয়ায়। জন এফ কেনেডি ডেমোক্রেট দলের পক্ষ থেকে মনোনয়ন পাওয়ার পর দীর্ঘ ১ বছর যাবত যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। মানুষের দ্বারস্থ হয়েছেন সমর্থন আদায়ে। এই ঘটনার ৫০ বছরের মাথায় গত বছর অনুষ্ঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জো বাইডেন শুধুমাত্র অঙ্গরাজ্যগুলোতেই ভাষণ দিতে গিয়েছিলেন। ফেসবুক এবং ইউটিউবের মাধ্যমে সরাসরি তাদের ভাষণ পৌঁছে দেয়া হয়েছিল প্রতিটি নাগরিকের মুঠোফোনে। ঠিক এভাবেই ভোটারদের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন রাজনীতিবিদেরা। 
বিনামূল্যে বিজ্ঞাপন প্রদান

অর্ধ-যুগ আগেও বিভিন্ন নির্বাচনে সংবাদ প্রকাশের জন্য টেলিভিশন চ্যানেল সমূহকে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রদান করতেন রাজনৈতিক দলের নেতারা। এখনো যে এই প্রচলন নেই তা কিন্তু না। এখনো এমন প্রচলন রয়েছে। শুধুমাত্র কমেছে পরিধি। কারণ স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা মানুষকে টেলিভিশন থেকে মোটামুটি দূরে সরিয়ে দিয়েছে। কর্মক্ষেত্রে টেলিভিশনে খবরাখবর উপভোগ করা বেশিরভাগ মানুষের জন্য অসম্ভব বলা চলে। এমতাবস্থায় ফেসবুক এবং ইউটিউব বিকল্প ভূমিকা হিসেবে ফাঁকা জায়গাটি দখল করে নিয়েছে। কারণ ফেসবুকে বা ইউটিউবে কোনো ভিডিও, অডিও প্রকাশ করতে অর্থ ব্যয় করতে হয় না। বরঞ্চ কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি কিছু অর্থ ফেরত দিয়ে থাকে। ঠিক এভাবেই টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রদান না করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিনামূল্যে নিজেদের প্রচারকার্য পরিচালনা করতে পারেন রাজনৈতিক নেতা, প্রতিনিধিরা।
যেভাবে প্রচার ভাইরাল হয়

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে 'ভাইরাল' শব্দটি এখন খুবই পরিচিত। ছেলে, যুবক, বুড়ো প্রায় সবাই রসিকতা করে হলেও শব্দটির ব্যবহার জানেন। মূলত ফেসবুকের 'শেয়ার' এবং টুইটারের 'রিটুইট' অপশনের মাধ্যমে যে কোনো পোস্ট কিংবা ভিডিও কোটি কোটি মানুষের নিকট পৌঁছানো যায়। সাধারণ মানুষের পছন্দ হতে পারে এমন সংবাদ বেশি বেশি শেয়ার কিংবা রিটুইট হলে এটিকেই ভাইরাল বলা যায়। আর ঠিক এমন সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজেদের কার্যক্রম, ভালো দিকগুলো ভাইরাল করছেন বর্তমান সময়ের রাজনীতিবিদেরা। বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে নির্বাচনের সময় রাজনীতিবিদদের ফেসবুক, টুইটারের পোস্ট বেশি লক্ষ্য করা যায়।
cover
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ভারতে। দেশটির সর্বশেষ নির্বাচনের পূর্বে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টুইটারে সরব ছিলেন। এছাড়াও দেশটির অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির হয়ে প্রচারণায় ফেসবুকে নিয়মিত লাইভ করছেন তিনি। একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাদের ক্ষেত্রেও। নির্বাচনকে সামনে রেখে গত ৬ মাস যাবত ফেসবুকে নিয়মিত ভিডিও প্রকাশ করছেন তারা। যুব কংগ্রেসের তরুণ এক নেতার 'খেলা হবে' শিরোনামের একটি ভিডিও কয়েক লক্ষবার শেয়ার হয়েছে ফেসবুকে। যদিও লোকমুখে আলোচনা রয়েছে বাংলাদেশের একজন রাজনীতিবিদের ভাষণ নকল করে নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন এই তরুণ ভারতীয় নেতা।
অনুদান সংগ্রহ

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অনুদান সংগ্রহের অন্যতম বড় প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। ২ দশক আগেও অনুদান সংগ্রহের জন্য রাস্তাঘাটে ক্যাম্পেইন করতেন রাজনৈতিক দলের কর্মীরা। বর্তমানে ক্যাম্পেইন পদ্ধতি টিকে আছে ঠিকি শুধুমাত্র পাল্টেছে ধরণ এবং স্থান। শুধুমাত্র ফেসবুকের মাধ্যমে এশিয়া এবং ইউরোপে কয়েকশত মিলিয়ন ডলার অনুদান সংগ্রহ করতে দেখা যায়। যদিও এই কার্যক্রম সবচেয়ে বেশি পরিচালিত হয় আফ্রিকা এবং আমেরিকা মহাদেশে। কারণ ঐ অঞ্চলের রাজনীতিতে ব্যবসায়ীক শ্রেণির ব্যক্তিরা কম বিনিয়োগ করেন। যার ফলে দলের সমর্থকদের কাছ থেকেই অর্থ সংগ্রহ করতে বাধ্য হয় সমর্থিত দলটি। ফেসবুক, টুইটারে হ্যাশট্যাগের মাধ্যমে অনুদানের বিষয়টি ট্রেন্ডিংয়ে রেখে অনুদান সংগ্রহের প্রবণতা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে।
বিতর্ক সৃষ্টি

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম রাজনীতিবিদদের জন্য শুধুই যে মঙ্গলজনক তা কিন্তু নয়! কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রার্থীদের নিকটে পৌঁছাতে গিয়ে নিজেদেরাই বিপাকে পড়েন তারা। কারণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে গিয়ে নিজেদের অনেক ব্যক্তিগত বিষয় ফেসবুকে পোস্ট করে জানাতে হয়। কিংবা নিজের পুরোনো দিনের টুইটগুলো সামনে এসে যায় বলে অনেকে সেগুলো রিটুইট করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। আবার প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা সবসময় এমন সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন যাতে করে যে কোনো দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ইমেজ নষ্ট করতে পারে।
cover
এমন একটি উদাহরণ হতে পারেন মার্কিন রাজনীতিবিদ অ্যান্টনি ওয়াইনার। আমেরিকান এই রাজনীতিবিদ ১৯৯৯ সাল থেকে ২০১১ সাল অবধি মার্কিন কংগ্রেসে নিউ ইয়র্কের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। সফলতার সাথে দীর্ঘ ৭ বার ৬০ শতাংশ ভোটে জয়ী হলেও শেষবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণেই নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে পরাজিত হন তিনি। এক নারীর সঙ্গে টুইটারে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের অভিযোগ আসে তার বিরুদ্ধে। প্রথম দফায় ঝামেলামুক্ত থাকলেও পরেরবার ঠিক তার একজন গুপ্ত প্রেমিকা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন। এই ঘটনার পর জেলেও যেতে হয়েছিল ওয়াইনারকে। ২০১৬ সালে নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানেন এই ডেমোক্রেট নেতা।
ভোটারদের প্রতিক্রিয়া

ফেসবুক এবং টুইটারের মাধ্যমে ভোটের পূর্বেই ভোটারদের প্রতিক্রিয়া জানা যায়। এর পূর্বে কখনোই এমনটা জানা যেত না। কারণ প্রার্থীরা যখন ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে প্রচারণায় নামেন তখন মোটামুটি সবাইকে আশ্বস্ত করতে পছন্দ করেন ভোটাররা। কারণ তারা কাকে ভোট দিবেন সেটা নিজের মধ্যেই রাখতে পছন্দ করেন। উপমহাদেশে এমনটা না ঘটলেও ইউরোপ, আমেরিকায় এমনটাই প্রচলিত রয়েছে। বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পূর্বে প্রতিটি অঙ্গরাজ্যেই প্রতীকী ভোট অনুষ্ঠিত হয়। কখনো কখনো ফেসবুকে, কখনো টুইটারে 'পোল' খুলে এসব ভোটাভুটির আয়োজন করা হয়। প্রার্থীরা এসবের মাধ্যমে ভোটারদের নিকট নিজেদের অবস্থান বোঝাতে পারেন। এছাড়াও ভোটাররা কেন তাকে পছন্দ কিংবা অপছন্দ করে সেটাও জানতে পারেন। বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে প্রার্থীরা নিজেদের প্রচারণার ধরণ বদলাতে পারেন।
ভোটারদের ক্ষমতা

প্রচলিত আইন অনুযায়ী একজন মানুষ যে দেশের নাগরিকত্ব বহন করেন তিনি সে দেশের ভোটার। পড়াশোনা, কর্মক্ষেত্র কিংবা ভ্রমণের সুবাদে নাগরিকগণ চাইলে অন্য দেশেও নিয়ম মেনে বসবাস করতে পারেন কিন্তু তিনি সেখানে ভোট দিতে পারেন না। দেশের সরকার, রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা যে কারো পক্ষে কিংবা বিপক্ষে কথা বলার স্বাধীন মাধ্যম এখন অবধি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোই। ভালো কাজের প্রশংসা করে ফেসবুক কিংবা টুইটারে লিখা যায়। আবার দেশের সরকারের যে কোনো কাজের বিরোধীতা করেও এই মাধ্যমগুলোতে লিখা যায়।
cover
রাজপথের আন্দোলন সর্বদাই অধিকার আদায়ে সর্বোত্তম। কিন্তু কখনো কখনো ফেসবুক, টুইটারের মাধ্যমে বিভিন্ন ইভেন্ট খুলে একতাবদ্ধ আন্দোলন সফলতার মুখ দেখে। এমন অনেক আন্দোলনের ইতিহাস রয়েছে পশ্চিমা বিশ্বে। আমাদের দেশেও বিভিন্ন সময় আন্দোলনে ফেসবুক ইভেন্টের মাধ্যমে লোকবল বাড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। ২০১৮ সালের 'নিরাপদ সড়ক' আন্দোলনে ছাত্ররা ঢাকা শহরের বিভিন্ন রাস্তায় অবরোধ গড়ে তুলেছিল। পরোক্ষভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে ঐ আন্দোলনের শুরু এবং শেষ দুটোই হয়েছিল ফেসবুকের কল্যাণে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ছাত্রসমাজ রাষ্ট্রকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল এই নিরাপদ সড়ক আইনের গুরুত্ব ঠিক কতখানি। 

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021