Link copied.
ঐতিহাসিক ‘কুবা’: যে মসজিদের নির্মাণ কাজে ছিলেন স্বয়ং রাসূল(সাঃ)
writer
১৬ অনুসরণকারী
cover
আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুওয়্যাত প্রাপ্তির পর প্রথমে গোপনে ইসলাম প্রচারের কাজ করলেও একসময় প্রকাশ্যেই ইসলামকে দিকে দিকে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে নিয়োজিত হন মুসলিম উম্মাহর শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। ভয়-ভীতি, নানান রকম অত্যাচার সহ্য করেও তাঁকে ইসলাম প্রচার থেকে বিরত রাখতে পারে নি মক্কার কুরাইশ বংশের নেতারা। এক পর্যায়ে শেষ অস্ত্র হিসেবে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনাও করেন তারা। আল্লাহর নির্দেশে তাই তিনি মদিনায় হিযরত শুরু করেন। হিযরতে বেরিয়ে সফরের ১১তম দিনে তিনি মদিনার ছোট্ট এক গ্রাম কুবায় পৌঁছান এবং সেখানেই নবুওয়্যাত প্রাপ্তির পর প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন।

ইসলামী ক্যালেন্ডারের প্রথম বছরে নির্মিত এবং সৌদি আরবের মদিনায় অবস্থিত ইসলামী ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা স্থাপনা 'কুবা মসজিদ'।  মহানবী (সা.) নিজ হাতে এই মসজিদের নির্মাণকাজে অংশ নিয়েছিলেন। রাসুল (সঃ) নবুওয়াত পাওয়ার পর এটাই প্রথম মসজিদ। গুরুত্ব ও মর্যাদা বিবেচনায় মসজিদে হারাম , মসজিদে নববী এবং মসজিদে আকসার পরই মসজিদে কুবার স্থান।
cover
মক্কা নগরী থেকে ৩২০ কিলোমিটার উত্তরে এবং মদিনার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত এই মসজিদ কুবা নামক গ্রামে অবস্থিত। মসজিদে নববী থেকে এর দূরত্ব মাত্র সাড়ে তিন কিলোমিটার। চার কিলোমিটার দীর্ঘ মদিনার অন্যতম পুরনো সড়ক সুন্নাহ রোড (কুবা স্ট্রিট) মসজিদ নববীর সাথে এই মসজিদের যোগাযোগ স্থাপন করেছে। মসজিদে নববীতে যাওয়া মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা এই পথ ধরে সহজেই কুবা মসজিদ দর্শনে আসতে পারেন।

সময়টা ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ১২ই সেপ্টেম্বর। মক্কার পার্লামেন্ট দারুন নোদওয়ায় কুরাইশদের সকল গোত্রের প্রতিনিধিদের উপস্হিতিতে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি পরিকল্পনা করা, যাতে করে মহানবী (সা.) কে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়ে ইসলামের আলো চিরদিনের জন্য নিভিয়ে দেয়া যায়। সেই লক্ষ্যে একের পর এক প্রস্তাব উপস্থাপন করা হচ্ছিলো প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে। কিন্তু কোনো প্রস্তাবই গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছিলো না। সবশেষে বনি মাখযুৃম গোত্রের প্রতিনিধি হয়ে বৈঠকে উপস্থিত আবু জেহেল ইবনে হিশাম একটি প্রস্তাব পেশ করেন।

 তিনি বলেন, "প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন যুবককে বাছাই করে তাদের হাতে একটি করে ধারালো তলোয়ার দেয়া হবে।"


এরপর সকলে মিলে একযোগে হামলা করে তাঁকে মেরে ফেলার প্রস্তাব দেন আবু জেহেল। মক্কার পার্লামেন্টে এই প্রস্তাব পাশ হয়। জঘন্য এই নীল নকশা জানার পর আল্লাহর নির্দেশে মহানবী (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিযরত করার সিদ্ধান্ত নেন। সে রাতেই হযরত আবু বকর (রা.) কে সাথে নিয়ে মদিনার উদ্দেশ্য মক্কা ত্যাগ করেন তিনি৷ মক্কা থেকে বেরিয়ে 'ছুর' নামক সুউচ্চ এক পর্বতের গুহায় তাঁরা তিনদিন অবস্থান করেন। ১৬ সেপ্টেম্বর ফের সফর শুরু করে ২৩ সেপ্টেম্বর তাঁরা কুবায় পৌঁছান।

cover
মদিনার মুসলমানরা আগে থেকেই জানতেন তাঁদের প্রিয় নবী আসছেন। এ কারণে মদিনার প্রবেশমুখের 'হারারা' নামের এক স্হানে তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন। প্রতিদিন  সকাল সকাল চলে আসতেন তারা, দুপুরে কড়া রোদ ওঠা অব্দি অপেক্ষা করে বাড়ি ফিরে যেতেন। একদিন এমন করেই দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর তারা বাড়ি ফিরে যান। এ সময় একজন ইহুদী ব্যক্তিগত কাজে উঁচু এক টিলায় উঠেছিল। হঠাৎ সে দূরে সাদা কাপড়ে তৈরি চাঁদোয়া বিশিষ্ট একটি দলকে কুবার দিকে আসতে দেখল।

সে গ্রামবাসীদের চিৎকার করে  জানালো  “হে আরববাসী! আপনারা যার জন্য অপেক্ষা করেছিলেন তিনি এসে পৌঁছেছেন! "

৬২২ খ্রিস্টাব্দের ৮ই রবিউল আওয়াল,  ২৩ সেপ্টেম্বরের সেই দিনটিতে মহানবী (সা.) ও আবু বকর (রা.) কুবায় পৌঁছান। মুসলমানরা এই খবর পেয়ে অস্ত্র হাতে নবী (সা.) কে অভিবাদন জানাতে ছুটে যায়। পাহাড়ের আনাচে কানাচে গ্রামবাসীরা ভীড় করতে থাকে এক পলক প্রিয় নবী (সা.) কে দেখবে বলে। মুসলমানদের অভিবাদনের জবাবে রাসূল (সা.) নীরব ছিলেন, তাঁর উপর কুরআনের আয়াত নাযিল হচ্ছিলো তখন। সকলের সাথে নবীজি (সা.) আমর ইবনে রওফের বাড়ি অভীমুখে রওনা হোন।

সহীহ্ বুখারীর এক বর্ণনায় বলা হয়েছে , সে সময় আনসারদের (আনসার অর্থ 'সহায়তাকারী', আল-মদিনায় যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ  করেছিলেন তাদের আনসার বলা হতো) মধ্যে অনেকেই ছিল যারা তাদের প্রিয় নবীকে আগে দেখেন নি। তাই প্রথম দেখায় তারা আবু বকর (রা.) কে মুহাম্মদ (স.) ভেবে বসেন কারণ তাঁর চুল ছিল কিছুটা ধূসর প্রকৃতির।  কিন্তু যখন আবু বকর (রা.) রাসূল (সা.)কে চাদর দিয়ে ছায়া দিতে লাগলেন, তখন তারা তাদের ভুল বুঝতে পেরেছিল।
cover
কুবা গ্রামে পৌঁছে রাসূল (সা.) কুলসুম বিন হাদাম এর বাড়িতে বেশ কয়েক দিন অবস্থান করেছিলেন এবং তাঁর জমিতে মসজিদে কুবার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। রাসূল (সা.) এর এই হিযরতের পূর্বে মুসলমানরা মাঝে মাঝে সা'দ ইবনে খাইথমাহ -এর বাড়িতে শুক্রবারে তাদের জুমার নামাজ পড়তেন যা ছিল কুবা মসজিদ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকৃত জায়গাটির কাছেই। এই বাড়ির অবস্থানটি মসজিদে কুবার আধুনিক যুগের সম্প্রসারণে অন্তর্ভুক্ত ছিল তবে কুলসুম বিন হাদাম এর বাড়ির সীমানায় থাকা কুবা মসজিদের অংশ দক্ষিণ-পশ্চিমে কয়েকটি পাথরের দ্বারা চিহ্নিত করা ছিল।



মহানবী (সা.) নিজেও হাত লাগিয়েছিলেন মসজিদের নির্মাণকাজে। আল-শিমোস বিনতে আল-নুমানকে উদ্ধৃত করে আল-তাবারানী বলেছেন, "এই মসজিদটি নির্মাণ কালে আমি নবী (সা.) কে দেখেছিলাম। তিনি তাঁর পিঠে পাথর ও শিলা বহন করতেন যতক্ষণ না এটি বেঁকে যায়। আমি তাঁর পোশাক এবং শরীরে ধুলো দেখেছি। কিন্তু যখন তাঁর কোনও সাহাবী তাঁর বোঝা নিতে আসতেন, তখন তিনি তাদেরকে অন্য বোঝা বহন করতে বলতেন।”

ইতিহাসবিদরা বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন এর ভিত্তি স্থাপন করেন, তখন কেবলার দিকের প্রথম পাথরটি নিজ হাতে স্থাপন করেন। এভাবেই রাসূল (সা.) এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মসজিদে কুবা'র নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়।

এই মসজিদটি নির্মাণ কালে আমি নবী (সা.) কে দেখেছিলাম। তিনি তাঁর পিঠে পাথর ও শিলা বহন করতেন যতক্ষণ না এটি বেঁকে যায়। আমি তাঁর পোশাক এবং শরীরে ধুলো দেখেছি। কিন্তু যখন তাঁর কোনও সাহাবী তাঁর বোঝা নিতে আসতেন, তখন তিনি তাদেরকে অন্য বোঝা বহন করতে বলতেন।
আল-তাবারানী
cover
মহানবী (সা.) এর হাত ধরে প্রতিষ্ঠার পরবর্তী সময়গুলোয় বেশ কয়েকবারই সংস্কার করা হয়েছে কুবা মসজিদ। ইসলামী শাসনন্ত্রের তৃতীয় খলিফা উসমান ইবনে আফফান (রা.) প্রথমবার এই মসজিদের সংস্কার করেন। খলিফা ওমর বিন আবদুল আজিজ মসজিদের প্রথম মিনারটি নির্মাণ করেছিলেন। এটি আবু ইয়ালি আল-হুসেনি ৪৩৫ হিজরিতে (ইংরেজি ১০৫৭ খ্রিস্টাব্দ) আবার সংস্কার করেছিলেন যিনি "মিহরাব" নামে পরিচিত ইমামের প্রার্থনা স্হান নির্মাণ করেছিলেন।

কামাল আল-দীন আল-ইসফাহানী ৫৫ হিজরিতে মসজিদে একাধিক সংযোজন করেছিলেন। এরপর ৬৭১, ৭৩৩, ৮৪০ এবং ৮৮১ হিজরিতে কয়েকবার মসজিদটির সংস্কার হয়। অটোমান সাম্রাজ্যের সময়কালে ১২৪৫ হিজরিতে সুলতান আবদুল মজিদের যুগেও মসজিদটি সংস্কার করা হয়েছিল। সর্বশেষ ১৩৬২ হিজরী, ইংরেজি ১৯৮৪ সালে সৌদি আরবের প্রয়াত রাজা ফাহাদ বিন আব্দুল আজিজ কুবা মসজিদের ঐতিহাসিক প্রসারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। দু'বছর পরে তিনি মসজিদটির সম্প্রসারণের পরে উদ্বোধন করেন। এই মসজিদে বর্তমানে একসঙ্গে বিশ হাজার মুসলিম নামাজ আদায় করতে পারেন। 


cover
আধুনিক কুবা মসজিদ ইসলামিক পরিচয় বজায় রেখে আধুনিক সব সুবিধা নিয়ে সজ্জিত এক অনন্য স্থাপত্য কীর্তির নজির হয়ে আছে। দেয়ালজুড়ে সাদা আর ছাই রংয়ের আধিক্য থাকা মসজিদটির বর্তমান আয়তন ১৩ হাজার ৫০০ স্কয়ার মিটার। মসজিদে সাতটি প্রধান প্রবেশদ্বার এবং ১২ টি ছোট প্রবেশপথ রয়েছে। মসজিদটি সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। মসজিদের  উত্তর পাশটি মহিলাদের নামাজ আদায়ের জন্য সংরক্ষিত। কুবা  মসজিদেএখন চারটি মিনার এবং ৫৬ টি গম্বুজ রয়েছে। মসজিদের সাথে  ইমাম ও মুয়াজ্জিনের থাকার জায়গা, একটি গ্রন্থাগার, ১১২ বর্গমিটার অংশজুড়ে রক্ষীদের জন্য থাকার জায়গা এবং ৪৫০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে ১২ টি দোকান রয়েছে।

মূল মসজিদ ভবনের মাঝে একটি খালি জায়গা আছে, সেখানেও নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে। কার্পেটে মোড়ানো মেঝেতে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করেন, রয়েছে জমজম পানির ব্যবস্থাও। মসজিদের চারদিকে সুবজ পাম গাছের বেষ্টনী মসজিদকে আরো সৌন্দর্যমন্ডিত করে তুলেছে। কুবা মসজিদ টি ইসলামী ইতিহাসের এক ঐতিহ্যবাহী স্হাপনা। এর সাদা পাথরের তৈরি ভবনটি বহুদূর থেকে পরিষ্কারভাবে দেখা যায়।


‘যে মসজিদ প্রথম দিন থেকে তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত সেখানে অবস্থান করা আপনার জন্য অধিক সংগত। সেখানে এমন কিছু লোক রয়েছে যারা পবিত্রতা পছন্দ করে। আর আল্লাহ পবিত্র ব্যক্তিদের ভালোবাসেন।’

মুসলমানদের পবিত্র গ্রন্থ কুরআনের সূরা তওবা'র ১০৮ নং আয়াত এটি৷ আয়াতে প্রশংসিত সেই মসজিদ কোনটি, তা নির্ণয়ে দুটি মতের কথা জানা যায়, কোন কোন মুফাসসির (যাঁরা কুরআনের ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন) আয়াতের বর্ণনাধারা থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, তা হলো মসজিদে কুবা। অন্য মতটি গিয়েছে মসজিদের নববীর পক্ষে। সহীহ হাদিস বুখারী শরীফের এক বর্ণনায় এসেছে, "নবী করীম (সা.) প্রতি শনিবার কুবা মসজিদে আসতেন,  কখনও পায়ে হেঁটে, কখন আরোহণ করে।" (২য় খন্ড,  ১১১৯)।

আরেক সহীহ হাদিস সুনান ইবনে মাজাহ্ এর এক বর্ণনায় এসেছে, 
"কুবা মসজিদে এক ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) পড়া একটি ওমরাহ করার সমতুল্য।" (১ম খন্ড, ১৪১১)। আরবী ওমরাহ শব্দের মানে হচ্ছে বিশেষ পদ্ধতিতে মক্কায় অবস্হিত পবিত্র কা'বা শরীফ জিয়ারত করা। অবশ্য এটি হজ্জের মতো ফরজ নয়, বছর যে কোনো সময় এটি পালন করা যায়। কুবা মসজিদে বছর ব্যাপী দর্শনার্থীদের ভীড় লেগে থাকে, রমজান মাসে এই ভীড় কয়েক গুণ বেড়ে যায়।  এই মসজিদে নামাজ আদায়ের ফজিলতের উপর ভিত্তি করেই এমন ভীড় হয় সবসময়।

 



Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021