Link copied.
প্যারিস চুক্তি: বৈশ্বিক উষ্ণতা কমানোয় বিশ্ব উদ্যোগ কতদূর এগিয়েছে?
writer
অনুসরণকারী
cover
বিশ্বের চেহারা খোলনালচে পালটে দিয়েছে কে বলুন তো? সেটা হচ্ছে শিল্প বিপ্লব। একের পর এক আবিষ্কার, আমাদের জীবন যাপনের চেহারাই বদলে দিয়েছে। কিন্তু প্রচলিত আছে যে, কিছু পেতে গেলে কিছু দিতে হয়। আমরা মানুষ জাতি এই জায়গায় অনেক স্বার্থপর, আমরা সম্পূর্ণ ভোগ করেছি শিল্প জাগরণের সুবিধা, কিন্তু এর চড়া মূল্য দিতে হয়েছে প্রকৃতিকে। লাগামছাড়া বন উজাড়, খণিজ সম্পদ উত্তোলনের পর যখন প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নেয়া শুরু করেছে তখন আমাদের এসে খেয়াল হয়েছে না , বড্ড বেশি করে ফেলেছি আমরা। বড় দেশগুলোর নিজেদের সমৃদ্ধ করার মূল্য এখন দিতে হচ্ছে ছোট দেশগুলোকে। সমুদ্র তীরবর্তী দেশগুলো এবং দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়ে গেছে, পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে। অর্থনৈতিকভাবে দূর্বল দেশগুলো সেই সংকট মোকাবেলায় সক্ষম না হওয়ায় অবস্থা আরো খারাপ হচ্ছে।
cover
এই সমস্যাগুলো যে মাথা ব্যথার কারণ সেটা মাথায় এসেছে বিশ্বনেতাদের ১৯৯০  সালে, পরবর্তীতে ব্রাজিলের রিও তে আর্থ সামিটে বিশ্বের দেশগুলো United Nations Framework Convention on Climate Change গঠনে সম্মত হয়। সেটারই ধারা বজায় রেখে ১৯৯৭ সালে কিয়েটো প্রটোকল সাক্ষরিত হয়। যেখানে রাষ্ট্রগুলো কার্বন নিঃসরণ কমাতে একমত হয়। কিন্তু সেই প্রটোকল ব্যর্থ ছিলো। কারণ সেই সময়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ চীন যে কিনা সবচেয়ে বেশি গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ করতো, সেই প্রটোকলে সাক্ষর করেনি। যেহেতু চীন করেনি, তাদের চিরঃশত্রু যুক্তরাষ্ট কেন করবে? তাই তারাও করেনি। যার ফলে একরকম মুখ থুবড়েই পড়ে প্রটোকলটি। তবে ইউরোপের দেশ ফ্রান্স , ব্রিটেন চালিয়ে যেতে থাকে  এবং Conference of parties অনুষ্ঠিত হতে থাকে নিয়মিত। তারই ধারাবাহিকতায় ফ্রান্সের প্যারিসে বিশ্ব নেতারা বসেন, তারা কিয়েটো প্রটোকলকে আরো বর্ধিত করে, যাকে প্যারিস এগ্রিমেন্ট বলা হয়। ২০১৫ সালের নভেম্বর ৩০ থেকে ডিসেম্বর ১১ তারইখ পর্যন্ত সম্মেলন চলে, সেখানে ১৯৫ টি দেশ চুক্তিতে সাক্ষর করে।  

তো এতো কাঠখড় পুড়িয়ে করা চুক্তিতে কী কী ছিলো, সেগুলোর কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে সেগুলো নিয়ে সবার মনেই কৌতূহল থাকে। চলুন সেগুলো একটু জেনে আসা যাক। 
চুক্তির লক্ষ্য
বৈশ্বিক চুক্তিগুলো এমনিতেই একটু জটিল হয়, এই ধরণের চুক্তিগুলোতে কূটনৈতিক শব্দ অনেক ব্যবহার হয়। প্যারিস চুক্তিটাও অনেক জটিল এবং বিশাল, আমরা আজকে সেই বিশালত্বের দিকে যাবো না, ছোট্ট করে এর লক্ষ্য আর কাজ কীভাবে করে সেগুলো জানবো, প্রথমত এর লক্ষ্যকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে।

Mitigation

চুক্তির প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রী সেলসিয়াসে নামিয়ে আনা। এক্ষেত্রে বেঞ্চ মার্ক হচ্ছে ১.৫কিন্ত ডিগ্রী সেলসিয়াস, যেটি শিল্প বিপ্লবের সময়ে ছিলো। কিন্তু সেটা কত সালের মধ্যে সেটা বলা হয় নি নির্দিষ্ট করে। তারা একমত হয়েছে যে এই শতাব্দির মাঝামাঝি সময়ে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।  
cover
Adaptation

কিন্তু এই পর্যায়ে নিয়ে আসা একটি লম্বা সময়ের ব্যাপার, সেজন্য চুক্তিতে বলা হয়েছে একটি শহর তার সর্বোচ্চ গ্রীনহাউজ উৎপাদনের যে সীমায় আছে, প্রতি পাঁচ বছরে সেই সীমার থেকে ১০% করে নিঃসরণ হ্রাস করবে। অর্থাৎ পঞ্চাশ বছরে সে তার কার্বন নিঃসরণ এবং অন্যান্য গ্রীনহাউজ নিঃসরণ ৫০% কমিয়ে ফেলবে। তাহলে এই সর্বোচ্চ সীমাটা আসলে কোনটা? এটা নির্ভর করে দেশগুলোর উপর, যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন ঠিক করেছে তারা ২০০৫ সালকে তুলনায় রেখে গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে ফেলবে।  

এই লম্বা সময়ের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রত্যেকটা দেশের আলাদা আলাদা কিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। সেজন্য সাক্ষরকৃত দেশগুলো Nationnal Determinenty Contributes (NDC) নামের একটি প্ল্যান প্রতি পাঁচ বছর পরপর হালনাগাদ করবে। এর মাধ্যমে তারা যেই কাজ সম্পন্ন করেছে সেগুলোর কারণে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করবে। 

Finance

এটা তো বড়লোকদের ব্যাপার, যারা বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে তারা কি করবে? উন্নয়নশীল দেশগুলোর কী হবে? চুক্তিতে দেশগুলো একমত হয়েছে যে, দেশগুলোকে আগে সেই দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য সক্ষমতা অর্জন করতে হবে, সেজন্য যে ধরণের বৈজ্ঞানিক অথবা প্রযুক্তিগত উপকরণ সরবরাহ করা হবে। উন্নয়শীল অনেক দেশ ও অনেক বড় আকারের গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃস্রণ করে। তাদের সেই গ্যাস কমিয়ে আনার জন্য “টেকনোলজিক্যাল ট্রান্সফার” নিশ্চিত করা হবে। যেসব দেশে খুব বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এবং যেসব উন্নয়নশীল দেশ কার্বন নিঃসরণ করছে তাদের সেটা কমানোর জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য উন্নত দেশগুলো ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর ১০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল লেনদেন এর কথা চিন্তা করেছে। যেটার আকার পরবর্তীতে আরো বড় হবে।  
cover
গ্যাস নিঃসরণে শীর্ষ দেশ ও লক্ষ্যপূরণে কতদূর
কার্বন অথবা গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃসরণে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখা দেশগুলো হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কিয়েটো প্রোটকলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন সাক্ষর করেনি, কিন্তু প্যারিস চুক্তিতে তারা সাক্ষর দেয়। যদিও মাঝখানে আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকার, প্যারিস চুক্তি থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়, কিন্তু বাইডেন প্রশাসন ক্ষমতায় এসে আবার প্যারিস চুক্তিতে যোগদান করে। আমেরিকার NDC অনুযায়ী তারা ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ৫০% থেকে ৫২% কমিয়ে আনবে ২০০৫ সালের তুলনায়। সেখানে চীন ঠিক করেছে তারা ৩৬% থেকে ৫৫% গ্যাস নিঃসরণ কমাবে। যার জন্য প্রতিবছর তারা ১৪.৭ গিগাটন কার্বন গ্যাস নিঃসরণ বন্ধ করতে হবে।  

এশিয়ার মধ্যে চীনের পর ভারত সবচেয়ে বেশী গ্রীন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ করে। অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় ভারতের অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি বিকশিত হয় নি, তাদের বিশাল জনগোষ্ঠির একটি বড় অংশ এখনো বিদ্যুৎ সেবার আওতায় আসে নি, তাদের জ্বালানীর বড় অংশ এখনো কয়লা। তাও তারা ঠিক করেছে যে ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ ৩৩%-৩৫% কমিয়ে আনবে। নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার ৪০% শতাংশ বাড়াবে।  
cover
তবে আশার কথা হচ্ছে C40 , বিশ্বের চল্লিশটি বড় বড় শহরের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক একটি জোট বলছে যে, ইতিমধ্যে ৩০টি শহর কার্বন নিঃসরণ কমিয়েছে গড়ে প্রায় ২২%, যার মধ্যে কোপেনহেগেন প্রায় ৬১% কমিয়েছে।। এর মধ্যে ২৪ টি শহর শতভাগ নবায়নযোগ্য শক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সক্ষম হয়েছে। তারা আশা করছে ২০৩০ সালের মধ্যে তারা তাদের লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবে।
আমাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ২০৫০ সালের মধ্যে ৩০ থেকে ৫০ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হবে। এদের দায়িত্ব ধনী দেশগুলোর নিতে হবে। কারণ তাদের কার্বন নিঃসরণের ক্ষতি আমাদের বহন করতে হচ্ছে
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
প্যারিস চুক্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান

প্যারিস চুক্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান হলো নিজ উদ্যোগে ৫ শতাংশ আর সহায়তা পেলে ১৫ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ কমাবে। এই ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর জন্য বাংলাদেশের প্রায় চার হাজার কোটি ডলার লাগবে। এ অর্থ কোথা থেকে কীভাবে আসবে, সেটা আরও একটি বড় প্রশ্ন। সম্মেলন শুরুর দিকে গ্রিন ফান্ড নামের একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। এখান থেকে বাংলাদেশ ৪০ মিলিয়ন ডলারের মতো পাবে। বাংলাদেশ এর লক্ষ্যই ছিলো এর এখান থেকে বেশি অর্থ নিয়ে আসা। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সভায় স্পষ্ট করে বলেছেন যে “আমাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ২০৫০ সালের মধ্যে ৩০ থেকে ৫০ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হবে। এদের দায়িত্ব ধনী দেশগুলোর নিতে হবে। কারণ তাদের কার্বন নিঃসরণের ক্ষতি আমাদের বহন করতে হচ্ছে।” 
প্যারিস চুক্তি আসলে কতটুকু কার্যকর?
বিশ্লেষকরা এই বিষয়ে অনেকটা দ্বিধা বিভক্ত হয়ে আছে। এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ১৫ দিন টানা সম্মেলন চলেছিল। অনেক দেশের অনেক রকম দাবি দাওয়া ছিলো। তবে এই চুক্তির অনেকগুলো ফাঁক ফোকড় রয়ে গিয়েছে। চুক্তির সময়সীমা নির্দিষ্ট না, তারা একমত হয়েছে ২১০০ সালের মধ্যে তাপমাত্র ১.৫ ডিগ্রীর মাঝে নিয়ে আসতে হবে। সেজন্য তারা NDC র যেই ধারণা নিয়ে এসেছে, সেটা কতটুকু কার্যকর হবে সেটা এখনো বোঝা যায় নি। যেমন, মার্কিন যুক্ত্ররাষ্ট্র বলেছে তারা নিঃসরণ কমাবে। আবার রোডিয়াম নামক এক গবেষোণা সংস্থা বলছে আমেরিকা বছরে ৩.৪ শতাংশ বৃদ্ধি করছে। এছাড়া চুক্তিতে দায় মুক্তির সুযোগ রয়েছে, ফলে যেকোন দেশ চুক্তি থেকে বের হয়ে যেতে পারবে। আরেকটি বড় বিষয় হচ্ছে চুক্তিতে সমুদ্রগামী জাহাজ এবং বাণিজ্যিক এভিয়েশন খাতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি, যারা বিশাল আকারের আয়তনের গ্যাস বায়ুমন্ডলে ছড়াচ্ছে।  
cover
তবে ভালো কিছুও হয়েছে, ১৯৫ টি দেশ একমত হয়েছে যে যারা কার্বন নিঃসরণ কমাবে এবং এজন্য এক সাথে কাজ করবে। একটি মঞ্চ তৈরি হয়েছে যেখানে গরীব দেশগুলো ক্ষতিপূরণ পাবে। এই চুক্তির ফলে zero carbon solutions নামের পরিকল্পনাগুলো আলোর মুখ দেখছে। বিশেষ করে গাড়ি শিল্পে এখন হাইব্রিড, ইকো ফ্রেন্ডলি, সোলার ইঞ্জিনের মতো প্রযুক্তিগুলোর দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে সৌর বিদ্যুৎ প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতি ঘটছে, যেগুলো বিশ্বের জন্য ভালো খবর। আজকে World Nature conservation day . প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করতে আসুন, গাছ বেশি করে লাগাই। পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করি, পৃথিবীটাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দর রাখি।  
তথ্যসূত্র
  • https://unfccc.int/process-and-meetings/the-paris-agreement/the-paris-agreement
  • https://climateactiontracker.org/countries/china/
  • https://ec.europa.eu/clima/policies/international/negotiations/paris_en
  • https://www.europarl.europa.eu/RegData/etudes/BRIE/2016/573910/EPRS_BRI(2016)573910_EN.pdf
  • https://www.smartcitiesworld.net/news/news/30-cities-say-their-greenhouse-gas-emissions-have-peaked-
  • https://www.cfr.org/backgrounder/paris-global-climate-change-agreements
  • https://www.britannica.com/topic/Paris-Agreement-2015/Negotiations-and-agreement#ref341913
  • https://unfccc.int/process-and-meetings/the-paris-agreement/the-paris-agreement/key-aspects-of-the-paris-agreement

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021