টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট এবং 'ফিনিশার' আবিষ্কারের ইতিহাস
খেলাধুলা
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট এবং 'ফিনিশার' আবিষ্কারের ইতিহাস
ক্রিকেটে যখনই 'ফিনিশার' শব্দটি নিয়ে আলোচনা হয় সর্বপ্রথম চোখের সামনে যে নামটি ভেসে উঠে সেটি মাইকেল বেভান। তারপরেই যার নামটি বর্তমান যুগের ভক্তদের জন্য কাছে সবচেয়ে প্রিয় তিনি মহেন্দ্র সিং ধোনি। কিন্তু বেভান, ধোনির ফিনিশিংয়ের জাদুতে কিংবদন্তি নেইল ফেয়ারব্রাদার আর স্টিভ ওয়াহের কথা তো কোনভাবেই অস্বীকার করা যাবে না! বলা হয়ে থাকে ক্রিকেটে যত ধরনের ব্যাটিং পজিশন আছে, তার মধ্যে ফিনিশার শব্দটিকে মানুষের সাথে পরিচয় করিয়েছেন বেভানই। একজন মিডেল অর্ডার ব্যাটার কিভাবে সূক্ষ্মভাবে ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে ফিনিশিং টাচে ম্যাচ নিজের করে নেন, তার একটি পূর্ণ ধারনা দিয়েছিলেন বেভান। 
ওয়াহ, ফেয়ারব্রাদার কিংবা বেভানের যুগে ক্রিকেটের শর্ট ফরম্যাট বলতে ছিল ওয়ানডে ক্রিকেট। তাদের যুগে ক্রিকেটে ততোটা আধুনিকায়নের ছোঁয়াও লাগেনি। ২০০৪ সালে ওয়াহ, বেভান যখন ব্যাট প্যাড তুলে রাখার সিদ্ধান্ত নেন, তখন ক্রিকেটে সবেমাত্র আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছিল। দুই প্রান্তে দুই বল দিয়ে শুরু, শেষ ১০ ওভারে ফিল্ডিং রেস্ট্রিকশন, বাউন্ডারির সাইজসহ সবকিছু মিলিয়ে বেভানদের তুলনায় ধোনিদের যুগে ব্যাটাররা বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে।
ক্রিকেটের সর্বশেষ সংষ্করণ টি-টোয়েন্টির শুরু বলতে গেলে ২০০৪ সালে। সেসময় এই সংস্করণের ইতিহাস বলতে ছিল ইংল্যান্ড টি-২০ কাপের ৪৮টি অফিশিয়াল ম্যাচ। এরপর থেকে টি-২০ এর অধ্যায় যত লম্বা হয়েছে, ফিনিশিংয়ের পজিশনটা ততই জৌলুসপূর্ণ হয়েছে। বলতে গেলে টি-টোয়েন্টির এই যুগ ফিনিশিং টার্মকে  নিয়ে যায় এক অনন্য উচ্চতায়।
একসময় ফিনিশার বলতে যেসব ব্যাটার ম্যাচ শেষ করে আসতেন তাদের বুঝানো হতো, কিন্তু এখন পরিবর্তন এসেছে এর সংজ্ঞায়। বর্তমানে ১০ম ওভারের পর কিংবা একেবারে ম্যাচের শেষের দিকে যেসব ব্যাটার মাঠে আসেন, দলের ক্রান্তিকালে যারা ত্রাতা হয়ে হাল ধরেন, পাওয়ার হিটিংয়ের শো দেখিয়ে যারা ম্যাচ জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন- তাদেরকেই মূলত ফিনিশারের তকমা দেয়া হয়। বেভান বিগ হিটার না হলেও তার বিশেষত্ব ছিল ডট বলের হারটা সহজেই কমিয়ে এনে রান বের করতে পারা। তার ক্যারিয়ার স্ট্যাট দেখলে বিষয়টি আরো সহজেই অনুধাবন করা যাবে। ৬ হাজার ৯১২ রানের ওডিআই ক্যারিয়ারে বেভান ছক্কা হাঁকিয়েছেন মাত্র ২২টি। মজার ব্যাপার হলো, আইপিএলের এক আসরে বেভানের ক্যারিয়ারেরও দ্বিগুন সংখ্যার বেশি ছক্কা হাঁকিয়েছেন আন্দ্রে রাসেল। ২০১৯ আসরে ৫২টি ওভার বাউন্ডারি আসে তার ব্যাট থেকে।
সময়ের সেরা কিংবা তর্কযোগ্যে সর্বকালের সেরা ফিনিশার খ্যাত মহেন্দ্র সিং ধোনি তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ভারত এবং আইপিএলে চেন্নাইয়ের হয়ে অসংখ্য ম্যাচ জিতিয়েছেন ফিনিশার হিসেবে। ক্রিকেটের খোঁজ খবর যারা রাখেন কিংবা ক্রিকেটকে যারা লালন করেন, ফিনিশার হিসেবে এককথায় সবার পছন্দের তালিকায় ধোনির অবস্থান হবে সবার শীর্ষে। তবে এই ধারায় যখন পাওয়ার হিটিংয়ের কথা আসে তখন ক্যারিবিয়ানরাই থাকেন এগিয়ে। ক্রিস গেইল, কাইরেন পোলার্ড, আন্দ্রে রাসেলদের সবাই একধাপে এগিয়ে রাখেন এই ক্ষেত্রে। আর মাইকেল বেভানের চরিত্র সেখানে পাওয়ার হিটিং নয় বরং গুটিগুটি পায়ে রান তাড়ায় সফলভাবে ম্যাচ বের করে আনার গুরু দায়িত্বে। এই ক্ষেত্রে তিনি থাকেন সবার চেয়ে এগিয়ে।
টি-টোয়েন্টির এই যুগে ডেথ ওভারে রান তোলার প্রতি বাড়তি আশা থাকে ব্যাটারদের। সময়ের পালাক্রমে ডেথ ওভারে রান তোলার চাহিদা আরও বেড়েছে। ওভারে নূন্যতম ১৫ রান এখন অনায়াসে তোলা সম্ভব। ফ্র‍্যাঞ্জাইজি ভিত্তিক টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন জাগানো আইপিএলের পরিসংখ্যান ঘাটলে দেখা যায় ২০১৯ থেকে ২০২১- এই তিন মৌসুমের ২৩টি ম্যাচে ডেথ ওভারে নূন্যতম ৬৫ রান তুলেছেন ব্যাটাররা। আর রান তোলার এই কাজটা বেশির ভাগ সময়েই করে থাকেন লোয়ার অর্ডারের ব্যাটাররা। মিডেল অর্ডারে সিক্স হিটিং ব্যাটারদের চাহিদা কোনোকালেই তুঙ্গে ছিল না। যার প্রামাণ পাওয়া যায় আইপিএলের ২০২২ সালের নিলামে। ওডেন স্মিথ, রোমারিও শেফার্ড, টিম ডেবিড, সাথে লিয়াম লিভিংস্টোনরা দল পেয়েছেন চওড়া দামে। বোলার হিসেবে তো বটেই, ব্যাট হাতেও তারা দিতে পারবেন এক্সট্রা সাপোর্ট। শেষ দিকে পাওয়ার হিটিং দক্ষতার কারনেই তাদের নিয়ে ফ্র‍্যাঞ্জাইজিগুলোর মধ্যে ছিল এক অন্যরকম লড়াই। ওডেন স্মিথকে ৬ কোটি রুপিতে ও ১ কোটির বেস প্রাইজে নিলামের উঠা লিভিংস্টোনকে দলে নিতে ১১.৫ কোটি খরচ করেছে পাঞ্জাব। আর ৭৫ লাখের শেফার্ডকে দলে নিতে ৭.৭৫ কোটি খরচ করেছে সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ।
আইপিএলের গত তিন আসরের আরেকটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ওপেনাররা একটি ছক্কা হাঁকাতে খেলেছেন প্রায় প্রায় ২০.৬ বল। যেখানে ৬নম্বর ব্যাটার খেলছেন মাত্র ১৪.১ বল। পরিসংখ্যান দেখলে যেমনটা বুঝা যায়, আসলে ফিনিশারদের বাউন্ডারি হাঁকানোর কাজটা এতোটা সহজও নয়। ডেথ ওভারে বোলাররা এখন উইকেটের চেয়েও মিতব্যয়ী বোলিংয়ে বেশ মনযোগী হয়েছেন। এছাড়া ফিল্ডিং সাজিয়ে সহজেই বাউন্ডারি চেক দিতে পারেন তারা। তাই ফিনিশারদের কাজটা অনেকটা কঠিন হয়ে পড়েছে এখন। এই কঠিন কাজকে সহজ করার জন্য ফিনিশারদের হতে হয় স্কিলফুল এবং পাওয়ার হিটার। যাতে সহজেই কব্জির মোচড়ে সূক্ষ্ণ হিসাব নিকাশে বল পাঠাতে পারেন সীমানার বাহিরে।
ভক্তরা পাওয়ার হিটারদের বেশি পছন্দ করে। তারা যখন মাঠে আসে শুধু চার, ছক্কার মার দেখতে চায়
থিসারা পেরারা
ফিনশার টার্মটাকে যত সহজেই বর্ণনা করা যায়, তাদের কাজটা ততোটাই কঠিন। স্বাভাবিকভাবেই ওপেনারদের এতো ঝুঁকি নিতে হয় না। তারা আসেন, দেখে শুনে খেলে স্কোরকার্ড লম্বা করতে থাকেন। বলের সাথে রানের সামঞ্জস্যতা না রাখতে পারলে তখন ফিনিশারদের ব্যাটে তাকিয়ে থাকতে হয় পুরো দলকে। আর ফিনিশারদের দায়িত্ব পালনে প্রথম বল থেকেই মারমুখী ভঙ্গিতে ব্যাট চালাতে হয়। শুধু তাই নয়, কখনো কখনো টপ অর্ডারের ব্যর্থতায় ধস নামে ব্যাটিং লাইনআপে। তখনও গুরুদায়িত্ব আসে ফিনিশারদের উপরেই। দলের হাল ধরে নিয়ে যেতে হয় ইনিংসের শেষ অবধি। শ্রীলঙ্কান পেস বোলিং অলরাউন্ডার থিসারা পেরারা তার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'ভক্তরা পাওয়ার হিটারদের বেশি পছন্দ করে। তারা যখন মাঠে আসে শুধু চার, ছক্কার মার দেখতে চায়।' শ্রীলঙ্কান এই অলরাউন্ডার টি-২০তে ৩০০এর অধিক ম্যাচ খেলেছেন। পাওয়ার হিটার হিসেবেও ছিলেন বেশ পরিচিত। ঝড় তুলতে পারতেন ইনিংসের শেষ দিকে। যা তার ব্যাটিং পরিসংখ্যান দেখেলেই বুঝা যায়। ভক্তদের এমন চাওয়ার বিপরীতে পেরেরার বক্তব্য, 'তাহলে পাওয়ার হিটারদের গড়ের দিকে তাকাবেন না। আপনারা যদি আমাদের স্ট্রাইক রেটের দিকে দৃষ্টি দেন তাহলে দেখতে পাবেন আমরা কি করতে পারি'।
সদ্য শেষ হওয়া পাকিস্তান সুপার লিগের ফাইনালের কথা মনে আছে? ৮ বলের ডেভিড ওয়াইসের অপরাজিত ২৮ রানের ক্যামিও লাহোর কালান্দার্সকে ১৮০ রানের সংগ্রহ এনে দিয়েছিল। ফিনিশার হিসেবে তার এই ইনিংসই ফাইনালে শিরোপা জয়ের মূখ্য ভুমিকা রেখেছিল। পাওয়ার হিটিং সম্পর্কে সর্বশেষ পাকিস্তান সুপার লিগে ফিনিশারের ভুমিকায় ব্যাট হাতে ঝড় তোলা ডেভিড বলেন, 'বিষয়টি আমার কাছে পুরোই ব্যাটিং ইমপ্যাক্ট। ধরুন, আপনি ২০ রান করলেন। কিন্তু তা যদি হয়ে থাকে ৫ কিংবা ৬ বলে তাহলে প্রতিপক্ষের জন্য কতোটা ত্রাস সৃষ্টি করবে একবার ভাবুন। এই সংক্ষিপ্ত ইনিংসই প্রতিপক্ষকে ব্যাকফুটে ফেলে দিবে। যদি আপনার দল ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে তখন ভিন্ন বিষয়। তখন আপনাকে দলের হাল ধরতে হবে। বল বাই বল রান বের করে খেলতে হবে। এটা সবসময় স্ট্রাইক রেট বা গড় সম্পর্কে নয়; আমি নিজেকে গর্বিত করতে চাই পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলার জন্য এবং সেই ব্যক্তি হিসেবে যে কঠিন পরিস্থিতিতে দলের জন্য এগিয়ে আসে'।
টি-টোয়েন্টির এই যুগে সেরা ফিনিশার খোঁজার জন্য ক্রিকেট সংবাদমাধ্যম ইএসপিএন গত ৪ বছরের একটি পরিসংখ্যান দাঁড় করিয়েছে। এই তত্ত্বের মানে এই না যে তারাই সেরা ফিনিংশার। বরং অভিজাত শ্রেণির ফিনিশারদের চেনানোর একটা উপায় মাত্র। এবি ডি ভিলিয়ার্স, আন্দ্রে রাসেল, এম এস ধোনি, টিম-ডেভিড, হার্দিক পান্ডিয়াসহ ১০ জন সময়ের সেরা ফিনিশারের তথ্য উপাত্ত তুলে ধরা হলো- 
বরাবরের মতোই, ফিনিশারদের কখনো ব্যাটিং পরিসংখ্যান কিংবা ব্যাটিং গড় ইত্যাদি বিষয় দিয়ে বিবেচনা করা একেবারেই ঠিক নয়। একই কথা ধারাভাষ্যকার রব কিও বলেছেন, যিনি কিনা ২০০৭ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কেন্ট এর অধিনায়কও ছিলেন। তিনি বলেন, 'এখানে তাদের পরিসংখ্যানের বিষয়টা এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, তারা পুরো টিমের জন্য আত্নবিশ্বাসের একটা জায়গা। আপনি যখন ব্যাটিংয়ে যাবেন এবং জানতে পারবেন আপনার পিছনে এখনো ভালো ব্যাটাররা আছেন যারা দ্রুত রান তুলতে পারে। তাহলে আপনি অনেকটা স্বস্তি বোধ করবেন। এমনকি উপরের ব্যাটাররা খারাপ করলেও ভরসা করার মতো নিচে কাউকে পাবেন। যখন আমি আউট হয়ে যাব, আমার দলের জন্য অনেক ভোগান্তির শুরু হবে। কিন্তু যখন আমার দল কেন্টে একটা ভালো টি-টোয়েন্টি দল পাবে এবং আমার দলের মিডেল অর্ডারে ড্যারেন স্টিভেন্স, আজহার মাহমুদ এবং জাস্টিন ক্যাম্পের মতো ভরসামান ব্যাটার থাকবে তখন এটা আমাদের টপ অর্ডারদের উপর চাপ কমায়। ইচ্ছে মতো শট খেলার ঝুঁকি নিতে সাহায্য করে। এতে সবার খেলাই ভালো হয়'।
যখন আমার দল কেন্টে একটা ভালো টি-টোয়েন্টি দল পাবে এবং আমার দলের মিডেল অর্ডারে ড্যারেন স্টিভেন্স, আজহার মাহমুদ এবং জাস্টিন ক্যাম্পের মতো ভরসামান ব্যাটার থাকবে তখন এটা আমাদের টপ অর্ডারদের উপর চাপ কমায়। ইচ্ছে মতো শট খেলার ঝুঁকি নিতে সাহায্য করে। এতে সবার খেলাই ভালো হয়'
রব কিও (ধারাভাষ্যকার)
গত বছরের(২০২১) নভেম্বরে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইলের কথাই ধরা যাক। পাকিস্তানের বিপক্ষে ফাইনালে উঠার লড়াইয়ে টার্গেটে ব্যাট করছিল অস্ট্রেলিয়া। ১০০ রানের আগেই ৫ উইকেট হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে অজিরা। শেষ দিকে রান রেট ১০ এর বেশি পৌঁছায়। ৮ এর ও কম ওভারে প্রয়োজন ছিল ৮১ রান। তখন মাঠে মারকুস স্টোয়নিসের সাথে যোগ দেন ম্যাথু ওয়েড। এই জুটি এর আগেও ম্যাচ শেষ করে মাঠ ছাড়ার নজির গড়েছিল। তবে এটা বিশ্বকাপ মঞ্চ বলে কিছু অন্যরকম উত্তাপ ছিল। ওয়েড মাঠে এসেছিল ৭ নম্বর ব্যাটার হিসেবে। যাকে কিনা গত দেড় বছরে মাত্র ৩ বার ৫ এর নিচে ব্যাট করতে দেখেছে ক্রিকেট বিশ্ব। আর ৬ নম্বরে নামা স্টোয়নিস যে একজন পোক্ত টপ অর্ডার ব্যাটার তা জাস্টিন ল্যাংগার তাকে উপরে দিকে ব্যাটিং করিয়ে আগেই প্রমাণ করেছেন। কিন্তু এই ম্যাচে তাকে নিচের দিকেই নামানো হয়। বিগ ব্যাশের গত ৩ মৌসুমে দুই জনকে অধিকাংশ সময়েই ওপেনিং করতে দেখে গেছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার টিম ম্যানেজমেন্টের ছিল ভিন্ন পরিকল্পনা। প্রথাগত রীতির বাহিরে গিয়ে এঁটেছে নতুন পরিকল্পনা। অনেক সময়ই ওপেনারদের পজিশন বদলাতে বাধ্য করা হয়। এখানেও সেটাই হয়েছে। এর কারণ হলো, শেষ দিকে তারা পেসারদের বিপক্ষে ধ্বংসাত্নক ব্যাটিং করতে পারেন। বিপরীতে প্রথম দিকে স্পিনারদের সামলাতে হিমশিম খান অনেকে। তবে এটাও সত্য যে, ৩য় ও ৪র্থ ব্যাটারের চেয়ে ৫ম ও ৬ষ্ঠ ব্যাটার পাওয়ার হিটিংয়ে অধিক দক্ষ হয়ে থাকেন। 
সেদিন রাতে পাকিস্তানের বিপক্ষে পজিশন বদলে নামা স্টোয়নিস ও ওয়েড ম্যাচ জিতিয়েই মাঠ ছাড়েন। ৪০ বলে ৮১ রানের অপরাজিত জুটি গড়েন তারা। যার মধ্যে শাহীন শাহ আফ্রিদির ডেথ ওভারে (১৯তম) স্টোয়নিস হ্যাট্রিক ছক্কায় ম্যাচ শেষ করে দেন। দলের প্রয়োজনে নিজেরদের ব্যাটিং পজিশন মানিয়ে নিয়ে দুর্দান্ত ফিনিশিং করেন স্টোয়নিস ও ওয়েড। প্লেয়ারদের ব্যাটিং পজিশনের মনোভাব নিয়ে রব কি'র আরেকটি মন্তব্য আলোচনায় এসেছিল অনেকবার। তিনি বলেন, 'দলের ভালোর জন্য তাদের যে পজিশনেই ব্যাট করতে বলা হবে, তারা সেখানেই ব্যাট করবে। কিন্তু, যদি তাদের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে জিজ্ঞাস করেন, তারা ওপেন করার ইচ্ছাই আগে প্রকাশ করবে'।
দলের ভালোর জন্য তাদের যে পজিশনেই ব্যাট করতে বলা হবে, তারা সেখানেই ব্যাট করবে। কিন্তু, যদি তাদের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে জিজ্ঞাস করেন, তারা ওপেন করার ইচ্ছাই আগে প্রকাশ করবে
রব কি
কিন্তু ধোনি, পোলার্ড, এবি ডি ভিলিয়ার্স, আন্দ্রে রাসেলদের বিষয় এখানে ভিন্ন। ফিনিশার হিসেবে ফিক্সড পজিশন তাদের সাফল্য এনে দিয়েছে বছরের পর বছর। লিয়াম লিভিংস্টোন, ইংল্যান্ড থেকে সুখ্যাতি পাওয়া প্রথম ফিনিশার যাকে আইপিএলে চড়া দামে দলে নিয়েছে পাঞ্জাব। বিগত কয়েক বছরে বিভিন্ন ফ্র‍্যাঞ্জাইজি ভিত্তি টুর্নামেন্ট খেলে তিনি বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। লিভিংস্টোনও হাটছেন অন্যদের চেয়ে ভিন্ন পথে। টপ অর্ডার নন, তিনি হতে চান বিশ্বসেরা ফিনিশারদের একজন। তার ফিনিশার হওয়ার মনোভাব নিয়ে বার্মিংহাম ফিনিক্সের তার সতীর্থ ক্রিস বেনজামিন বলেন, 'দ্য হান্ড্রেড চলাকালীন তার(লিভিংস্টোন) সাথে আমার বেশ ইন্টারেস্টিং কিছু কথাবার্তা হয়েছে। সে বলে, এখন কে-ই বা না চায় টপ অর্ডারে ব্যাট করতে? এই পজিশনে ব্যাট করা উপযুক্ত সময় এবং সেখানে ব্যাট করলে প্রচুর রান করার সুযোগ থাকে। কিন্তু বিশ্ব ক্রিকেটে ধারাবাহিক ফিনিশারের বড্ড অভাব। তুমি যদি এটা ভালোভাবে আয়ত্ত করতে পারো, বিশ্ব ক্রিকেটের যেকোনো জায়গায় তোমার জন্য দরজা খোলা থাকবে'। 
অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার ব্যাড হজ, তার ক্যারিয়ারের অধিকাংশ সময় খেলেছেন টপ অর্ডার ব্যাটার হিসেবে। কিন্তু আইপিএলে যখন তিনি রাজস্থানের হয়ে খেলেছিলেন তার অধিনায়ক রাহুল দ্রাবিড় তাকে পজিশন বদলে ওপেনার হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। ২০১৯ সালে ইএসপিএনের একটি পডকাস্টে জন জানান, আমি দ্রাবিড়কে বলেছিলাম, 'দেখো, আমি আমার ক্যারিয়ারের অধিকাংশ সময় ব্যাট করেছি টপ অর্ডার ব্যাটার হিসেবে। আমার প্রায় সব রানই এসেছে এই পজিশনে খেলে'। উত্তরে দ্রাবিড় বলেছিলেন, 'দেখো তুমি এই দলের একমাত্র ব্যাটার যে কিনা ডেথ ওভারে প্রতিপক্ষ দলের পেসারদের দক্ষভাবে সামলাতে পারবে। তোমাকে নিচের দিকে খুবই প্রয়োজন'। 
এদিকে, পজিশন পাল্টে পাওয়ার হিটিংয়ে বেশ মনোযোগ দিয়েছিলেন হজ। রাজস্থান এর সুবিধাও পেয়েছিল অনেক। পরের ৩ মৌসুম ফিনিশার হিসেবে বেশ সাফল্য এসেছে তার ব্যাট থেকেই। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে যখন কোচের ভূমিকায় আসেন, অনেক টপ অর্ডার ক্রিকেটারকে তিনি ফিনিশারের ভূমিকায় খেলানোর এক্সপেরিমেন্ট চালান। গুজরাট লায়ন্সের কোচ থাকাকালীন সময়ে অ্যারন ফিঞ্চ, ড্রোয়েন ব্রাভো, এমনকি জেসন রয়কেও তিনি ফিনিশারের রোলে পাঠান করেছিলেন। এতে দলটি সফলতার মুখও দেখে। ২০১৬ সালে টেবিল টপার ছিল হজের দল। 
ধরুন, ১৬০ কিংবা ১৮০ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করতে পারা কোন উপমহাদেশীয় ক্রিকেটার ঘন্টায় ১৪৫ কি. মি বেগে ছোড়া বল এমসিজির লং সাইড দিয়ে বাউন্ডারির ওপারে সহজে নিতে পারবে? যদি তার ব্যাটিং পরিসংখ্যানের ৯০% তথ্যই ভারত ভিত্তিক আইপিএল থেকে এসে থাকে? এখানেই আসলে তথ্য উপাত্ত খুবই গুরত্বপূর্ণ
উডহিল
তবে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ফিনিশারদের সাথে ফ্র‍্যাঞ্জাইজি ভিত্তিক টুর্নামেন্টের ফিনিশারদের ভূমিকায় অনেকটাই ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে কন্ডিশন বিবেচনায়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিনিশারদের রোল অনেকটাই ভিন্ন হয়। ভারত এবং আসন্ন টি-২০ বিশ্বকাপের আয়োজক অস্ট্রেলিয়ার কথাই চিন্তা করা যাক। ভারতের ৬০ বর্গমিটারের মাঠ এবং স্লো পিচে ব্যাটিংয়ের সাথে অস্ট্রেলিয়ার দ্রুতগতির বাউন্সি পিচে ব্যাট করার মাঝে অনেক পার্থক্যই রয়েছে। এমন তারতম্যের কথা উল্লেখ করে উডহিল বলেন, 'ধরুন, ১৬০ কিংবা ১৮০ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করতে পারা কোন উপমহাদেশীয় ক্রিকেটার ঘন্টায় ১৪৫ কি. মি বেগে ছোড়া বল এমসিজির লং সাইড দিয়ে বাউন্ডারির ওপারে সহজে নিতে পারবে? যদি তার ব্যাটিং পরিসংখ্যানের ৯০% তথ্যই ভারত ভিত্তিক আইপিএল থেকে এসে থাকে? এখানেই আসলে তথ্য উপাত্ত খুবই গুরত্বপূর্ণ'।
কেবল মাত্র খুবই পাওয়ার হিটিং সম্পন্ন ব্যাটাররা নিয়মিত ৮০ মিটারের বাউন্ডারিতে ছক্কা হাঁকাতে পারেন। ব্যাটিং দক্ষতাকে যথার্থভাবে কাজে লাগাতে পারলে কিছু হিটার ব্যাটারও সফলতার মুখ দেখতে পারেন। নিজেদের সুবিধা মতো স্কোয়ার বাউন্ডারিগুলোতে বল পৌঁছাতে পারবেন সহজেই। তবে অবশ্যই সঠিক পরিকল্পনা সাজিয়ে ব্যাট চালাতে হবে। ফিনিশারদের মাঝে সবসময় একটা বাড়তি চাপ কাজ করে। দলের বাড়তি চাওয়া এবং নিজের মাঝে মানসিক চাপকে আগলে রেখে খেলতে হয় তাদের। টি-টোয়েন্টি লিগগুলো খুবই সংক্ষিপ্ত পরিসরে হয়ে থাকে। যেখনে বেসবলের বড় টুর্নামেন্টগুলোতে প্রতি সিজনে দলগুলো ১৬০টি করে ম্যাচ খেলে থাকে। সেখানে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে চলা ক্রিকেটের ফ্র‍্যাঞ্জাইজি ভিত্তিক টুর্নামেন্ট আইপিএলে প্রতি দল লিগ পর্বে ১৪টি করে ম্যাচ খেলে থাকে। দলের সাফল্যের উপর প্লে-অফ খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। টুর্নামেন্টগুলোর মালিকপক্ষ সফলতার বিকল্প কিছু দেখতে চায় না। প্রয়োজনবোধে তারা কোচিং স্টাফ থেকে শুরু করে প্লেয়ারদেরও ছাটাই করতে দ্বিধা করে না। এর প্রভাবটা বেশি পড়ে ফিনিশারদের উপর। রানের দেখা না পেলেই বাদ পড়তে হয় দল থেকে। 
ফিনিশারদের নিঃস্বার্থভাবে খেলতে হয়, সাধারণত দলের সুবিধার জন্য শুরু থেকেই আক্রমণাত্মকভাবে খেলে তারা। টি-টোয়েন্টি ব্যাটার হিসেবে ঝুঁকি না নেয়ার চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ আর কিছু নেই। তবে অবশ্যই তাদের নিজেদের প্রয়োজনের সাথে ভারসাম্য রাখতে হবে, লড়াই চালিয়ে জয় ছিনিয়ে আনতে হবে। নিচের গ্রাফে বিশ্ব ক্রিকেটের কিছু অভিজাত শ্রেনির ফিনিশারদের একটি তথ্য চিত্র তুলে ধরা হয়েছে যারা প্রথম বল থেকেই পাওয়ার হিটিং প্রদর্শন করেন। এমনকি প্রথম ৫ বল মোকাবিলা করে অন্তত ৭ রান করতে সক্ষম:
পিএসএলে ফিনিশারের ভূমিকায় সফল হওয়া ডেবিড ওয়াইসকে তার একসময়কার কোচ রব ওয়াল্টার বলেন, 'দেখো, ক্রিকেট এমন খেলা যা ব্যর্থতা দিয়ে পরিপূর্ণ। সবচেয়ে সাফল্যমন্ডিত ব্যক্তি মাত্র ৩০% সাফল্য পেয়ে থাকে। তোমাকে সবসময় মনে রাখতে হবে, এটা তোমার কাজ। তুমি কে সেটা বড় বিষয় নয়, তুমি কী করছো সেটাই মূখ্য। নিজেকে উপভোগ করো, প্রকাশের চেষ্টা করো। এতে যথাযথ সাফল্য না আসলে কখনো প্রমাণ করতে পারবে না যে, তুমি কে!'
ফিনিশারদের এত সব চেষ্টার মাঝে বোলাররাও বসে নেই। তাদের আটকাতে সবধরনের পরিকল্পনা আঁকছে তারাও। সাম্প্রতিক সময়ে কাইরেন পোলার্ড, আন্দ্রে রাসেলদের পাওয়ার হিটিং আটকাতে বোলাররা ব্যাক অব এ দ্য ল্যান্থে বল করে বেশ সফলতা পাচ্ছেন। ২০২১ আইপিএলে ইয়র্কার ল্যান্থের বলে পোলার্ডের স্ট্রাইক রেট ছিল ১৯৩। যেখানে অধিকাংশ বল ছিল ফুল, ইয়র্কার কিংবা ফুল টস। যেখানে শর্ট ল্যান্থ কিংবা গুড ল্যান্থে তার স্ট্রাইক রেট ছিল ১৩৬.৬। পোলার্ডের ব্যাটিং ধরন কিছুটা ধোনিও অনুকরণ করে থাকেন। ২০২২ আইপিএলে চেন্নাই সুপার কিংসের ২য় ম্যাচে লখনৌ সুপার জায়ান্টসের বিপক্ষে নিজের প্রথম বলেই সীমানা পার করেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। ৪০ বছর বয়সে এসে আইপিএল ক্যারিয়ারে এই প্রথম ছয় দিয়ে ইনিংস শুরু করেন ধোনি। যেদিন থেকে পাওয়ার হিটিংয়ে ব্যাটাররা মনোযোগী হয়েছে ফিনিশারদের গুরুত্ব বেড়েছে অনেকগুন। আর পাওয়ার হিটার আবিষ্কারের সেরা মঞ্চ হচ্ছে 'টি-২০' ক্রিকেট। 
খেলাধুলাক্রিকেট
আরো পড়ুন