Link copied.
লৌহ যুগের যে শ্রেষ্ঠ ৫ আবিষ্কার-পাল্টে দিয়েছে পৃথিবীর ধারণাকে!
writer
অনুসরণকারী
cover
প্রস্তর যুগ এবং ব্রোঞ্জ যুগের পরে লৌহ যুগের আবির্ভাব হয়। ইউরোপিয়ান গবেষকরা উনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে পৃথিবীর আদিম সময়কে এই তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন। নতুন কলাকৌশল লোহাকে শক্তপোক্ত করলেও ব্রোঞ্জ যুগ ঠিক এমনটা ছিল না। সে সময় তামা, সোনা এবং পাথর ছিল মূল হাতিয়ার। লৌহ যুগেই লোহা ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকায় পৌঁছে। যদিও একই সময়ে এটি পৃথিবীর সকল প্রান্তে পৌঁছায়নি। সময়ের পরিক্রমায়, চাহিদা অনুযায়ী লোহার বিস্তার ঘটেছিল। আর এই কারণেই খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে ৩০০০ সালকে বিজ্ঞানীরা লৌহ যুগ বলেন। আবার কিছু কিছু বিজ্ঞানী শুধুমাত্র একটি লৌহ যুগ মানতে নারাজ। তাদের মতে একাধিকবার লৌহ যুগের প্রবর্তন হয়েছিল পৃথিবীতে। 
cover
ইউরোপিয়ানরা নিজেদের ইতিহাসের সারণি তৈরি করার সুবিধার্থে লৌহ যুগকে যেভাবে ভাগ করেন তা থেকে বোঝা যায় খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রথম মিলেনিয়াম সময়ে লৌহ যুগের আবির্ভাব ঘটেছিল ইউরোপ এবং এশিয়ার ভূখণ্ডে। ঐ সময়ে আবিষ্কৃত অনেক অনেক হাতিয়ার বা ব্যবহার্য জিনিস পাওয়া গেছে যেগুলো দেখলে বোঝা যায় সেকালেও মানবজাতি প্রচণ্ড বুদ্ধিমান ছিল। নিজেদের সুরক্ষার্থে কিংবা শিকারের স্বার্থে তারা লোহা দিয়ে এসকল জিনিসপত্র প্রস্তুত করত। ইউরোপ এবং এশিয়ার বিজ্ঞানীরা এখনো সেসব নিয়ে গবেষণা করছে। জানার চেষ্টা করছে লৌহ যুগের ইতিহাস। আজ আমরা লৌহ যুগে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ ৫টি আবিষ্কার সম্পর্কে অবগত হব। 
১. ঢালাই লোহা

২০২১ সালের মে মাসের এক গবেষণায় দেখা গেছে প্রথম ঢালাই লোহার ব্যবহার হয়েছিল চীনে। খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতকে লোহার সঙ্গে কপার, ব্রোঞ্জসহ আরো উপাদান মিশিয়ে ভঙ্গুর লোহা তৈরি করত চীনারা। যদিও এই ধারণার সঙ্গে একমত নন সকল গবেষকরা। কারণ, অনেকের ধারণা চীনারা তখন শুধুমাত্র ব্রোঞ্জ এবং তামা গলাতে পেরেছিল। মেসোপটেমিয়া সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ থেকে একটি তামার ব্যাঙ পাওয়া যায় যেটি আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩২০০ সালে তৈরি হয়েছিল। মেসোপটেমিয়া সভ্যতা নিয়ে কাজ করা গবেষকদের মতে, লৌহ যুগে সেখানেও তামা এবং ব্রোঞ্জ গলিয়ে একই আকৃতির ছাঁচে ঢেলে ঐ আকৃতির বস্তু তৈরি করা হতো।
cover
প্রত্নতত্ত্ববিদরা মনে করেন প্রাচীন মিশরের হিতাইতিসরা খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ থেকে ৩০০০ সালের মধ্যে লৌহ যুগে প্রবেশ করেছিল। ঠিক ঐ সময়ের মাঝে তারা ধাতু দিয়া অস্ত্রসস্ত্র এবং বিভিন্ন সরঞ্জামাদি তৈরি করে। ইউরোপিয়ান গবেষকরা লৌহ যুগের কৃতীত্ব হিতাইতিসদের প্রদান করতে চান এই মর্মে যে, যখন চীনারা লোহা গলিয়ে বিভিন্ন জিনিসপাতি তৈরিতে মনোযোগী তারও কয়েকশত বছর পূর্বেই মিশরীয়রা সফল হয়েছিল। কিন্তু তাদের সফলতা গোপন রেখেছিল তারা। প্রকৃতপক্ষে ইতিহাস তাদেরই মনে রাখে যারা নিজের আবিষ্কারের ঘোষণা সবার আগে জনসম্মুখে নিয়ে আসে। খ্রিস্টপূর্ব ১০২৪ সালে নির্মিত চীনের ঝংয়ু ডেংফেং মন্দির থেকে ৪টি লোহার মূর্তি পেয়েছিলেন চীনা প্রত্নতত্ত্ববিদেরা। 
২. নেভানো পদ্ধতি

লৌহ যুগের মানুষেরা লোহাকে শক্তপোক্ত করার প্রয়োজন অনুভব করেন। কারণ আমরা সবাই জানি লোহা নিজে কখনোই শক্তপোক্ত নয়। ইউরোপ এবং এশিয়ানরা তাই লোহাকে আরো শক্তপোক্ত করার জন্য নেভানো পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। যদিও বিজ্ঞানীরা সঠিকভাবে বলতে পারবেন না ঠিক কবে নাগাদ এই পদ্ধতির ব্যবহার শুরু হয়েছিল। যদিও এই পদ্ধতি যে খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম এবং অষ্টম শতকেও ব্যবহৃত হত তার প্রমাণ পাওয়া যায় গ্রিক কবি হোমারের দ্য ওডিসি থেকে। তার কবিতায় তিনি লৌহশিল্পীরা কাজের শেষে ঠান্ডা পানিতে ঢুবে যেতেন। আবার হোমার উল্লেখ করেন গলানো লোহায় পানি ঢেলে ঠান্ডা করতেন কারিগররা।
cover
লোহার ব্যবহারের উন্নতিতে প্রয়োগকৃত এই পদ্ধতির জন্য সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেন ইউরোপ, এশিয়ার দক্ষিণাঞ্চল এবং চীনের মানুষেরা। আধুনিক যুগে আমরা দেখতে পাই ধাতব জিনিসপাতি তৈরিতে আদিম মানুষদের দেখানো নেভানো পদ্ধতি প্রচলিত। কোনোকিছু তৈরি করা হলে প্রথমে এটিকে ঐ আকারে ছাঁচে গলিয়ে ঢালা হয়। তারপর তার উপর ঠান্ডা পানি ঢাললে মুহূর্তের মধ্যেই আকার পেয়ে যায়। গবেষকদের মতে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ বছর আগে লৌহ যুগের মানুষদের অনন্য এক আবিষ্কার এটি।
৩. হাতিয়ার

সৃষ্টিলগ্ন থেকে প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছে। প্রস্তর যুগ এবং ব্রোঞ্জ যুগে মানুষের হাতিয়ার ছিল শুধুমাত্র পাথর এবং কাঠের তৈরি। আর মানবজাতির শত্রু ছিল বিভিন্ন পশুপাখি। কারণ সেকালে মানুষের তুলনায় পশুর সংখ্যাই ছিল অত্যধিক। শুধুমাত্র শত্রুর মোকাবেলা করাই নয়, কখনো কখনো শিকারের তাগিদেও মানুষ হাতিয়ার ব্যবহার শুরু করে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ যখন গড়ে উঠে মানুষ নিজেই নিজের শত্রুতে পরিণত হতে থাকে। একটা পর্যায়ে মানুষ ধাতব হাতিয়ারের প্রয়োজনবোধ করে যা লৌহ যুগের এক অনবদ্য আবিষ্কারের দিকে নিয়ে যায় মানুষকে।
cover
প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০ সালে রাজা তুতেনখামেনকে তার লোহার তলোয়ারসহ সমায়িত করা হয়েছিল। অথচ গবেষকরা এর পরেই লৌহ যুগের শুরু হয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন। তবে এর একটা সুন্দর ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়। তারা মনে করেন ধাতব অস্ত্রসস্ত্র লৌহ যুগের আগেই তৈরি হতো। তবে অস্ত্রশস্ত্র লোহা থেকে ইস্পাতে রূপান্তরিত হয়েছিল লৌহ যুগে এসে। পরিবর্তনের উল্লেখযোগ্য কারণও ছিল। লোহার হাতিয়ারগুলো মোটামুটি সহজেই ভেঙ্গে যেত, কিন্তু ইস্পাতের হাতিয়ার ছিল মোটামুটি শক্তপোক্ত। এখন অবধি পাওয়া সবথেকে পুরোনো তলোয়ার হলো ভার্ডে জেরিচো যা খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে। এটি প্রাচীন ইসরায়েলে পাওয়া গেছে। তবে ব্রোঞ্জ যুগকে পেছনে ফেলে আসলেও লৌহ যুগের মানুষেরা ব্রোঞ্জের জিনিসপত্র তৈরি চালিয়ে যায়। 
৪. মুদ্রা

প্রত্নতত্ত্ববিদেরা মনে করেন সোনা এবং রূপা ওজন হিসেবে ব্যবহার হতে থাকে ব্রোঞ্জ যুগ থেকেই। কিন্তু বিনিময় মাধ্যম হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে কয়েন তৈরি শুরু হয় লৌহ যুগের আনাতলিয়া সময়ে। গবেষকদের মতে প্রথম মুদ্রা তৈরি হয় খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ সালে লেদিয়া, আনাতলিয়ায় যা বর্তমানে তুরস্ক। এসব কয়েনে বিভিন্ন প্রতীক থাকত। তবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হতো সিংহ, গাছপালা, মানুষ, মুকুট ধরণের প্রতীক। রোমান সম্রাটরা খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে কয়েন উৎপাদন শুরু করে এবং বাজারে আনে। অনেক গবেষক মনে করেন স্রষ্টা অ্যাপোলোকে খুঁশি করতে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় কয়েন পৌঁছে দিতেন রোমানরা।
cover
সময়ের পরিক্রমায় স্থানীয় এবং আঞ্চলিক মুদ্রা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। আদিবাসীরা নিজেদের জাতিসত্তার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং প্রতীক ব্যবহার করা শুরু করে। লৌহ যুগের মুদ্রাগুলোর উভয় পিঠে বিভিন্ন গ্রিক মডেল পাওয়া যায়। তাই অনেকের ধারণা গ্রিকরাই মুদ্রার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে নেন। দক্ষিণ ইউরোপের সুবিশাল এলাকা, ইতালি থেকে বলকান হয়ে দানিউব নদীর অববাহিকা এবং দক্ষিণ ফ্রান্স অবধি লৌহ যুগে মুদ্রা প্রচলন ছিল। যদিও সেসব মুদ্রা ছিল ব্রোঞ্জের তৈরি। তবে জার্মানি, উত্তর ফ্রান্স এবং ব্রিটেনে সোনার মুদ্রা প্রচলিত ছিল। অন্যদিক, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এবং স্পেনের মুদ্রাগুলো ছিল অন্য দুটোর তুলনায় একেবারে ভিন্ন। 
৫. যাঁতা বা পেষণ- যন্ত্র

খাবারের তাগিদে লৌহ যুগের মানুষেরা শিকার করতে যেমন অস্ত্র বা হাতিয়ার তৈরি করেছিল তেমনি ফসল উৎপাদনও শুরু করেছিল। কারণ ততদিনে মানুষ সমাজব্যবস্থায় মনোযোগী হয়ে উঠে এবং খাদ্যশস্য উৎপাদন করে। আধুনিক যুগে আমরা ফসলকে খাবারে রূপান্তর করতে যে ধাপগুলো মেনে চলি সেগুলোর প্রথম ধারণা এসেছে লৌহ যুগ থেকেই। কারণ তখন মানুষ দানা শস্য জাতীয় খাবারকে যাঁতা বা পেষণ যন্ত্রাংশ পিষে অন্য আরোকটি খাবারে রূপান্তর করত। মূলত রোমানরা নিজেদের সাম্রাজ্যের উন্নয়নে যেসকল কারিগর নিয়োগ দিয়েছিলেন তাদের অন্যতম একটি আবিষ্কার এটি। যদিও চীনাদের নিকট এর চেয়েও উন্নত প্রযুক্তি ছিল সেকালে।
cover
নরওয়ের জাদুঘরে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ সালে তৈরি পেষণ যন্ত্র সংরক্ষিত আছে। এগুলোর সবকটি ইউরোপের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক খনন থেকে উদ্ধার করা হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ সালে লৌহ যুগের ব্রিটেনে ব্যবহৃত হওয়া একটি ঘূর্ণায়মান পেষণযন্ত্র পাওয়া যায়। এটি দুটি পাথর খণ্ড দ্বারা তৈরি যার উপরের পাথরে একটি ছোট ছিদ্র থাকে যার মধ্যে শস্য ঢালা হয়। যখন দুটি পাথর ঘুরানো হয় তখন এই যন্ত্রের মাঝামাঝি অংশ দিয়ে শস্যদানা পতিত হয়। গবেষকরা এটিকে লৌহ যুগের অন্যতম সেরা আবিষ্কার হিসেবে উল্লেখ করেন।  

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021